মুদ্দাসসিরা! সুলতানা তীক্ষ্মকণ্ঠে বললো, মন থেকে সব আত্ম তৃপ্তি দূর করে দাও। এসব আবেগী কথা বার্তা বন্ধ করো। আমি তোমার কাছে অনুরোধ করছি না। তোমাকে আমি বলছি। শাহে উন্দলুসের ওপর তোমার প্রভাব বিস্তার করা ছেড়ে দাও।
তোমার হুকুম আমি মানতে যাবো কেন? মুদ্দাসসিরা বললো, কোন পুরুষের রক্ষিতা তার স্ত্রীর ওপর হুকুম চালাতে পারে না। আমি বনু উমাইয়ার কন্যা। কারো রক্ষিতা নই।
মুদ্দাসসিরা আর ওখানে দেরি করলো না। তীব্ৰপায়ে হেঁটে ওখান থেকে বেরিয়ে গেলো। সুলতানার ঠোঁটে হাসি খেলে গেলো। বিড় বিড় করে বললো,
একদিন তোমাকে দেখিয়ে দেবো, হুকুম কোন রক্ষিতার চলবে না বৈধ স্ত্রীর?
মারীদার অলিগলি এখন রক্তের নদী হয়ে গেছে। যে ময়দানে বিদ্রোহীদেরকে হত্যা করা হয়েছে সেটা এখন রক্তের বিল।
মারীদার কেল্লা জয় করতে ও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রনে আনতে অসংখ্য মুজাহিদ শহীদ হয়েছে। আহত মুজাহিদের সংখ্যাও কম নয়। আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান শহীদদের দাফন করে আহত ও গাজী মুজাহিদদের নিয়ে এখন কর্ডোভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবেন।
কর্ডোভার লোকেরা তাদের আমীর ও মুজাহিদদেরকে বরণ করে নেয়ার জন্য প্রস্তুত। শাহী প্রসাদও তার আমীরকে যথাযযাগ্য মর্যাদায় বরণ করে নেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
ইতিহাসের অন্যতম সঙ্গীতজ্ঞ যারিয়াব তার কামরায় তারই নিজের সংস্কার করা গিটার নিয়ে বসে আছে। হৃদয়স্পর্শী এক গান গাইছে যারিয়ার। এই গানের গীতিকার সে নিজেই। হৃদয়ের অতি গভীর থেকে তার গানের শব্দগাঁথা বের হচ্ছে। তার গানের সুর মাধুরী থেকে যেন এক রূপসী প্রতিম দরজায় উদয় হলো।
আমীরে উন্দলুস কর্ডোভায় নেই। সুলতানা তাই এখন তার প্রকৃত রূপ নিয়ে এক প্রকার রূপের শাসন জারি করেছে।
যারিয়াবের গানের জাদুকরী সুর লহরী সুলতানাকে দরজার চৌকাঠে যেন বন্দি করে ফেললো। যারিয়াব যেমন স্বপ্নের রঙ্গমহলে বসে গেয়ে যাচ্ছে। সুলতানাও সেই স্বপ্নের সহযাত্রী। এই স্বপ্ন থেকে না সে নিজে, জাগতে চাচ্ছে, না যারিয়াবকে জাগাতে চাচ্ছে। সে জানে, যারিয়ারের সামনে গেলে তার স্বপ্ন ও মুগ্ধতার ভূবন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
যারিয়াব গেয়ে যাচ্ছে। তার গানের কথায় যে নারীর রূপের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে সেটা কোন বেহেশতী হুরের বর্ণনাই হতে পারে। গানের প্রতিটি শব্দ সুলতানার অস্তিত্বের অনুপরমানুতে গিয়ে তরঙ্গ তুলছে। সুলতানা নিজেকে নিজে বলতে লাগলো,
এতো আমার কথাই বলছে। আমি ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না। এতে আমার রূপ ও আমার ভালোবাসার বেদনা বিধুর বর্ণনা দিচ্ছে। এতে আমাকে কল্পনা করে আমারই অদৃশ্য প্রতিমূর্তির পূজা করছে।
