সূর্যাস্তের পর রায়হান প্রাচীন ধ্বংস গাঁথায় চলে গেলো।
আমার পয়গাম পৌঁছে গেছে। রায়হান সবাইকে জানালো, দক্ষিণের ফটক থেকে আমাদের ফৌজ সরে গেছে। তবে আমদের সালারের নজর এই ফটকের ওপর নিবদ্ধ থাকাবে। তাই আজ রাতেই ফটক খুলতে হবে। কিন্তু আমি যে পরিকল্পনা করেছি এর জন্য শুধু আমাদের এই তিনজন লোকই যথেষ্ট নয়। কম পক্ষে দশজন দরকার।
এই প্রয়োজন আমরা পূরণ করবো এক মেয়ে বললো। কমান্ডার! তুমি কি করতে চাও সেটা শুধু বলো।
হ্যাঁ, ওদেরকে নিয়ে যাও। এ ছাড়া উপায়ও নেই অবশ্য। বৃদ্ধ লোকটি বললেন।
তবে পুরষদের পোষাক পরে যেতে হবে ওদের। কারো সামান্যতম সন্দেহ হলেও এর যে কী পরিণতি হবে তা তো বুঝতেই পারছো তোমরা। রায়হান। বললো।
এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন যদি আমরা হই তাহলে আমরাও কাউকে কোনো সুযোগ দেবো না। প্রাণ বাজি রেখে লড়বো। তারপর প্রাণ দেবো। এক মেয়ে বললো।
আবী রায়হান তার পরিকল্পনার কথা ওদেরকে জানালো।
***
আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান এখনো মারীদা থেকে বেশ দূরে। তাঁর সৈন্যদেরকে তিনি দূর দূরন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। দ্রুতগামী পত্রদূতের মাধ্যমে সবার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এই বাহিনীর গেরিলা ইউনিটের সৈন্যরা প্রায় সারাক্ষণ ঘোড়ার ওপর সাওয়ার থেকে টহল দিয়ে যাচ্ছে।
ওদিকে সাধারণ কৃষকের পোষাকে কিছু অভিজ্ঞ সৈন্য দুশমনের চৌকি পর্যন্ত মোতায়েন রয়েছে।
আব্দুর রহমান যদিও এক জায়গায় তার অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার স্থাপন। করেছেন। কিন্তু তার অধিক সময়ই ঘোড়ার পিঠের ওপর কাটছে। প্রতিটি ইউনিটের কমান্ডারদের কাছে গিয়ে রিপোর্ট নিচ্ছেন। কিছু বলার থাকলে বলছেন। এটা ওটার নির্দেশ দিচ্ছেন। মুসাইবিনে মুসা ও ফারতুন এই দুই সালার সব সময় ছায়ার মতো তার সঙ্গে রয়েছেন।
অতন্দ্র-সজাগ এক সৈনিক বনে গেছেন এখন আব্দুর রহমান। যেন যুদ্ধের ময়দানেই তাঁর জন্ম এবং এই ময়দানেই তিনি প্রাণ নজরানা দিয়ে রেখেছেন। সঙ্গীতের মাদকীয় সূরে আর রূপ-যৌবনের অপার মোহে ডুবে থাকা আব্দুর রহমান এখানে এসে এমন সতর্ক আর স্বত:স্ফুর্ত যেন চিতা তার শিকারের পেছন ধাওয়া করে যাচ্ছে।
তার আত্মিক শক্তি আর দুঃসাহসিক চেতনা এখন সতত জাগ্রত। তিনি যেন তার অজান্তেই মানবীয় স্বভাবের এই প্রকৃতিকে উন্মোচন করছেন যে, মানুষ যখন চাইবে, স্বংকল্প করবে তখন তার আত্মিক ও দৈহিক শক্তি জাগ্রত করে আকাশের বিদ্যুৎকেও হার মানাতে পারে।
ঐ লুটেরা কাফেরের দল যদি এই চেষ্টায় থাকে যে, আমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে তাহলে তারা দারুণভাবে হতাশ হবে। আবদুর রহমান একদিন রাতে তার দুই সালারকে বললেন, সালতানাতে ইসলামিয়া সংকুচিত হবে না; বরং সম্প্রসারিত হবে। ক্রমেই এর সমৃদ্ধিই ঘটবে। উন্দলুস শহীদদের আমানত। উলসের আবরু ইযযত ইসলামেরই সম্ভ্রম। নাপাক রক্ত থেকে এর মাটিকে আমরা পবিত্র রাখবো।
