শীত ওকে বেশ ভোগাতে শুরু করলো। সে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলো, সে ধ্বংস্তূপের ছাদের কিছু অংশ অখন্ড রয়ে গেছে; সে ধ্বংস্তপের এক জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিলো।
***
আল্লাহর নাম আর পবিত্র কুরআনের আয়াতের অবিরাম উচ্চারণ তার মুখে। সব ভরসা তার আল্লাহর ওপর। অন্ধকার গভীর থেকে গভীরতার হচ্ছে। চার দিকে যমধরা নির্জনতা। অশরীরি কোন কিছুর অস্তিত্ব এখনো সে টের পায়নি।
শীতে এখন সে রীতিমতো ঠক ঠক করে কাঁপছে। বড় বড় পাতায় ভরা এক বৃক্ষের নিচে গিয়ে দাঁড়ালো আবী রায়হান। এ সময় শুনলো আবী রায়হান একটা আওয়াজ।
যেন কোন শিশু কাঁদছে। আরো কান পেতে শুনলো। হ্যাঁ, কোন শিশুই কাঁদছে। এখানে কোত্থেকে বাচ্চা আসবে? এ নিশ্চয় কোন প্রেতাত্মার নাকি কান্না। আবী রায়হান বুঝলো, এখন শুধু কোথাও লুকানো বা শীতের থাবা থেকেই বাঁচাই নয়, এই শহর থেকে বের হওয়াই সবচেয়ে বড় কাজ।
একটা রাস্তা তার জানা আছে। সে সেনা কমান্ডার। এই শহরে সে বহুদিন ধরে আছে। তাই সে জানে, শহর প্রাচীরটি বেশ মজবুত হলেও নিশ্চয় কোথাও কোন দুর্বল জায়গা আছে কিনা। সে জানে, শহরের ড্রেনেজ পানি ও বৃষ্টির পানি এই বড় নালা দিয়ে শহর প্রাচীরের নিচ দিয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে।
সে ভেবে দেখলো, এই নালা দিয়ে শহরে থেকে বেরোনো যাবে কিনা। নালা এত চওড়াও নয়।
প্রাচীন ভৌতিক ধ্বংসাবশেষ। প্রেতাত্মার নাকি কান্না। বিভিন্ন ভৌতিক শব্দ তার শরীরের শক্তি অর্ধেক শুষে নিয়েছে।
আবী রায়হান কুরআন শরীফের একটি আয়াত উঁচু আওয়াজে পড়তে পড়তে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে একটা সরু গলি দিয়ে ঢুকে পড়লো। দুই কামরার মাঝখান দিয়ে এটি একটি রাস্তা। এর ওপর ছাদও আছে। তবে সামনের দিকে ছাদের এক অংশ ধ্বসে পড়ে আছে।
তার কাছে মনে হলো, ওপর থেকে কেউ যেন জোরে শিষ দিচ্ছে কিংবা নিঃশ্বাস ফেলছে।
প্রেতাত্মার উপস্থিতিতি যেন সে টের পেলো। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, পা ঘেষটে ঘেষটে তার পেছন পেছন কে যেন আসছে। সে নিশ্চিত হয়ে গেলো তার পেছন পেছন কেউ একজন আসছে। জনহীন বিরাণ ভূমিতে ভূত-প্রেত আর মৃত আত্মা ছাড়া এখানে আর কে আসতে পারে।
আবী রায়হান পেছন ফিরে তাকালো না। দ্রুত পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো। রাস্তার বাম দিকে মোড় নিলো। বাম দিকে সে মোড় নিয়ে এত ভেতরে চলে গেলো যে, বাইরের আওয়াজ এখন আর ভেতর আসছে না। এতক্ষণে তার অস্থিরতা কিছুটা কমলো।
পোড়া বাড়ি থেকে আচমকা একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। স্পষ্ট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। নাকি কোন সুর নেই এই আওয়াজে। বাচ্চা এক নাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে। আবী রায়হান পেছনে যে ফিরে যাবে সে সাহসও পাচ্ছে না। কারণ, পেছনে আবার কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আচমকা থেমে গেলো। কোন নারীর চাপা কণ্ঠের আওয়াজ শোনা গেলো। কোন ধরনের চেষ্টা ছাড়াই তার ভেতর একটা পরিবর্তন এসে গেলো। মৃত্যু অবধারিত সে এটা জেনে গেছে। তাই তার ভয়-ডর সব চলে গেছে। সে এখন নিঃশংক।
তবে তার হাত দুটি খালি। লুটেরা বিদ্রোহীরা তার ও তার সঙ্গীদের সব অস্ত্র শস্ত্র এমনকি ছোট ছোট খঞ্জর আর চাকু গুলিও নিয়ে নিয়েছে। সে নিজেকে বললো, এই ভূত-প্রেত বা অশরিবী যেই আসুক আমার কিছুই করতে পারবে না। নিজেকে আবার বললো,
এই বেটা! আমি কোন চোর ডাকাত নই। আল্লাহর সিপাহী। আল্লাহর নামে লড়াই করি। কাফেরদের কয়েদ থেকে পালিয়ে এসেছি। এখন ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবো। ওদের সামনে আত্মসম্পণ করবো না। প্রাণ গেলেও না।
প্রেতাত্মাকেও সে আল্লাহর কোন সৃষ্টি বলে জানে। তাই তার আশা আল্লাহ তাআলা তার এক নগণ্য সিপাহীকে ওদরে হাত থেকে বাঁচাবেন।
বাচ্চার কান্নার আওয়াজ সে আরেকবার শুনতে পেলো। সঙ্গে সঙ্গে এক পুরুষালী কণ্ঠও শোনা গেলো। পরিস্কার আরবী ভাষায় কথা বলছে লোকটি।
ওকে দুধপান করাও, না হয় গলা টিপে দাও।
তারপর এক নারীর কণ্ঠ শোনা গেলো। এও আরবী ভাষায় কথা বলছে।
আহা! আস্তে কথা বলো। বাইরে যেন আওয়াজ না যায়।
আবী রায়হান একে জীবিত কোন মানুষের কণ্ঠ বলে মনে করছে না।
***
তবুও আবী রায়হান পা টিপে টিপে সামনে এগিয়ে গেলো। আলোর হালকা রেখা যেন ওকে ধোকা দিলো। নাকি এখানে কোথাও প্রদীপ জ্বলছে।
আবী রায়হান ধীর কদমে সামনে এগিয়ে গেলো। সে এখন ভয়ংকর ও রহস্যময় কোন প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো।
আবী রায়হান একটু সামনে এগোলো। তখনই তার পেছন থেকে আওয়াজ ভেসে এলো,
এখানেই দাঁড়াও। এক পাও এগোবে না। কে তুমি?
সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বা খঞ্জরের ফলা তার পিঠে এসে লাগলো। আবী রায়হান জায়গা থেকে নড়লো না। স্থির হয়ে রইলো।
কে তুমি? আবী রায়হান আরবীতে প্রশ্নের জবাবে জিজ্ঞেস করলো, আমাকে প্রাণে মারার আগে আমার কথা শুনে নাও। আমি মারীদার মুসলিম ফৌজের একজন কমান্ডার। আমাদের সবাইকে নিরস্ত্র করে কয়েদ করা হয়েছিলো। আমি পালিয়ে এসেছি। তারপর থেকে কেল্লা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এসময় তার সামনে একটা প্রদীপ ধরা হাত ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। যে প্রদীপ ধরে রেখেছে তার অন্য হাতে তলোয়ার। এ লোকটিও জিজ্ঞেস করলো,
