সুলতানার মনে পড়লো, যারিয়াবকে তার প্রেমিক নয়; তার টোপ বানাতে হবে। তাকে সম্রাজ্ঞী হতে হবে। সে কুলুপতরার মতো অসংখ্য হৃদয়ের প্রেম, ভালোবাসাকে পায়ে পিষে, মানবতাকে আস্তকুঁড়ে নিক্ষেপ করে রূপের মায়ায় জড়ানো নিষ্ঠুরতার স্বপ্ন দেখতে লাগলো।
আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমানের ব্যাপারে তার মনে কোন ভাববেগ নেই। সে তো তার দেহ তাকে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার মনে আব্দুর রহমানের এতটুকু স্থান নেই।
যারিয়াকে সে তার স্বপ্নের ভূবণ থেকে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছিলো না। কিন্তু যারিয়ারের সঙ্গে তার কিছু প্রয়োজনীয় কথা আছে।
পর দিন শাহে উন্দলুস যুদ্ধজয়ী সেনা দল নিয়ে আসবে। সুলতানা ও যারিয়াব মারীদার বিদ্রোহ উস্কে দিয়ে তো ফ্রান্সের ওপর হামলা রুখে দিয়েছিক্ষ্মলা; কিন্তু শাহে উন্দলুস তারপরও বিজয়ী বীর হিসেবে ফিরে আসছেন।
এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়াতে সুলতানার মধ্যে কোন হতাশা নেই। তারপরও সে পরাজয়ের তিক্ততা অনুভব করছে এ কারণে যে, শাহে আব্দুর রহমানের মধ্যে এখনো তলোয়ারের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে।
তাই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য সুলতানার যারিয়ারেব সাহায্যের প্রয়োজন।
***
পায়ের মৃদ শব্দে যারিয়াবের গান থেমে গেলো। সে পেছনে ফিরে দরজার দিকে তাকালো। সে যেন তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না।
তুমি কি বাস্তব না আমার কল্পনার কোন অপসরী? যারিয়াব সবিস্ময়ে ফিস ফিস করে বললো।
সুলতানা রিনঝিনিয়ে হেসে উঠলো। যারিয়ার ধীরে ধীরে উঠলো। সুলতানা কাছে এগিয়ে গেলো। যারিয়াব কম্পিত দুহাতে সুলতানার গাল স্পর্শ করলো। তারপর তার হাতে সুলতানার রেশম কোমল কয়েকটি চুল নিয়ে গভীর নিঃশ্বাসে কলো। তারপর সুলতানার উন্মুক্ত কাঁধে হাত রাখলো। সুলতানা কলকলিয়ে হেসে উঠলো।
যারিয়াব সুলতানার দুবাহু ধরে তাকে গালিচায় বসিয়ে দিলো। নিজে তার সামনে বসে পড়লো।
কখনো কখনো আমার নিজের সুর আর এই গিটারের আওয়াজ আমাকেও নিবিষ্ট করে ফেলে; যারিয়ার স্বগোতিক্তের মতো বললো, গিটারের তারের জলতরঙ্গ আমার কণ্ঠের বানী একাকার হয়ে তোমার অপরূপ রূপ ধারণ করে নিয়েছিলো। আর সেই কল্পনাকে তুমি এখন কাংখিত বাস্তবে রূপ দিলে।
সুলতানা হেসে উঠলো এবং বললো, আমি কি কালনাগিনী? যে বাঁশির করুণ সুরে এসে হাজির হয়?