তাঁর দুই সালার তার এই জ্যবাদীপ্ত অবস্থায় একথা বলতে ইতস্ত করলেন যে, আপনি যারিয়াব ও সুলতানার মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসুন। তাঁদের আশংকা, যারিয়াব ও সুলতানার কথা শুনে যদি তিনি বলে উঠেন, যারিয়াব ও সুলতানাকে এখানেই ডেকে নিয়ে এসো।
ফ্রান্সের শাহেলুইকে আমাদের চিরতরে খতমকরে দিতে হবে। আবদুর রহমান অনঢ় সংকল্পের গলায় বললেন, ফেতনা আর ষড়যন্ত্র যেখান থেকে মাথাচাড়া দেবে সেখানে আল্লাহর বজ্ৰ হুংকার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।…..
মারীদার বিদ্রোহীদেরকে যখন হাতে পাবো। কারো প্রতিই করুণা করবো না। ইসলামের শত্রু ও মুসলমানদের ধ্বংসকামীদেরকে যদি ক্ষমা করে দিই তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে এই দুনিয়ায় এবং আখেরাতেও এর সমুচিত। শাস্তি দেবেন।
কিন্তু আল্লাহর পথে তার দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে আমি ফরজ বলে বিশ্বাস করি। আল্লাহর দুশমন কাফেররা অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পন করবে। জান ভিক্ষা চাইবে, বন্ধুত্বের জনস্য তোমাদের পায়ে মাথা ঠুকবে তবুও কখনো তাদেরকে বিশ্বাস করবে না।
কিন্তু আমীরে মুহতারাম! সালার ফারতুন বললেন, কুরআনের হুকুম হলো, দুশমন সন্ধির জন্য হাত বাড়ালে তোমরা সন্ধি করে নাও।
এটাও কুরআনের হুকুম যে, ওদের ওপর কখনো বিশ্বাস রাখবে না। আব্দুর রহমান বললেন, ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করার নির্দেশ দিয়েছে কুরআন। কারণ, ওরা ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি না করে ক্ষান্ত হয় না। ওদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করলে ওরা যখন দেখবে নিজেদের স্বার্থ হাসিল হয়ে গেছে ওরা তখন তোমাদেরকে না জানিয়েই চুক্তি ভেঙ্গে ফেলবে।….
তোমরা কী দেখতে পাচ্ছো না এরা আমাদেরকে নিয়ে যেমন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। মারীদার বিদ্রোহ তখন হয়েছে যখন ফ্রান্সের দিকে অভিযান চালাতে যাচ্ছিলাম। এরা ফ্রান্সকে আমাদের হামলা থেকে বাঁচানোর জন্য মারীদার লোকজনকে ক্ষেপিয়ে বিদ্রোহ করিয়েছি।
আপনি কি জানেন! মারীদার বিদ্রোহের কল-কাঠি কে নেড়েছে? সালার মুসা ইবনে মুসা জিজ্ঞেস করলেন।
মারীদার বিদ্রোহ তো মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বারের হাত ধরে পুর্ণতা পেয়েছে। আব্দুর রহমান বললেন, তবে ওর পেছনে খুঁটি নাড়ছে খ্রিষ্টান নেতারা।
এদের একজন হলো ইউগেলিস আরেকজন ইলওয়ার। মুসা ইবনে মুসা বললেন।
