দুজন তারপর এক নিষিদ্ধ জগতে হারিয়ে গেলো। শেষ মুহূর্তে সুলতানা ফিস ফিস করে বললো,
যাররী! মুদ্দাসসিরাকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দাও।
বেশ কিছুক্ষণ পর, দুজনে সিক্ত দেহে মুখোমুখি হয়ে কথা বলছে। ওদের মাঝখানে মদের সুরাহী।
কাউকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দাও মালিকায়ে তরুব! যারিয়াব বললো, মুদ্দাসসিরাকে আমি আমার পক্ষে নিয়ে নেবো।
কিন্তু তুমি এটা কেন বলেছে যে, তুমি ভুল পথে যাচ্ছো? সুলতানা হেসে জিজ্ঞেস করলো।
আমি অনুভব করছি, আমার পথ এটা নয়। তুমি তো তোমার স্বপ্নের পথে যাচ্ছে, যে পথে তোমার প্রবৃত্তির প্রশান্তি আছে বলে মনে করো সেটাকেই তোমার গন্তব্য মনে করছে। আর আমাকেও তোমার প্রেম সে পথে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার পথ ভিন্ন কিছু। যারিয়াব কিছুটা গম্ভীর গলায় বললো।
তুমি অনেক জ্ঞানী এবং দূরদর্শীও। সুলতানা বললো, আমরা, দুজন মুসলমান। কিন্তু আমাদের সামনে যা ঘটছে তা থেকে আমাদের চোখ বন্ধ করে তো থাকতে পারি না। খ্রিষ্টানরা যে মিশন ও যে কঠিন সংকল্প নিয়ে জেগে উঠেছে এবং যে ত্যাগ ওরা দিয়ে যাচ্ছে এতে তো এটা পরিস্কার যে, ইসলামের ঝান্ডা আর বেশি দিন এখানে উড়বে না।……
তারপর কী হবে জানো? তুমি দরবারী গায়কদের মধ্যে একজন গায়ক হয়ে থাকবে। আর আমি ওদের কোন জেনারেলের রক্ষিতা হয়ে থাকবো। ইউগেলিস তো আমাকে সবকিছু বলেছে। তোমার প্রতি উনি দারুণ খুশি। তুমি মুসলমান আমীর উমারা ও অভিজাত শ্রেণীর সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনটাই পাল্টে দিয়েছে। ওদেরকে ইসলামের আসল চেতনা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে।…
সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন খ্রিষ্টানরাই এখানকার বাদশাহ বনে যাবে। তাহলে ওদের সঙ্গে আমরা কেন শত্রুতা সৃষ্টি করতে যাবো যে, আমাদের শুধু এটাই করতে হবে। শাহে উন্দলুসের চিন্তার জগৎটাকে আমাদের হাতের মুঠোয় রাখতে হবে। তিনি আগামীকাল আসছেন। মুদ্দাসসিরাকে বলল সে যেন তার কাছ থেকে দূরে থাকে। মুদ্দাসসিরার প্রতি তিনি বেশ দুর্বল এবং তার কথাকেই তিনি খুব গুরুত্ব দেন।
আমি এখনই মুদ্দাসসিরার কাছে যাচ্ছি। যারিয়াব বললো।
***
৬. যারিয়াব এসেছে
খাদেমা এসে জানালো যারিয়াব এসেছে। মুদ্দাসসিরার ভ্রু কুচকে উঠলো। ব্যাপার কি এ লোক এখন কেন আসলো? এবং মুদ্দাসসিরার কাছে তার কি দরকার?
তারপরও মুদ্দাসসিরা দরজায় গিয়ে তাকে স্বাগত জানালো।
শাহে উন্দলুসের প্রতীক্ষায় তোমার দিনকাল কেমন কাটছে মুদ্দাসসিরা?
