ওদের দুজনকেই গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। মারীদা থেকে নতুন খবর আসছে না। তবে আমার বিশ্বাস উবাইদুল্লাহ ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই শহরে ঢুকে পড়বে।
***
সালারে আলা উবাইদুল্লাহ যত দ্রুত সম্ভব শহরে ঢোকার জন্য সব চেষ্টার অতীত করে যাচ্ছেন। সৈন্যরা যে কোন মূল্যে প্রাচীরে সুড়ঙ্গ করতে শহীদ আর যখমী হচ্ছে। কিন্তু শহর প্রাচীরের ওপর থেকে বৃষ্টির মতো তীর আসছে। বর্শা, ভারী পাথর, জ্বলন্ত অঙ্গার, জ্বলন্ত কাঠখন্ডও তাদের ওপর ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। কখনো কখনো মনে হচ্ছে, পাথরের প্রাচীর আগুনের পাহাড় হয়ে গেছে।
কমান্ডার ও সিপাহীদের অদম্য জোশ-জযবা আর অবিরাম হামলার দৃশ্য দেখে উবাইদুল্লাহ আশা করছিলেন কয়েক দিনের মধ্যেই তারা শহরে ঢুকে পড়তে পারবেন। তিনি সালার ও কমাণ্ডারদেরকে বলতেন, আমার সিপাহীরা ফটক ভাঙ্গতে না পারলেও বিদ্রোহী শহরবাসীর মনোবল ভেঙ্গে দেবে ঠিকই।
কর্ডোভার মিনজানীকও দুশমনের তেমন ক্ষতি করতে পারছে না। কারণ, মারীদার তীরান্দাজরা এমন উপযুক্ত জায়গায় মিনজানীক স্থাপন করতে দিচ্ছে না, যেখান থেকে মিনজানীক দ্বারা নিক্ষেপিত পাথর শহরের ভেতর গিয়ে পড়তে পারে।
শহরের ভেতর তো রায়হান তার সতীর্থ ফৌজের জন্য রাস্তা পরিস্কার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরাও তার সঙ্গ দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।
তাদের তো পুরুষালী পোষাকে যাওয়া ভীষণ জরুরি। কিন্তু ওখানে রায়হান ও বৃদ্ধ লোকটি ছাড়া মাত্র দুজন পুরুষ রয়েছে। তাদের পোষাক তো নিজেদের জন্যই দরকার। তলোয়ার, বর্শা ও খঞ্জর যথেষ্ট পরিমাণ না হলেও কাজ চলে যাওয়ার মতো আছে।
অগত্যা সবার কাছে যে পরিমাণ চাদর, অতিরিক্ত কাপড় ছিলো সেগুলো কাজে লাগিয়ে মেয়েদের মুখ, বুক, কাঁধ ইত্যাদি চাদরে ঢেকে নেয়া হলো। রাতের অন্ধকারও অবশ্য ওদের জন্য সবচেয়ে বড় পর্দা। অনেক বড় এক ঝুঁকিতে ওরা পা দিতে যাচ্ছে।
মাঝ রাতের কিছু আগে আবী রায়হান তাদের ভুতুড়ে আস্তানা থেকে বের হলো। তার সাথে রয়েছে দুজন পুরুষ ও দশটি মেয়ে। ওদের জন্য এখন দরকার শহরের ভেতরে হৈ-হুঁলুস্থল অবস্থার সৃষ্টি হওয়া।
ঘটনাক্রমে শহরের লোকজনের মধ্যে হুলস্থল বেঁধে গেছে। কারণ, কর্ডোভার ফৌজ মিনজানীক এখন এমন জায়গায় স্থাপন করতে পেরেছে যেখান থেকে নিক্ষেপিত পাথর প্রাচীর টপকে শহরের ভেতরে এসে পড়ছে।
কয়েকটি ভারি পাথর বাড়ি ঘরের ছাদে গিয়ে পড়লো। ভেতরের লোকজন বাবাগো-মাগো বাঁচাও বাঁচাও, বলে বেরিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। এদেরকে দেখে শহরের লোকদের মধ্যেও হুল্লোড় লেগে গেলো। বাড়ি-ঘর দালান কোঠা থেকে লোকজন বেরিয়ে আসতে লাগলো। শহরময় হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেলো।