তুমি কালনাগিনীই সুলতানা! যারিয়াব বললো, উন্দলুসের কালনাগিনী তুমি, তোমার বিষের মধ্যে রূপের মাধুরী আছে। আছে মাদকতা এবং তীব্র এক নেশা…
সুলতানা! আমি সেই মানুষ, যে শাহে উন্দলুস আব্দুর রহমানের মতো এমন বিজ্ঞ, নির্ভীক, বীর বাহাদুর শাসকের ওপর অনায়াসে প্রাধান্য বিস্তার করতে পেরেছি। তুমি তো দেখোই, বড় বড় আমীর, রঈস আমারই হাত ধরে শাহে উন্দলুসের কাছে যেতে পারে।
যে কোন ধরনের অনুরোধ, উপরোধ আমাকে দিয়েই করায়। কিন্তু তুমি যখন আমার সামনে আসো তখন মনে হয় তুমি যেন আমাকে কোথাও দংশন করেছে। আর আমার ওপর তোমার বিষের মাদকীয়তা চেপে বসেছে।…..
কিন্তু তোমার সুর-সঙ্গীতকে আমি দংশন করবো না, সুলতানা বললো, কিন্তু তুমি যা চাচ্ছো সেটা হলে তোমার এই অমূল্য সুর সঙ্গীতের মৃত্যু ঘটবে। তখন কিন্তু তোমার আওয়াজ শুনে উন্দলুসের নাগিনী আর ছুটে আসবে না। না তোমার আওয়াজ তাকে এতটুকু দুলাতে পারবে।
তারপর তুমি হয়তো এক নাগিনীকে পিঞ্জরায় বন্দি করে প্রাণহীন সুর সঙ্গীতের প্রতি তাকে আকর্ষণ করতে চেষ্টা করবে, আর নিজেকে নিজে এই ভেবে থোকা দেবে। যে, তোমার বেসুরো সঙ্গীতে এই নাগিনী বুঝি দুলে দুলে উঠছে।
সুলতানা তার মুখ যারিয়ারের একেবারে কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, আমার প্রিয়তমা যাররী! আমি তো তোমারই। তোমারই থাকবো। এসো, প্রেম ভালোবাসার জগত থেকে একটু বের হয়ে এই দুনিয়ার বাস্তবতার মুখোমুখি হও।
যারিয়ার সুলতানাকে তার প্রতি আরো আকর্ষিত করার জন্য ওর একেবারে কাছে চলে গেলো। এত কাছে যে, ওর বিক্ষিপ্ত রেশম কোমল চুলগুলো যারিয়াবের গাল স্পর্শ করতে লাগলো। সুলতানা বললো,
আমাদের স্বপ্নের ভূবনে এক কালো মেঘ কুন্ডলী পাকাচ্ছে।
আর সেই কালো মেঘটা হলো মুদ্দাসসিরা! যারিয়াব সুলতানার কথা পূর্ণ করলো। মুদ্দাসসিরাই শাহে উন্দলুসের বুকে তার মুজাহিদী সত্বাকে জাগিয়ে তুলেছে, তুমি তো এটাই বলতে চাচ্ছিলে!
তুমি যে দাবী করেছো, শাহে উন্দলুসের ওপর তুমি বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। এটা তো মুদ্দাসসিরাই ভুল প্রমাণিত করে দিলো। আব্দুর রহমান আমাদের হাত থেকে ছুটে গেছে। সুলতানা বললো।
সুলতানা! যারিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, কখনো মনে হয়, তোমার ভালোবাসা আমাকে অন্য কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেদিকে আমার যাওয়ার কথা নয়, আমি তো সঙ্গীত জগতের বাদশাহ।
তুমি একজন গোলাম সুলতানা কিছুটা খোঁচা দিয়ে বললো। তুমি এক বাদশাহর গোলাম। ভুলে গেছো তুমি, হাকিম আর সালাররা তোমাকে এক দরবারী গায়ক ছাড়া আর কিছু বলে না? নিজেকে নিজে ধোকা দিয়ো না যিররী। আমি তোমাকে এক রাজ সিংহাসনে বসা অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। আর আমি এই স্বপ্ন নিয়ে নিজেকে তোমার পায়ে সোপর্দ করে দিচ্ছি। তুমি আমাকে তোমার সম্রাজ্ঞী বানাবে।
তুমি আমার হৃদয় রাজ্যের সম্রাজ্ঞী। এসো, কাছে এসো। যারিয়াব মাদকীয় কণ্ঠে বললো।
