তার এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিকরা দারূণ দূরদর্শী এক সিদ্ধান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু সঙ্গীতের মাতাল করা সুর আর নারীর উন্মত্তরূপ তাকে এমনভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়াতে সবসময় মুখিয়ে থাকতো যে, তার এই অমিত সংগ্রামী পুরুষটি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়তো। বাস্তব এই দুনিয়া থেকে তিনি পরাবাস্তব এক দুনিয়ায় হারিয়ে যেতেন।
মারীদায় কর্ডোভার অনুগত যে সামান্য ফৌজ ছিলো ওরা তা বিদ্রোহীদের হাতে প্রথমেই বন্দি হয়ে পড়ে। তবে একজন কমান্ডার তখনই পালাতে সক্ষম হয়। কমান্ডার খ্রিষ্টান এক প্রহরীকে খতম করে তার পালানোর পথ সহজ করে নেয়। বিদ্রোহীরা এজন্য অন্য বন্দি ফৌজদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায় এবং তাদের প্রহরা আরো নিচ্ছিদ্র করে রাখে।
এই কমান্ডারই মারীদা বিদ্রোহীদের দখলে চলে যাওয়ার খবর কর্ডোভায় নিয়ে যায়। এরই ভিত্তিতে কর্ডোভার ফৌজ জরুরি ভিত্তিতে রণ প্রস্তুতি নিয়ে অভিযানে বেরিয়ে পড়ে।
যেদিন মারীদায় খবর পৌঁছলো, কর্ডোভার ফৌজ আসছে সেদিন তো শহর জুড়ে দারুণ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো। বিদ্রোহীদের এক কমান্ডার বন্দি ফৌজের কাছে এলো এক প্রস্তাব নিয়ে।
আগামী কাল নাগাদ কর্ডোভার ফৌজ মারীদা অবরোধ করে নিবে। বিদ্রোহী দলের কমান্ডার বন্দি মুসলিম সিপাহীদেরকে বললো, তবে আমরা কোন মূল্যেই এই অবরোধকে সফল হতে দেবো না। যদি অবরোধ কোন কারণে সফল হতে থাকে এবং কর্ডোভার ফৌজ শহরে ঢুকে পড়ার আশংকা দেখা দেয় তাহলে তোমাদেরকে সবার আগে আমরা শেষ করে দেবো।….
তবে এক শর্তে তোমরা তোমাদের প্রাণ বাঁচাতে পারো। সেটা হলো, আমাদের সঙ্গে তোমরা হাত মেলাও এবং অবরোধ ব্যর্থ করার ক্ষেত্রে তোমরা ভূমিকা রাখো। কর্ডোভার ফৌজ অবরোধ উঠিয়ে চলে গেলে তোমরা মুক্ত হয়ে যাবে। তখন যেখানে ইচ্ছা তোমরা চলে যেতে পারবে।
আসলে বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ যোদ্ধার দরকার। তাই ওরা এই প্রস্তাব দিয়ে একটা চাল চাললো।
বন্দীদের মধ্যে মাত্র চারজন সেই কমান্ডারের প্রস্তাবে রাজি হলো। এর মধ্যে একজন আবী রায়হান। সে গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলো। বাকি তিনজন দক্ষ সিপাহী। অন্যান্য বন্দিরা আবী রায়হান ওদের সেঙ্গ হাত মেলানোতে খুবই বিস্মিত হলো। বিশেষ করে আবি রায়হানের ব্যাপারে। কারণ, বরাবরই আবী রায়হান কর্ডোভার দারুণ অনুগত এক কমান্ডার এবং দায়িত্বশীল মুসলমান।
আবী রায়হান তার তিন সিপাহীকে নিয়ে বিদ্রোহী কমান্ডারের সাথে চলে গেলো। অন্যান্য বন্দি সিপাহীরা ওদেরকে খুব তিরস্কার করলো। গাদ্দার, বেঈমান, মুনাফিক, হারামখোর কাপুরুষ ইত্যাদি যা মুখ দিয়ে আসলো তাই বললো। কিন্তু কোন কিছুই ওদেরকে ফিরিয়ে রাখতে পারলো না।
***
বিদ্রোহী কমান্ডার আগে আগে চলছে। আর তার পেছনে যাচ্ছে এই চারজন। যখন ওরা একটা গলির মোড় ঘুরলো আবী রায়হান ইচ্ছে করেই একটু পেছনে রয়ে গেলো। কমান্ডার সামনে এগিয়ে গেলো। আবী রায়হান পেছন ফিরে একটু হেঁটে অন্য গলিতে ঢুকে পড়লো।
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর বিদ্রোহী কমান্ডার টের পেলো, ওদের চারজনের একজন গায়েব। কিন্তু ততক্ষণে আবী রায়হান বেশ দূরে চলে গেছে।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ক্রমেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। পুরো শহরে খবর ছড়িয়ে পড়েছে কর্ডোভার ফৌজ আসছে। শহরের প্রত্যেকেই তাই নিজের নিরাপত্তা চিন্তায় নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত। আবী রায়হানের মতো সাধারণ এক বন্দি লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার খবর এখন কে রাখতে যাবে।
মারীদা বিশাল এক শহর। শহর প্রাচীরের ভেতর বেশ কিছু এলাকা এবড়ো খেবড়ো খানাখন্দ ও খাল বিলে ভরা। এগুলোর মধ্যে শহরের বাইরে বয়ে যাওয়া এক নদীর পানির প্রবাহ রয়েছে। বাইরের নদী ও ভেতরের এই গভীর খানাখন্দ শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরো সুরক্ষা দিয়েছে।
এই খন্দাখন্দ এলাকায় প্রাচীন কালের বেশ কিছু দালান কোঠার ধ্বংস্তূপ রয়েছে এর ব্যাপারে বেশ ভীতপ্রদ নানা কাহিনী এই শহরে প্রচলিত রয়েছে। তাই ওখানে কেউ যাওয়ার সাহস করে না। এখানে ঝোঁপঝাড় ও বড় বড় গাছের এলো মেলো এক জঙ্গলও আছে।
আবী রায়হান তার বন্দি সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেলো না। সে কেল্লা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চালালো কিছুক্ষণ। কিন্তু কর্ডোভার ফৌজ আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরের ফটকগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফটকগুলোর আশেপাশে কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শহরের কোথাও তো আবী রায়হানের ঠিকানা হওয়ার কথা নয়। তাই সে ঐ পরিত্যক্ত এলাকার দিকে রুখ করলো। সূর্যাস্তের পর ওখানে গিয়ে পৌঁছলো আবী রায়হান। হাঁটতে হাঁটতে সে পোড়া বাড়ি ঘরের ধ্বংস্তূপের ভেতরে চলে গেলো।
তখনই তার মনে পড়লো, এ জায়গা তো ভৌতিক এলাকা হিসাবে পরিচিত। কোন কিছু থেকে থাকলে তো ওকে ছাড়বে না। তারপর আবার শীতের প্রচণ্ডতা রয়েছে এখানে। রাত যত গম্ভীর হবে শীতের প্রকোপও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে।
চার দিকেই মৃত্যুর বিভিষিকা আর অশরীর নাচ দেখতে পেলো আবী রায়হান। তার বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হলো, বিদ্রোহী কমান্ডারের কাছে চলে যাওয়া। তারপর ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে পড়া। কিন্তু এটা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
