***
যে কোন কুরবানীর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। দুই জনের একজন আবী রায়হানকে বললো, ভেতর থেকে ফটক খোলার কিংবা তোমার সিপাহীদেরকে কোন ধরণের সাহায্য করার পথ বের করতে পারবে না তুমি? তুমি তো অভিজ্ঞ সৈনিক। কমান্ডারও। অনেক কিছুই তো জানো তুমি।
আমি শুধু সাধারণ সৈনিকের ট্রেনিং নিইনি, গেরিলা সৈনিকও আমি। আবী রায়হান বললো। কিন্তু আমাদেরকে এই মেয়েদেরও হেফাজতের চিন্তা করতে হবে। এরা না হলে অবশ্য এখনই কাজে নেমে পড়া যেতো।
আমরা মেয়ে বলে তো আমাদের শরীর মোমের তৈরি নয়; এক ঘোড়ষী মেয়ে বললো, তোমরা আমাদেরকে সিপাহীদের মতো লড়াতে চাইলে আমরা তোমাদেরকে হতাশ করবো না।
আমরা পালিয়ে এখানে এজন্য লুকিয়ে বসে আছি যে, দুশমনের সংখ্যা পঙ্গপালের মতো। এধরনেরই আরেকটি মেয়ে বললো, লড়াই যদি পৃথক পৃথক হয় তাহলে কাবার রবের শপথ! আমরা পালানোর কথা মোটেও চিন্তা করবো না। আমরা বীর লড়াকু মুসলমানদের মেয়ে। কমান্ডার! তুমি কোন পরিকল্পনা ভেবে দেখো। আমাদের সৈনিক মনে করো। আমাদের ইযযত আবরুর কথা চিন্তা করো না।
এখন তোমরা এখানেই থাকো। আবী রায়হান বললো, খবর সঠিক হলে আজ রাতেই মারীদা অবরোধ হওয়ার কথা। আমাকে ভাবতে দাও। তোমাদের কাছে অস্ত্র-শস্ত্র কী আছে?
এখন আমরা এখানেই থাকবো। আর আমাদের কাছে আছে চারটি বর্শা, নয়টি তলোয়ার, কয়েকটি খঞ্জর, তিনটি ধনুক এবং অনেকগুলো তীর আছে। কেউ একজন জবাবে বললো
এতো বলতে গেলে মাশাআল্লাহ অনেক। রায়হান খুশি হয়ে বললো। খ্রিষ্টানরা নিজেদের মেয়েদেরকে মাটির নিচ দিয়ে, রাতে দুশমনের শয়নগৃহে এবং তাদের রূপ যৌবনকে চরম অস্ত্র বানিয়ে ব্যবহার করে। কিন্তু আমি ত করবো না। আমরা মুসলমান। আমি তোমাদেরকে সিপাহী বানিয়েই লড়াই করব। এটাই ইসলামের শান-অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য।
খ্রিষ্টানদের মেয়েরা যেমন করে মুসলিম মেয়েরা দুশমনের সামনে তেমন করে নেচে গেয়ে, অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গি করে দুশমনকে জাদুমুগ্ধ করে না। তারা তলোয়ারের ঝলক আর নির্ভীকতা দিয়ে দুশমনকে কুপোকাত করে দেয়। তৈরি থেকো আমার প্রিয় বোনেরা! আর কয়েকদিন অভুক্ত থাকার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রাখো।
***
সে রাতেই মারীদা অবরোধ হয়ে গেলো। মারীদার লোকেরা এরাতে মুহূর্তের জন্যও দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি।
সূর্যাস্তের পর থেকেই খবর আসতে থাকে কর্ডোবার ফৌজ শহরের কাছাকাছি চলে এসেছে। তখন থেকেই লোকেরা যার যার ঘরে খাদ্য সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জমা করতে থাকে। যাতে শহরে খাদ্য সংকট দেখা না দেয়।
শহরের চারটি প্রধান ফটকই ভেতর থেকে সিলগালা করে বন্ধ করে দেয়া হলো। অস্ত্র ধরতে জানে এমন প্রত্যেকেই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। প্রত্যেকেই তীরে পূর্ণ তিন চারটি করে তুনীর নিজের সঙ্গে রাখলো।
শহরের প্রাচীরের ওপর বড় বড় পাথরের অনেকগুলো স্তূপ রাখা হলো। অনেক জ্বালানি কাষ্ঠও সুপিকৃত করে রাখা হলো।
কর্ডোভার সিপাহীরা শহর প্রাচীরের কাছে ঘেষলে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জ্বলন্ত লাকড়িও তাদের ওপর ছোঁড়া হবে। যদি সিঁড়ি বা ঝুলন্ত রশি লাগিয়ে প্রাচীর বেয়ে ওপরের উঠার চেষ্টা করা হয় তাহলে জ্বলন্ত আঙ্গারসহ ফুটন্তপানি ছিটানোরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রতিটি ফটকের চারপাশে অসংখ্য লোক তীর ও বর্শা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলো ফটক ভেঙ্গে হামলা চালালে হামলাকারীরা যেন ভেতরে ঢুকতে না পারে। শহরের প্রাচীর থেকে অবরোধকারীদেরকে দূরে হটিয়ে রাখার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থাই নেয়া হয়েছে।
মারীদার সামান্য দূরে থাকতেই সালার আবদুর রহউফের ইউনিটের দেখা পেয়ে যান সিপাহসারার উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ। সালার আব্দুর রউফের সেনা ইউনিটগুলোর নেতৃত্বও তিনি নিয়ে নিলেন।
উবাইদুল্লাহ সেনা ইউনিটগুলোকে পূণর্বিন্যাস করে প্রয়োজনীয় কিছু সৈন্যকে সাধারণ কৃষকের বেশে আগেই মারীদার দিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মারীদার বিদ্রোহী বাহিনী যদি শহরের বাইরে এসে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয় তাহলে ওরা এসে সিপাহসালারকে সেটা জানাবে।
কিন্তু উবাইদুল্লাহর কাছে খবর আসতে থাকে শহরের বাইরে দুশমনের ফৌজের নাম নিশানাও নেই।
বন্ধুরা আমার। উবাইদুল্লাহ তার সালারদের বললেন, মারীদার লুটেরা বিদ্রোহীদের মধ্যে যদি রণ কৌশলের সামান্যতম ধারণা থাকতো তাহলে ওরা শহর থেকে বেশ দূরে থাকতেই আমাদেরকে বাঁধা দিতো এবং এ লড়াই দীর্ঘ করতে বাধ্য করতো। এমন তো নয় যে, আমাদের ফৌজ আসার খবর ওরা জানে না। ওরা শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতই মজবুত করে নিয়েছে যে, অবরুদ্ধ হয়ে লড়াই করতেই ওরা বেশি নিরাপদ মনে করছে।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ তার ফৌজকে আরো বিস্তীর্ণ করে দিলেন। সম্মুখভাগের ইউনিটগুলোকে দারুণ শক্তিশালী রাখলেন। যাতে কোথাও গুপ্তঘাতক থাকলে সমুচিত জবাব দিতে পারে। কিন্তু যতই তারা এগিয়ে যেতে লাগলো গুপ্তঘাতক বা অযাচিত লড়ায়ের সম্ভাবনা বা আশংকা কমে আসতে লাগলো।
যতই রাত বাড়তে লাগলো শীতও তত তীব্র হতে লাগলো। এর মধ্যেই সেনারা তাদের চলার গতি অব্যাহত রাখলো। অবশেষে মারীদার প্রাচীরের ওপর জ্বলন্ত মশালের আলো ছায়া দেখা যেতে লাগলো।
