কিন্তু বিদোহীরা দারুণ নির্ভীকতার সঙ্গে এর মোকাবেলা করছে। কর্ডোভার ফৌজ চারো ফটকের ওপর হামলা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ফটকের ওপরই বুরুজ রয়েছে। যেখন থেকে নিক্ষেপিত তীর আর বর্শা হামলাকারীদেরকে রক্তাক্ত করে পিছু হটিয়ে দিচ্ছে।
আবী রায়হান প্রাচীর থেকে নেমে এলো। তার মাথায় নতুন একটি চিন্তা এলো। এখন সেটা বাস্তবায়ন করতে হলে কাগজ কলম দরকার। সে একটি বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজায় টোকা দিলো। এক মহিলা দরজা খুলে দিলো। সশস্ত্র লোক দেখে মহিলা বুঝলো, এ লোক সিপাহী ছাড়া অন্য কেউ নয়।
এই যে আপা! তিন চারটি কাগজ, কলম, আর কালি দরকার। এক কমান্ডার পাঠিয়েছেন। তাড়াতাড়ি করুন। আবী রায়হান জরুরি গলায় বললো।
ওখানে তো লোকজন নিজেদের রক্ত পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। মহিলা দ্রুত কাগজ, কলম, কালি নিয়ে এলো।
আর কিছু কি লাগবে ভাই? মহিলা জিজ্ঞেস করলো ব্যাকুল হয়ে।
না, ধন্যবাদ।
আবী রায়হান সেগুলো নিয়ে বহুপথ ঘুরে প্রাচীন ধ্বংস গাথায় চলে গেলো। ওখানে যারা আছে এর মধ্যে বেশ কয়েকজন মেয়ে শিক্ষিত এবং হাতের লেখাও বেশ পরিস্কার ও গুছানো। তাদেরকে দিয়ে তিনটি কাগজের ওপর একই কথা লেখালো। লেখা ছিলো এরকম,
দক্ষিণমুখী ফটকের কাছ থেকে সব ফৌজ সরিয়ে নিন। অধিক সৈন্য প্রধান ফটকের আশে পাশে মোতায়েন করুন। এতে বিদ্রোহীরা দক্ষিণমুখী ফটক থেকে তাদের সব মনোযোগ হটিয়ে প্রধান ফটকের ওপর নিবদ্ধ করবে। রাতে আমরা দক্ষিণ প্রান্তরের ফটক খোলার চেষ্টা করবো।
লেখার নিচে রায়হান নিজের নাম লেখলো এবং পদবীও উল্লেখ করলো।
লিখিত কাগজ তিনটি ভাঁজ করে প্রত্যেকটি তীরের মধ্যে সুতা দিয়ে বেঁধে দেয়া হলো। প্রত্যেকটি তীরের সঙ্গে একটা করে কাপড় বেঁধে দেয়া হলো। যার অর্থ হলো, এই তীরের সঙ্গে বিশেষ পয়গাম রয়েছে।
আবী রায়হান তীর তিনটি তুনীরে ভরে ধনুক নিয়ে পোড়া এলাকা থেকে বেরিয়ে এলো। সেখান থেকে এমনভাবে বেরিয়ে এলো যে, সতর্ক চোখও তাকে দেখতে পেলো না।
***
রায়হান প্রাচীরের ওপর উঠে গেলো। সে দেখলো, অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে যারা লড়ছে তারা মূলত শহরবাসী। নিয়মিত ফৌজের সিপাহী নয়। তাদেরকে সরাসরি কমান্ড করার মতো কেউ নেই। আর না ওদের আছে কারো কমান্ড মেনে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা। সেও ওদের দলের অংশ হয়ে গেলো।
রায়হান প্রাচীরের দক্ষিণ দিকে গেলো এবং লিখিত কাগজ বাঁধা একটা তীর বের করলো। ওর ধনুকটি বেশ মজবুত। ধনুকটি এমনভাবে টেনে ধরলো, যাতে তীর অনেক দূর পর্যন্ত ছুটে যায়। ধনুক যতটুকু টানার টেনে তীর ছুঁড়ে দিলো।
