একটু পর দেখা গেলো, নারী-পুরুষ এখানে একাকার হয়ে গেছে। তারপর শুরু হলো অশ্লীলতা আর নির্লজ্জ প্রদর্শনী। যেন ওখানে কোন মানুষ নেই। সব চতুষ্পদ জন্তু। যাদের কখনো লাজ-শরম বলতে কোন কিছু ছিল না।
***
বন্ধুরা! নানা চিৎকার চেঁচামেচি অশ্রাব্য শব্দের ভেতর থেকে ইউগেলিসের কণ্ঠ শোনা গেলো। সবাই ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেলো। ইউগেলিস বললো,
আমীর মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার প্রমাণ করে দিয়েছেন ধর্ম কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তিনি তোমাদেরকে স্বাধীনতা উপহার দেয়ার জন্য নিজের হুকুমত ও ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন…।
আজ তোমরা মারীদা জয় করেছে। একদিন তোমরা কর্ডোভাও দখল করে নেবে। উন্দলুস তোমাদের কাছে অনেক বড় কুরবানী চাচ্ছে।
এসময় এক ঘেড় সাওয়ার ছুটতে ছুটতে ভিড় চিড়ে সেখানে এসে দাঁড়ালো, যেখানে তিন নেতা দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়সওয়ারের চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। তিন নেতা ঘোড়সাওয়ারের কথা শুনলো। কথা শেষ হলে ইউগেলিস আরেকবার ঘোড়ার রেকাবিতে পা রেখে দাঁড়িয়ে উঁচু আওয়াজে বলতে লাগলো,
মারীদার বীর বাহাদুররা! তোমাদের পরীক্ষা দেয়ার সময় এসে গেছে। এই মাত্র খবর এসেছে, আমীরে উন্দলুসের ফৌজ এদিকে ধেয়ে আসছে। শহরের ফটকগুলো ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও। সাহসী লড়াকুরা অধিক সংখ্যায় শহরের প্রাচীরে গিয়ে উঠো। শত্রুপক্ষ কাছে আসলেই তীর বৃষ্টি শুরু করে দেবে।
আকাশ ফাটানো শ্লোগান আর মেঘ গর্জনের আঘাত হেনে দুশমনকে বরণ করে নেবে। কর্ডোভার সৈন্যরা প্রাচীরের কাছে ঘেষলে ওপর থেকে বর্শা মেরে মেরে ওদেরকে শেষ করে দেবে। অবরোধ দীর্ঘ হয়ে গেলেও ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই শহরে খাবার দাবারসহ অন্যান্য রসদ পত্রের কমতি নেই।
ইউগেলিসের কথা শেষ হলে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার গর্জে উঠলেন,
মারীদার সিংহরা! বিজয় অবশেষে তোমাদেরই হবে। তবে মনে রেখো, তোমাদের মোকাবেলা হবে এক অভিজ্ঞ সেনাদলের সঙ্গে। আব্দুর রহমানের ফৌজ কেল্লা জয় করতে জানে।
তোমরা কেবল শ্লোগানের উন্মত্ততা দিয়ে এই ফৌজকে পরাজিত করতে পারবে না। তবুও ওরা যতই শক্তিশালী হোক ওদেরকে পরাজিত করা খুব কঠিন কাজ নয়; যদি তোমরা জমিয়ে নির্ভয়ে লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারো। তবে হামলার সময় কিন্তু তোমরা হুলুস্থুল বাঁধিয়ে বসো না।
যেদিক থেকেই দুশমন আসবে সেদিকেই তোমরা তীর বৃষ্টি শুরু করে দিবে। মনে রেখো, এটাই তোমাদের শেষ সুযোগ। কর্ডোভার ফৌজ যদি একবার কেল্লার ভেতরে আসতে পারে তাহলে তোমাদের যে কী পরিমাণ হবে সেটা তোমরা এখন চিন্তাও করতে পারবে না।….
