এক লোক রায়হানের দিকে বর্শা ছুঁড়ে মারলো। সেটা রায়হানের গায়ে গিয়ে বিদ্ধ হলো। মেয়েরা আর দেরি করলো না। মুহূর্তের মধ্যেই ওরা বুরুজ থেকে নেমে আসা লোকদেরকে খতম করে দিলো। ওদিকে আবু রায়হান শত চেষ্টা করেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। পড়ে গেলো।
তোমাদের একজন আমাদের ফৌজের কাছে যাও। রায়হান আহতগলায় বললো, সামনে গিয়ে ডান দিকে যাবে। সেখানে আমাদের ফৌজের লোকজনকে পাবে। ওদেরকে বলবে। দক্ষিনের ফটক খোলা হয়েছে।
দলের দুজন পুরুষের একজন দৌড়ে গেলো। দলের অন্যরা সবাই এদিক লুকিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলো। কেউ যদি এদিকে আসে তাকে ওরা সঙ্গে সঙ্গে খতম করে দেবে।
এক অদম্য জলোচ্ছাসের দৃশ্যধারণ করলো সেখানে। মানুষ ও ঘোড়ার সম্মিলিত ঝড় হয়ে দক্ষিণ ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। প্রাচীরের ওপর থেকে তীর বৃষ্টি হচ্ছে। এতে কর্ডোভার কয়েকজন ফৌজ ঘায়েলও হলো। কিন্তু এখন কোন তীর বা বর্শার আঘাত এই ফৌজকে রোখার জন্য যথেষ্ট নয়।
এরা নিয়মিত সৈন্য। লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা এদের অনেক দিনের। বড় কেল্লা এবং কেল্লা বেষ্টিত শহর জয় করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এদের। প্রত্যেক সৈন্য জানে তাকে কি করতে হবে। প্রত্যেকেই কমান্ডারের নির্দেশ পালন করতে জানে।
পুরো এক ইউিনিট সেনা ভেতরে ঢুকে পড়লো। কিছু সৈন্য মশাল জ্বালিয়ে প্রাচীরের ওপর চলে গেলো। এবার বিদ্রোহী বাহিনীর তীরান্দাযরা কচুকাটা হতে লাগলো। ইতিমধ্যে যারা ভেতরে চলে এসেছে তারা আরেকটি ফটক খুলে দিয়েছে। এবার তো বিদ্রোহীরা জীবন-মৃত্যুকে তুচ্ছ করে লড়তে লাগলো।
আবিদীন নামে তদান্তিন এক ঐতিহাসিক ছিলেন। অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকও তার লেখা বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আবিদীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্য উপস্থাপন করেন,
ধর্মদ্রোহী মুআল্লিদীনরা তো জানতো, ওরা বিদ্রোহের অনেক বড় অপরাধী। ওদের এই মারীদা ছাড়া তো অন্য কোন দেশ বা সালতানাত ছিলো না যে, পরায ঘটলে ওদের ওপর জিযিয়া-কর আরোপ করে ওদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে। ওরা তো খেলাফতের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করেছে।
ওরা খেলাফতের পবিত্র মসনদে কালিমা লিপ্ত করে অপমানিত করেছে। মুসলমানদের বাড়ি-ঘরে লুটপাট চালিয়েছে। ওদের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হলো, মুসলিম মেয়েদের ওপর ওরা হাত উঠিয়েছে।
ওদের ইযযত আবরুর ওপর ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর ভয়াবহ শাস্তির কথা তো ওরা জানতো। এই শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ওরা জানবাজি রেখে এমন বেপরোয়া হয়ে লড়তে লাগলো যে, কেল্লার ভেতরে আসা কর্ডোভার ফৌজের পা টলে উঠলো।
এ লড়াই ছড়িয়ে পড়লো শহরের অলিগলি থেকে নিয়ে বাড়ি ঘরের অন্দরমহল পর্যন্ত। দুদলেরই শ্লোগানে আকাশ বাতাস তখন মুখরিত। মুসলিম এক সালারের নির্দেশে এক শ্লোগান শোনা গেলো, কাউকে জীবিত রাখবে না। একজন বিদ্রোহী লুটেরাও জীবিত থাকতে পারবে না। সবগুলোকে শেষ করে দাও। অস্ত্রধারী কাউকে ক্ষমা করবে না।
সকাল হওয়ার পর দেখা গেলো শহরের প্রতিটি গলিতে রক্তের বন্যা বইছে। হাঁটতে গেলেই পা পিছলে যাচ্ছে।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ শহরের দরজা খোলার খবর পেয়েই দ্রুতগতির এক পত্রদূত এই পয়গাম দিয়ে আমীরে উন্দলুসের কাছে পাঠিয়ে দিলেন,
মুহতারাম আমীর! যেকোন ভাবেই হোক শহরের দক্ষিণ প্রান্তের ফটক খোলা গিয়েছে। আমরা শহরে ঢুকছি। ইতিমধ্যে দক্ষিণমুখী ফটক দিয়ে এক ইউনিট সেনা ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
উবাইদুল্লাহ শহরে ঢুকেই হুকুম দিলেন, সরকারি যত ভবন আছে এবং হাকিমদের ভবনের ওপর হামলা চালাও।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি হুকুম দিলেন, এক গেরিলা দল এখনই গিয়ে শহরের অর্থ কোষাগারের দখল নাও। এক সালারকে তিনি এজন্য নির্দেশ দিলেন। আর তিনি নিজে তার মুহাফিজদল ও কিছু সৈন্য নিয়ে কয়েদখানায় চলে গেলেন।
সেখানে সামান্য কিছু লড়াই হলো। কয়েদ খানার প্রধান জেলারকে ধরে আনা হলো। তিনি হুকুম দিলেন, আমীরে মারীদাসহ যতজন মুসলমান কয়েদী আছে সবাইকে ছেড়ে দাও। জেলার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে সবাইকে কয়েদমুক্ত করে দিলো।
সিপাহলার দ্বিতীয় হুকুম দিলেন এবং সালার আব্দুর রউফও একই হুকুম দিলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার, ইউগেলিস ও ইলওয়ারকে জীবিত গ্রেফতার করা হোক। কিন্তু বড় সমস্যা দেখা দিলো, ফৌজের কেউ এই তিনজনকে চিনে না। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বারকে কেবল দুএকজন সালার চিনেন।
তাদেরকে গ্রেফতার করার জন্য শহরের সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো। সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ প্রহরীও নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু এটা কেউ দেখলো না, ততক্ষণে অনেক সময় চলে গেছে। যাদের শহর থেকে পালানোর তারা এতক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে।
***
আবদুর রহমানের কাছে মারীদার খবর নিয়ে পত্রদূত পৌঁছতেই তিনি সালার মুসা ইবনে মুসা এবং সালার ফারতুনকে বললেন,
তোমরা যে পজিশনে তোমাদের সৈন্যদেরকে রেখেছে সেভাবেই রাখো। ফ্রান্সের ফৌজ নজরে পড়লে ওদেরকে সামনেও অগ্রসর হতে দেবে না এবং পিছপাও হতে দেবে না।
একথা বলে তিনি তার মুহাফিজ ইউনিট নিয়ে মারীদার রওয়ানা হয়ে গেলেন। তার দলের চলার গতি রাখলেন খুব দ্রুত। পরদিন দুপুর নাগাদ তিনি মারীদায় পৌঁছে গেলেন। শহরে তখনো লড়াই চলছে।
