উবাইদুল্লাহ সালার আব্দুর রউফকে হুকুম দিলেন, তিনি তার ইউনিটকে আরো দ্রুত যেন চলার হুকুম দেন এবং মারীদা শহর অবরোধের আওতায় নিয়ে নেন। আর ওযীর হাজিব আব্দুল করীমকে বললেন, তিনি যেন তার ইউনিটগুলোকে অবরোধকারীদের পেছনে নিয়ে পজিশনে দাঁড় করিয়ে দেন।
রাতের প্রথম প্রহরে মারীদার প্রাচীরের ওপর থেকে শোর গোল উঠলো,
দুশমন এসে গেছে, শহর অবরোধ হয়ে গেছে, আমরা এখন এ শহরে অবরুদ্ধ, খবরদার! হুশিয়ার!!
তখনই প্রাচীরের ওপর থেকে কর্ডোভার ফৌজের ওপর তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু ফৌজ তীরের নাগালের অনেক বাইরে। অসংখ্য তীর বৃথাই ছোঁড়া হতে লাগলো। সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ উঁচু আওয়াজে ঘোষণা করলেন,
আমরা মারীদার বিদ্রোহীদের ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ দিচ্ছি। শহরের দরজা খুলে দাও। আমরা তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো। কাউকে গ্রেফতার করা হবে না।
সাহস থাকলে সাহস দেখাও মুসলমানের বাচ্চারা। প্রাচীরের ওপর থেকে জবাব এলো, এগিয়ে এসে পারলে দরজা খুলে নাও।
কর্ডোভার এক কমান্ডার প্রধান ফটকের একেবারে কাছে চলে গেলো। কমান্ডার মারীদার বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে বললো,
আমীরে উন্দলুস এই অবরোধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যদি অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পন না করো তাহলে….
কমান্ডার এতটুকু বলতেই চার-পাঁচটি তীর দেহে বিদ্ধ হয়ে গেলো।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ যখন দেখলেন বিদ্রোহীরা কোনোভাবেই আত্মসমর্পন করবে না। তিনি হুকুম দিলেন, ফটকগুলোর ওপর হামলা চালাও। কিন্তু বিদ্রোহীরা প্রাচীরের ওপর থেকে জ্বলন্ত কাঠ আর আগুনের অঙ্গার ফেলতে শুরু করলো। প্রথম হামলায় যারা গেলো তারা আগুনে জ্বলতে জ্বলতে ফিরে এলো।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ শহরের আভ্যন্তরীণ অবস্থান সম্পর্কে জানেন। তিনি দুটি বড় মিনজানীক প্রস্তুত করলেন। তারপর শহরের ভেতর পাথর নিক্ষেপের হুকুম দিলেন।
***
প্রাচীরের ওপর এত বেশি শোরগোল যে, সে আওয়াজ শহরের প্রাচীন ধ্বংস স্তূপে লুকানো লোকেরাও শুনতে পাচ্ছে।
আবী রায়হান একটি বর্শা ও একটি তলোয়ার নিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লো। সে দেখতে চাচ্ছে ফটকগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোন ত্রুটি আছে কিনা। এখন আর তার ধরা পড়ার আশংকা নেই। চার দিকেই সবাই ব্যতিব্যস্ত। লোকজন ছুটোছুটি করছে হন্যে হয়ে। কে কার পাশ দিয়ে যাচ্ছে সেদিকে তাকানোর ফুরসত নেই কারো। কেউ কাউকে কখন জিজ্ঞেস করবে তুমি কে এবং কোথায় যাচ্ছো।
