নিজেদের আমীরুল মুমিনীনকে দেখতেই চারদিক থেকে ঘোষিত হতে লাগলো,
আমীরে উন্দলু এসে গেছেন। আমীরুল মুমিনীন এসে গেছেন।
আব্দুর রহমানের ঝান্ডা দেখে ফৌজ আরো নতুন করে উজ্জিবীত হয়ে উঠলো। আব্দুর রহমান বিভিন্নত হুকুম দিতে শুরু করলেন। তিনি প্রথম হুকুম দিলেন, কাউকে যেন ক্ষমা করা না হয়।
সুর্যাস্তের সময় বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করতে লাগলো। তারপর এদের সবাইকে এক ময়দানে জমা করা হলো। এত বেশি মশাল জ্বালানো হয়েছে যে, অন্ধকারের অস্তিত্ব যেন মিটে গেছে। আব্দুর রহমানের এক হুকুম মতে সৈন্যরা ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পুরুষদেরকে বের করে আনতে লাগলো।
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার, ইউগেলিস এবং ইলওয়ারকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। পাদ্রীদেরকেও পাকড়াও করা হলো।
শহরের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কাদের প্ররোচনায় বিদ্রোহ করেছে? প্রত্যেকেই কারো না কারো নাম নিলো। এদের সবাইকে পাকড়াও করা হলো। এভাবে অসংখ্য লোককে গ্রেফতার করা হলো।
এই গ্রেফতার অভিযান দুদিন চলতে লাগলো। যার ওপরই সামান্য সন্দেহ হলো থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর শহরবাসীকে এক ময়দানে একত্রিত করে বলা হলো,
যদি বেঁচে থাকতে চাও তাহলে বিদ্রোহীদের নেতাদের নাম বলে দাও।
এভাবে বেশ কিছু লোককে পাকড়াও করা হলো। যারা মুসলিম মেয়েদেরকে আপহরণ করে ছিলো এবং মুসলমানদের শত শত ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলো তাদেরকে ভিন্ন এক জায়গায় একত্রিত করা হলো।
আব্দুর রহমান হুকুম দিলেন, এদের সবাইকে কতল করে দাও। তবে যে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার, ইউগেলিস ও ইলওয়ারকে সনাক্ত করতে পারবে তাকে প্রাণভিক্ষ দেয়া হবে। কিন্তু ওদের ব্যাপারে কারোই কিছু জানার কথা নয়।
পরে জানা যায়, এ তিনজন শহরের দরজা খুলতেই শহর থেকে বেরিয়ে যায়। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার লিজবন গিয়ে আশ্রয় নেয়। আর ওই দুজন অন্য কোথাও চলে যায়।
এ সময় আব্দুর রহমান জানতে পারেন, শহরের সর্বপ্রথম ফটক খুলে দেয় এই শহরেই বিদ্রোহীদের হাতে বন্দি থাকা এক কমান্ডার আবু রায়হান। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর বিচক্ষণতা দিয়ে সে এক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তোলে এবং শহীদ হয়ে যায়। তার সঙ্গে বেশ কিছু মেয়েও এই অভিযানে অংশ নেয়।
আব্দুর রহমান আবু রায়হানের মা বাবা; স্ত্রী-সন্তানদেরকে কয়েক লক্ষ্য দিনার পুরস্কার দেন। আর ঐ মেয়েদেরকেও দুহাতভরে পুরস্কার দেন।
মারীদা এখন এক লাশের শহর। এ যেন এক পরিত্যক্ত শহর। পুরো শহরের পরিস্কার পরিচ্ছন্নের কাজ আব্দুর রহমান নিজ হাতে তদারকি করলেন। তারপর মারীদার পূর্বের গভর্ণর যাকে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার কয়েদ করেছিলো তাকেই গভর্ণর নিযুক্ত করলেন।
***
কর্ডোভায় কয়েকদিন আগেই খরব পৌঁছে, আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান অভিযান থেকে ফিরে আসছেন। চাটুকাররা তাদের তোষামোদী প্রতিভা দেখানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। মহলের সাজ-সজ্জা চলতে লাগলো।
যারিয়ার ও সুলতানা তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লোকেরা আগেই তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যে অভিযানে বের হয়েছিলেন আব্দুর রহমান সেটা তো বন্ধ করা গেছে। কিন্তু মারীদার বিদ্রোহ বিদ্রোহীদের রক্তেই ডুবে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে এ সংবাদ এসেছে, যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে আব্দুর রহমান একেবারেই বদলে গেছেন। তার যেন মনেই নেই তিনি শাহে উন্দলুস এবং নিজেকে শাহে উন্দলুস বলতেন।
শাহী মহল সংলগ্ন বাগানের সুবেশী ফুলে ভরা এক সুরভিত কোনে সুলতানা মালিকায়ে তরূব ও মুদ্দাসিরা পায়চারী করছে। মুদ্দাসসিরাকে সুলতানা ডাকিয়ে এনেছে। মুদ্দাসসিরার সঙ্গে সুলতানা এমন ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ কণ্ঠে কথা বলতে লাগলো যেটা আগে কখনো দেখা যায়নি।
না তিনি নিজে যাচ্ছিলেন না সালারদেরকে যাওয়ার হুকুম দিচ্ছিলেন। মুদ্দাসসিরা বললো, তিনি যদি সেনা অভিযানের হুকুম না দিতেন ফ্রান্স উন্দলুসের ওপর হামলা করে বসতো আর মারীদার বিদ্রোহীদেরকেও কাবু করা যেতো না।
তিনি মারা গেলে কি তুমি বিধবা হয়ে যেতে না। তোমার বাচ্চারা কি এতীম হয়ে যেতো না? সুলতানা জিজ্ঞেস করলো।
আল্লাহর পথে মুসলিম নারীরা নিজেদের ভালোবাসার মানুষকে কুরবানী দিয়ে ও সন্তানদেরকে এতীম করতে পিছপা হয় না কখনো। মুদ্দাসসিরা বললো, ইসলামের ইযযত আবরু সব সময় আমাদের কাছে এই ত্যাগ তিতিক্ষা দাবী করে থাকে।
শহীদের স্ত্রী এ কথাটা শুনতে কি আপনি অপছন্দ করেন? শাহে উন্দলুসের ব্যাপারে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন মালিকায়ে তরুব! তিনি শহীদ হয়ে গেলে তো আপনি পরবর্তী স্পেন শাসকের রক্ষিতা হয়ে যাবেন। তাই আপনার তো কোন সমস্যা নেই।
আমি শাহে উন্দলুসের রক্ষিতা নই। আমি তার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছি। আমি সিংহাসনের উত্তরাধিকারকে জন্ম দিতে যাচ্ছি। সুলতানা চ্যালেঞ্জের সুরে বললো।
***
উন্দলুসের মাটি এখনো এতো নাপাক হয়নি যে, এর শাসকবর্গের উত্তরাধিকার সে হবে যার মার তার বাবার সঙ্গে বিয়েই হয়নি। মুদ্দাসসিরা বললো, অবৈধ সন্তান উন্দলুসের আমীর হতে পারবে না। আর মনে রেখো মালিকায়ে তরুর! আমি শাহে উন্দলুসের হাতে তোমার মতো শরাবের পেয়ালা দেবো না; তলোয়ারই দেবো।