এ ফৌজ তো এক সময় আমারই ফৌজ ছিলো। তাই আমি ভালো করেই জানি, এই ফৌজ যখন দুশমনের ওপর চড়াও হয় তখন একজন সিপাহীর মনেও সামান্যতম করুণা থাকে না। হিংস্র প্রাণী হয়ে উঠে। কেল্লায় ওরা ঢুকতে পারলে তোমাদের পাইকারী ধরে হত্যা ছাড়া আর কিছুই হবে না।…
শুধু কি তাই, তোমাদের স্ত্রী-কন্যারা কর্ডোভার সিপাহীদের তাবুতে চলে যাবে বিনামূল্যে পাওয়া পণ্যের মতো। যে স্বাধীনতা তোমরা পেয়েছো এর মূল্য বুঝার চেষ্টা করো। এই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদেরই।
লোকদের জোশ-জযবা, লড়াইয়ের স্পৃহা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বারের বক্তৃতায়। শ্লোগানে শ্লোগানে তারা চারদিক মুখরিত করে তুললো।
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর জব্বার, ইউগেলিস ও ইলওয়ার দক্ষ লড়াকু ও যোদ্ধাদের বেছে বেছে আলাদা করে লড়াই ও লড়াই পরিচালনার স্কিম বানাতে শুরু করলো।
***
সালার আব্দুর রউফ ও সালার মুসা ইবনে মুসার সেনা ব্যটালিয়ান ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে। তিন দিনের দূরত্ব তারা দুই দিনেই অতিক্রম করে।
আব্দুর রহমান তার নিজের কিছু সেনা ব্যাটালিয়ান নিজের সঙ্গে রেখে পথেই এক জায়গায় সাময়িক তাবু ফেললেন এবং কয়েক ব্যাটালিয়ান সৈন্যসহ উবাইদুল্লাহ ইবনে উবাইদুল্লাহকে মারীদার দিকে এগিয়ে যেতে বললেন।
আপনার নিশ্চয় জানা আছে উবাইদুল্লাহ! আব্দুর রহমান বললেন, ঐ লুটেরা বিদ্রোহীদের আসল মাথা ফ্রান্সের শাহ লুই। আমি আমার সেনা ইউনিট নিয়ে ফ্রান্স ও মারীদার পথে ঘাপটি মেরে থাকবো। মারীদা অবরোধ করলে ফ্রান্সের ফৌজ অবরোধ ভাঙ্গতে পেছন থেকে এসে আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। আর এমন ঘটলে ফ্রান্সীরা যেন পথেই কচু কাটা হয় এখানে থেকে আমি সে ব্যবস্থা করবো।
কিন্তু ফ্রান্সের ফৌজ যদি এসেই পড়ে তাহলে আপনার সামান্য এই সেনাদল সম্ভত: ওদেরকে রুখতে পারবে না; উবাইদুল্লাহ বললেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের কাছে সেনা সাহায্য চেয়ে পাঠাবেন।
মুসলমান সবসময় সংখ্যায় কমই ছিলো উবাইদুল্লাহ! আব্দুর রহমান আত্মবিশ্বাসের সুরে বললেন, আর সবসময় সংখ্যায় স্বল্পই থাকবে মুসলমানরা। আমার এই সামান্য ফৌজই ফ্রাসীদের রুখে দেবে।
তবে আমরা সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে না। ছোট ছোট দলে ফৌজকে ভাগ করে ওদের ওপর গেরিলা হামলা চালিয়ে যাবো। এই এলাকাতেই চোর পুলিশ খেলার মতো ফ্রান্সীদের সঙ্গে আমরা খেলে যাবো এবং এখানে ওদেরকে আটকে রাখবো। আপনি এগিয়ে যান উবাইদুল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
এটাই ছিলো উন্দলুসের আমীর আব্দুর রহমানের আসল রূপ। তিনি এই দেশের বাদশাহ। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে এসে হয়ে গেলেন লড়াকু সিপাহী।
