কে এসেছে এখানে?
আমার নাম আবী রায়হান। আমি মারীদার ফৌজের কমান্ডার।
তোমরা কি মৃত আত্মা না জীবিত মানুষ? আবী রায়হান সংশয়ের সুরে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা যাই হওনা কেন আমাকে সব খুলে বলল। তোমরা যদি প্রেতাত্মাও হও তবুও তোমরা আরবী। আরবদের মৃত আত্মা মন্দ হতে পারে না। তোমরা অবশ্যই কোন ভালো মানুষের আত্মা।
তাই তোমরা আমাকে সাহায্য করো। আমাকে কেল্লা থেকে বের হতে সাহায্য করো। আমি আমার ফৌজকে নিয়ে কেল্লায় ঢুকবো এবং ঐ লুটেরাদের কাছ থেকে মারীদা আবার ফিরিয়ে নেবো।
সামনে চলো।
***
কামরাটি একটি গুহার মত। ভেতরে দুটি প্রদীপ জ্বলছে। এখানে বার তেরজন যুবতী মেয়ে এবং তিন চারজন মহিলা বসে আছে। এরাও প্রায় যুবতী। এক মহিলা এক বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছে। পুরুষ দুজনই মাত্র এখানে। যারা আবী রায়হানকে এখানে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া পুরুষ বলতে একজন বৃদ্ধ রয়েছে।
ওদেরকে দেখে নাও। একজন আবী রায়হানকে বললো, এরা আমাদের মুসলমানদের মেয়ে। মারীদার আধিবাসী আরবদের কন্যা ওরা। ওদের কারো বাবা, মা, কারো ভাই, কারো মা-চাচা কারো বোন শহীদ হয়েছে লুটেরাদের হাতে। আমাদের কিছু মেয়ে তো লুটেরাদের হাতে বন্দি। এদেরকে বড় কষ্টে উদ্ধার করে এনে এখানে লুকিয়েছি।
কার পাপের শাস্তি আমরা ভোগ করছি? বৃদ্ধ আরব বললেন, এখানে বেঈমান নও মুসলিম আর খ্রিষ্টানরা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার মারীদা দখলের পায়তারা করছেন। অথচ কর্ডোভার কোন খবর নেই। ওরা এখানে একটি ফৌজও বাড়ায়নি। আর আমীরে মারীদা কোন মরণ ঘুম ঘুমিয়েছিলেন কে জানে! এত বড় ঝড় যে তার চারপাশে বয়ে যাচ্ছে সেদিকেও তিনি চোখ রাখতে পারলেন না।
এসব কথা বলার সময় এখন নয়। আবী রায়হান বললো, বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে তোমরা সম্ভবত: খুব একটা জানো না।
না, এক লোক বললো, বাইরের অবস্থা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তোমরা হয়তো জানো। কতদিন হয়ে গেলো। আমরা এভাবে পোকা-মাকড়ের মতো এখানে বসবাস করছি। এই মেয়েগুলো তো আমাদের জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। ওদের ইজ্জত আবরু রক্ষা করে আমরা এখান থেকে বেরোতে চাই।
আমি এ শহর থেকে একাই বেরোতে চেষ্টা করছিলাম। আবী রায়হান বললো, কিন্তু এই মেয়েগুলো এখন আমার জন্যও অনেক বড় ব্যাপার। ওদেরকে না নিয়ে আমি এখান থেকে যাবো না। আমি সর্বাবস্থায় তোমাদের সঙ্গ দেবো।
আর এই পরিত্যক্ত দালান-কোঠার বাইরের খবর হলো, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার মারীদার বাদশাহ বনে গেছেন। খ্রিষ্টানরা তার আনুগত্য মেনে নিয়েছে। খ্রিষ্টানদের বড় দুই নেতা ইউগেলিস ও ইলওয়ারই তার সবেচেয় বড় শক্তি। আজকের সর্বশেষ খবর হলো, কর্ডোভার ফৌজ মারীদার দিকে এগিয়ে আসছে। তারপর তারা মারীদা অবরোধ করবে।
শহরের ছোট ছোট শিশুরাও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। অবস্থা এমন থাকলে সম্ভবত: অবরোধও সফল হবে না। এক বিদ্রোহী কমান্ডার এসে আমাদেরকে বললো, ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কর্ডোভার ফৌজকে পরাজিত করতে পারলে আমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে। আর যারা হাত না মেলাবে তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে।……
এই প্রস্তাবে মাত্র তিনজন রাজি হলো। অন্যরা অস্বীকার করলো। আর চতুর্থ বক্তি আমি। আমি এ উদ্দেশ্যে ওদের সঙ্গ দিয়েছি যে, আমি পালানোর কোন একটা উপায় বের করে নেবো। তা আমি বের করে পালাতেও পেরেছি। তারপর এখানে লুকাতে এসে তোমাদের সঙ্গে দেখা। তোমাদেরকে আমি মৃত আত্মা মনে করছিলাম।
এখন তো আমরা প্রেতাত্মা হওয়ার মতো অবস্থাতেই পৌঁছে গেছি। বৃদ্ধ বললেন, বাদশাহদের পাপের শাস্তি আমরা এখন ভোগ করছি।
মুহতারাম! বৃদ্ধের কথার জবাবে বললো আবী রায়হান, এটা আপনাদের নিজেদের কৃত কর্মের শাস্তি। এদেশে যত আরব মুসলমান আছে তারা নিজেদেরকে এখানকার খ্রিষ্টানদের বাদশাহ মনে করে আসছে। খ্রিষ্টানদের সাথে আপনাদের আচার-ব্যবহার এতই অবহেলার যে, ওদেরকে আপনারা কেবল ঘৃণা আর লাঞ্চনাই দিয়ে এসেছেন।….
আপনারা মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াকেই ইসলামের চূড়ান্ত মনে করেন আর বলেন, আপনারা আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা বনে গেছেন। যারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আল্লাহর বান্দাদেরকে ভালোবাসে তাদেরই আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন। এটাই ইসলামের আসল বৈশিষ্ট্য। আপনারা ইসলামের এই অমোঘ বৈশিষ্ট্যকে আস্তকুঁড়ে ছুঁড়ে মেরেছেন। নও মুসলিমদের সঙ্গে আরবের মুসলমানদের ব্যবহার কখনো ইসলাম সম্মত ছিলো না।
আরবের মুসলমানদের মধ্যে এই বোধ কখনো জন্মালো না যে, জনগণের আবেগ চেতনা নিয়ে যখন শাসক শ্রেণীর লোকেরা খেলায় মেতে উঠে তখন একদিন না একদিন জনগণ আগুনের অঙ্গার হয়ে জ্বলে উঠে। সেই আগুনেই পড়েছেন আপনারা। আপনাদের নিজেদের হাতে তৈরি করা জাহান্নামেই আপনারা জ্বলছেন।
আল্লাহর দরবারে দুআ করুন। আমাদের ফৌজ যেন এসে মারীদা অবরোধ করে নেয়। তবে আমার মনে হয় না আমাদের ফৌজ এত তাড়াতাড়ি শহরে ঢুকতে পারবে। কারণ, শহরের সবাই ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
তবে ভেতর থেকে দরজা বা শহরের ফটক খুলে দেয়ার মতো সুযোগ পাওয়া গেলে অন্যরকম চিত্র দাঁড়াতে পারে। আমার তো আশংকা হচ্ছে, বিদ্রোহীরা আমাদের বন্দি সিপাহীদেরকেও কতল করে দিতে পারে।