শাহে উন্দলুস নয় আমীরে উন্দলুস বলুন! মুদ্দাসসিরা বললো, ইসলামে কোন বাদশাহ নেই। জনাব যারিয়ার! আপনি তো বড় বিদ্যান, জ্ঞানী। আপনি এতটুকু বুঝতে পারছেন না। একজন আমীরকে কে বাদশাহ বানালো? খলীফাও তো বাদশাহ নন। বাদশাহী তো একমাত্র আল্লাহরই আচ্ছা। আজ হঠাৎ এ দিকে? আবার এ সময়?
যে যারিয়াব যে কোন মানুষের হৃদয়ের মুকুটহীন বাদশাহ ছিলো সে লোকটি মুদ্দাসসিরার কথায় তার স্বপ্রতিভাতা হারিয়ে ফেললো। কেমন নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। রূপ ও ব্যক্তিত্ব মুদ্দাসসিরার সুলতানার চেয়ে কম নয়। যারিয়াবের কাছে সুলতানার চেয়ে মুদ্দাসিরাকেই অধিক আকর্ষণীয় মনে হলো।
যারিয়াব যখন এই কামরায় ঢুকে তখন তার হাবভাব ছিলো এমন যেন মুদ্দাসসিরা আমীর উন্দলুসের নয় বরং তারই স্ত্রীদের অতি সাধারণ এক স্ত্রী। আর যারিয়ার এই কামরায় এসে তার ওপর অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু মুদ্দাসসিরার সপ্রতিভ ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাস দেখে যারিয়ার অনুভব করলো, সে নিজে এতো বিশাল কোন ব্যক্তিত্ব নয় যতটা সে নিজেকে মনে করে।
আপনি কি মেহেরবানী করে বসবেন না? মুদ্দাসসিরা বললো।
এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই তোমার কাছে একটু বসে গেলাম। যারিয়াব বসতে বসতে বললো।
জনাব যারিয়াব! মুদ্দাসসিরা অকপটে বললো, আপনার বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সামনে তো আমি কিছুই নই। সূর্যের সামনে সাধারণ প্রদীপ যেমন আমি তেমনও নই। কিন্তু কিছু না কিছু তো অবশ্যই বুঝি। আপনার চোখের ভাষা বলছে, আপনি এখান দিয়ে যাওয়ার সময় এমনি এমনি উদ্দেশ্য ছাড়া এখান দিয়ে আসেননি।…
আপনি আমার কাছেই এসেছেন। বলুন, আমি আপনার কী সেবা করতে পারি? আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমি হরমের কোন মেয়ে নই। আমার একজন স্বামী আছে। আমীরে উন্দলুসের স্ত্রী আমি।
যারিয়াব হেসে উঠলো। বললো,
সুন্দরী মেয়েদের কোন পুরুষ এক পলক দেখলেই ওরা মনে করে ভিন্ন দৃষ্টিতে বুঝি ওকে দেখেছে। তুমি এতটুকু ঠিকই বলেছে যে, আমি এমনি এমনি আসিনি। কিছু বলতেই এসেছি। কিন্তু এটা তোমার অমূলক ধারণা যে, তোমার স্বামীর অবর্তমানের সুযোগ নিয়ে অন্য কোন মতলবে তোমার কাছে এসেছি। যারিয়ার কিছুক্ষণ চিন্তা করে তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো।
***
সুলতানের সঙ্গে আমার ততটুকুই ঘনিষ্ঠতা রয়েছে যতটুকু রয়েছে তোমার সঙ্গে। অবশ্য তোমাদের দুজনের মধ্যে একটা পার্থক্যও আছে। আমি এটাও বুঝি
এত ভূমিকার কি প্রয়োজন জনাব যারিয়াব? মুদ্দাসসিরা কিছুটা চড়া গলায় বললো, আপনি কেন বলে দিচ্ছেন না, আমার সুলতানা ও আমীরে উন্দলুসের মাঝখানে দেয়াল হওয়া উচিত নয়। সুলতানা বড়ই রূপময় এক কবিতা।…..