আবী রায়হান চোখমুখ চাদরে ঢেকে এই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলো। প্রত্যেকটি ফটকের কাছে গিয়ে দেখলো। শত শত প্রহরী ফটকগুলোর চারপাশে পজিশন নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। ভেতর থেকে কোন ফটকই ভোলা সম্ভব নয় এবং কোনটার ফাঁক গলেও বাইরে যাওয়া অসম্ভব।
আবী রায়হান দেখলো, একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী শ্লোগান দিতে দিতে প্রাচীরের দিকে যাচ্ছে। সেও কর্ডোভার ফৌজের বিরুদ্ধে ওদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে এবং মুসলমানদেরকে গালিগালাজ করতে করতে প্রাচীরের দিকে চলে গেলো।
সেখানে শহরবাসীদের ভিড়ের চাপ এত বেশি যে, দাঁড়ানোর মতো জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়লো। এখানে ভিড় করা সশস্ত্র লোকদের অধিকাংশই বাইরে কর্ডোভার ফৌজি শিবিরের দিকে তীর ছুড়ছে।
এ সময় অবরোধকারীদের দিক থেকে মিনজানীক দিয়ে ছোঁড়া একটি ভাড়ী পাথর প্রাচীরের ওপরে এসে পড়লো। পুরো প্রাচীর থর থর করে কেঁপে উঠলো। দশ বারজন প্রাচীর থেকে তখনই খসে পড়লো নিচের দিকে। দুতিনজন প্রাচীরের ওপরেই পাথরের আঘাতে চিরা-প্যপ্টা হয়ে মারা পড়লো।
আবী রায়হান খুশি হলেও নিজে কিছুই করতে পারেনি বলে হতাশ হয়ে ওখান থেকে চলে এলো।
***
আবী রায়হান আবার প্রাচীন ধ্বংস গাঁথায় ফিরে এলো। ওখানে যারা লুকিয়ে আছে ওদেরকে জানালো, রাতের অন্ধকারে বাইরের অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নি।
তবে যে করেই হোক আমার ফৌজের জন্য আমি যে কোন একটি ফটক খোলার চেষ্টা চালাবোই। এতে জানের বাজি লাগাতে হলেও লাগাবো। আবী রায়হান বললো।
তোমার সঙ্গে আমরাও জানের বাজি লাগাতে চাই। ওদের একজন বললো।
হ্যাঁ, আমরাও পিছিয়ে থাকবো না। মেয়েরা সমস্বরে বলে উঠলো।
বন্ধুরা! সুযোগ এলে তোমরা অবশ্যই তোমাদের বীরত্ব প্রতিভা দেখাতে পারবে। কিন্তু এখনই এর প্রয়োজন পড়বে না। আবী রায়হান বললো।
সকাল হতেই আবী রায়হান বেরিয়ে পড়লো। ওর চেহারা কাপড়ে ঢেকে নিলো। প্রাচীরের ওপর গিয়ে চড়লো। নিজের ফৌজকে এবার ভালো করে দেখতে পেলো। শহরবাসীদের শস্যক্ষেত ও ফল বাগান বেশির ভাগই শহরের বাইরে। এগুলো এখন কর্ডোভার ফৌজের দখলে।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ হুকুম দিলেন। ক্ষেতের সব ফসলগুলো কেটে ফেলল। বাগানগুলোও পরিস্কার করে দাও। হাজারো তলোয়ার পাকা আধাপাকা ফসলগুলোর ওপর উঠানামা করতে লাগলো। এগুলো ঘোড়ার দানাপানি হিসাবে ব্যবহার করার জন্য একত্রিত করা হতে লাগলো। বিভিন্ন ফলের বৃক্ষও কুড়াল দিয়ে কাটা হতে লাগলো।
আবী রায়হান লক্ষ্য করলো, কর্ডোভার ফৌজের সিপাহীরা প্রাচীরে রশিযুক্ত আংটা প্রাচীর গাত্রে গাঁথার জন্য এগিয়ে আসছে। তাদের পেছনে তীরন্দারা পজিশন নিচ্ছে। যাতে প্রাচীরের ওপরের দুশমনরা এদের তীরান্দাযীর কারণে মথা তুলতে না পারে। এবং প্রাচীর সুড়ঙ্গকারীরা অক্ষত অবস্থায় প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