এই তীর সেসব তীরের মিছিলে যোগ দিলো যেগুলো বিদ্রোহীরা ওপর থেকে ছুঁড়ে মারছে। আবু রায়হান তার ছোঁড়া তীরটির দিকে তাকিয়ে রইলো। তীরটি কার্ডোভার ফৌজি ছাউনির প্রায় মাঝখানে গিয়ে পড়লো।
রায়হান ওখান থেকে সরে প্রাচীরের ওপর দিয় হেঁটে হেঁটে একটু দূরে গিয়ে দ্বিতীয় তীরটি ছুড়লো। এভাবে আরেকটু দূরে গিয়ে লিখিত পয়গাম বাঁধা তৃতীয় তীরটি ছুড়লো।
কর্ডোভার এক সিপাহীর সামনে একটি তীর গিয় পড়লো। এর মধ্যে কাগজ বাধা দেখে সিপাহীর কৌতূহল হলো। সে এটি তুলে তার ইউনিট কমান্ডারকে দিলো। কমান্ডার সুতোয় বাঁধা কাগজটি সুতোমুক্ত করে ভাজ খুলে পয়গামটি পড়লো।
পয়গামটি পড়ে সালার আব্দুর রউফের কাছে নিয়ে গেলো। আব্দুর রউফ সেটি সিপাহসালার উবাইদুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন।
এটা থোকাও হতে পারে। উবাইদুল্লাহ এটি দেখে বললেন।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আব্দুর রউফ বললেন, একটি থোকা তো এই হতে পারে যে, আমরা দক্ষিণ দিকের ফটকের সামনে থেকে সৈন্য সরিয়ে নিলে বিদ্রোহীরা সেই দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়ে আমাদের ওপর হামলা করতে পারে। আর এমন ঘটলেও কোন অসুবিধা নেই। কারণ, এ থেকেও আমাদের যথেষ্ট ফায়দা উঠাতে পারি। বিদ্রোহীরা বাইরে এলেও ওদেরকে আমরা ভেতরে আর যেতে দেবো না। সেই ফটক দিয়ে আমরাই ভেতরে ঢুকে পড়বো।
আরেকটি থোকা এই হতে পারে যে, ফটক খোলা দেখে আমরা যখন ভেতরে ঢুকবো তখন হতে পারে, চারপাশ থেকে গুপ্ত ঘাতকরা আচমকা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। উবাইদুল্লাহ বললেন।
আমরা ভেতরে ঢোকার পর কীসের সম্মুখীন হতে হবে সেটা ভাবনার বিষয় নয়। আব্দুর রউফ বললেন, যে করেই হোক আমাদের যে কোন একটি ফটক খোলা চাই। তখন আমার পূর্ণ এক ইউনিট সেনা বাঁধ ভাঙ্গা জ্বলোচ্ছাসের মতো ভেতরে ঢুকে পড়বে। তখন গুপ্ত ঘাতকরা এমনিতেই ভেসে যাবে। ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে।
সিদ্ধান্ত হলো ঝুঁকিই নেয়া হবে।
***
সূর্যাস্ত হচ্ছে। এ সময় রায়হান প্রাচীরের ওপর থেকে দেখলো, দক্ষিণমুখী ফটকের সামনে থেকে কর্ডোভার মোতয়েনকৃত ফৌজ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। যেন অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে।
ওদিকে প্রধান ফটক ও পশ্চিম প্রান্তের ফটকের ওপর অবিরাম হামলা চালানো হচ্ছে। প্রাচীরের ওপর তীরান্দাযদের বিশাল ভিড় লেগে আছে। এরাও ওই ফটকগুলোর আশে পাশে গিয়ে ভিড় করতে লাগলো।
এখানে অবস্থা বা পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন ঘটলে প্রাচীরের লড়াকুরা উঁচু আওয়াজে সেটার ঘোষণা করে দেয়। এবার তাদের একটি ঘোষণা শোনা গেলো,
দুশমন দক্ষিণ মুখী ফটক থেকে সরে গেছে। অন্যান্য ফটকগুলোর প্রতি সবাই মনোযোগ দাও। হুশিয়ার! সাবধান!