সুলতানার রূপ কারো সঙ্গেই তুলনীয় নয়। কোটির মধ্যেও এমন রূপসী মেয়ে পাওয়ার দুস্কর। তবে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি সুন্দরী বলে নিশ্চয় কোন মেয়ে এককভাবে দাবী করতে যাবে না। কিন্তু সুলতানা নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে বলে মনে করতো।
সুলতানা আবার মনে মনে বললো,
একি আমার ভালোবাসার কথাই বলছে? অন্য কেউ তো নয়? তার সুর মুছনা আর গানের কথাগুলো তো আমার রূপেরই অনুবাদ করছে।
সুলতানার আরেকটি রাতের কথা মনে পড়লো। সে রাতে সুলতানাই যারিয়াকে তার জায়গীরে নিয়ে গিয়েছিলো। দুজনে মখমল ঘাসে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছিলো। চারদিক তখন ফুলের সৌরভে সুরভিত। যারিয়াব তাকে বললো,
তুমি আমার কাছে থাকলে তো আমার ব্যক্তিত্ববোধই যেন শেষ হয়ে যায়। আমি তোমার অস্তিত্বে হারিয়ে যাই।
যারিয়াব একথা সুলতানার বাহুধরে আলতো করে তার দিকে আকর্ষণ করে। সুলতানা তার কাছে না এসে দূরে সরে যায়।
আমি তৃষ্ণার্ত। দূরে সরে যেয়ো না। যারিয়াব তৃষ্ণায়পূর্ণ মাদক কণ্ঠে বললো।
ভালোবাসার আসল রহস্য তুমি মনে হয় বুঝোনি। তুমি কি এই না পাওয়ার তৃষ্ণায় দারুণ এক স্বাদ অনুভব করছো না? সুলতানা বলেছিলো।
মিলনের যে কি আনন্দ সেটা কী তুমি জানো না? যারিয়াব জিজ্ঞেস করেছিলো।
কিন্তু মিলনের ব্যকুল প্রতীক্ষায় যে আনন্দ সেটা মিলনে নেই। সুলতানা বলেছিলো।
একবার সে তার দীক্ষাগরু ইউগেলিসকে বলেছিলো, যারিয়াবের ব্যাপারে সে দুর্বল। যারিয়াবকে সে ভালোবাসতে চায়। ইউগেলিস সুলতানকে খ্রিষ্টানদের এক মায়াবী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার জন্য নির্বাচন করে এনেছে। যে অস্ত্র অতি সুক্ষ্মভাবে মুসলমানদের শিকড়ে ছুরি চালাবে। তাই ইউগেলিস তাকে বলে ছিলো,
সুলতানা! শোনো, প্রেম ভালোবাসা পাপ নয়, অপরাধও নয়। কিন্তু যারা নিজেদের আত্মর্যাদাবোধের ব্যাপারে সচেতন, ব্যক্তিত্বের উপলব্ধি যাদের সহজাত তারা নিজেদের উদ্দেশ্য, মিশন ও অমূল্য ব্যক্তিত্ববোধকে শুধু একজন মানুষের ভালোবাসায় বিসর্জন দিতে পারে না।
আমরা তো তোমাকে সাম্রাজ্ঞী বানাচ্ছি। তোমার মধ্যে আমি সম্রাজ্ঞীর মহানত্ব দেখেছি। কিন্তু সেই আসনের শীর্ষচূঢ়ায় পৌঁছতে হলে তোমাকে নাটকের মঞ্চ সাজাতে হবে। যারিয়াবের ওপর তোমার মায়াবী জাল বিস্তার করে রাখো। ওকে জাগতে দিয়ো না। ওকে তোমার রূপ আর রূপের প্রেমে উন্মাতাল হয়ে থাকতে দাও।
আজ রাতে যারিয়াব যখন নিজের সঙ্গীতের সুর মুছনায় নিজেই মন্ত্রমুগ্ধ। এই জাদুর তীব্রতা সুলতানাকেও দারুণভাবে স্পর্শ করেছে। সুলতানা তখন নিজের মধ্যে এক ব্যকুলতা অনুভব করলো। একবার ভাবলো, যারিয়ারকে সে আজই বলবে, তাকে সে ভালোবাসে। কিন্তু এতটুকু ভাবতেই সে এখান থেকে দৌড়ে পালানোর তাড়না অনুভব করলো।