***
রায়হানের রুখ দক্ষিণ ফটকের দিকে। সে একটু এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গীদের এবং মেয়েদেরকে শেষবার বলে দিলো তাদের কী করতে হবে। কোথায় কোথায় সতর্ক থাকতে হবে।
এখন প্রত্যেকে এতটুকু দূরত্বে থেকে সামনে বাড়বে যেন একজনের সঙ্গে আরেকজনের কোন সম্পর্ক নেই। আর হাঁটতে হবে প্রায় ছোটার মতো করে। কারণ, সবাই কিন্তু ছুটোছুটি করছে। ধীরপদে চললে লোকে সন্দেহ করতে পারে। আবু রায়হান তাদেরকে বলে দিলো।
দুক্ষিণমুখী ফটকের সামনে এসে গেলো ওরা। ওখানে চার পাঁচটি মশাল জ্বলছে। শহরে হুলুস্থুল আরো বেড়ে গেছে। ফটকের সামনে ও ডানে বামে কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। ফটকের ওপর বুরুজে তীরন্দাজরা রয়েছে। তবে এখন ওদের মধ্যে বেশ টিলেটালা ভাব। কারণ, এদিক থেকে কর্ডোভার ফৌজ সরে গেছে।
আবী রায়হান তার গেরিলা দলটিকে অন্ধকারে লুকিয়ে রাখলো।
তারপর নিজে ফটকের দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুট লাগালো। ওদের স্থানীয় ভাষা সে ভালোই জানে। তাদের ভাষায় বেশ ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বললো, এখানে এতগুলো মানুষ কি করছে? এই ফটকের সামনে তো দুশমনের কোন ফৌজ নেই। আর ওদিকে প্রধান ফটক ভেঙ্গে ফেলছে দুশমনরা। মুসলমানদের তো ভেতরে ঢুকতে আর দেরি নেই। আমাকে শুধু এতটুকু বলে তোমাদের দিকে দৌড়ানো হয়েছে যে, ওদের সবাইকে প্রধান ফটকের দিকে নিয়ে এসো। বলা হয়েছে, এখানে চার পাঁচজন থাকলেই চলবে। বাকিরা সবাই ওদিকে চলে যাও… তাড়াতাড়ি এসো হতভাগারা! শহর তো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
ওরা নিজেরাই জরুরি ভিত্তিতে ফায়সালা করলো, কে কে ফটকের সামনে থাকবে। আর বাকিরা প্রধান ফটকের দিকে দৌড় লাগালো। দক্ষিণ ফটকে মাত্র চারজন লোক রইলো। বাকিরা এতক্ষণ বেশ দূরে চলে গেছে। আবু রায়হানও ওখান থেকে সরে এলো।
রায়হান ফিরলো তার নিজের লোকজন নিয়ে। এরা এই চারজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। মেয়েরা তাদের তলোয়ার আর বর্শার আঘাতে ওদেরকে শেষ করে দিলো।
তারপর ওরা সবাই মিলে ফটকের এক দিক খুলে ফেললো।
আমি আমাদের ফৌজকে খবর দিতে যাচ্ছি। রায়হান বললো, সবাই তোমরা এই ফটকে থাকতো। কেউ এদিকে এসে ফটক বন্ধ করতে চাইলে যাতে তা না পারে।
ফটকের ওপরের বুরুজ থেকে তিন চারজন লোক নিচে নেমে এলো। সেখানে কয়েকটি মশাল জ্বলছে। ওরা দেখলো ফটক সামান্য খোলা। রায়হান তখনই বাইরে বের হচ্ছিলো। সেটাও ওরা দেখে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে দেখলো, ফটকের সামনে চারটি মানুষ তাজা রক্তে ডুবে আছে।
