***
এই ঐতিহাসিক যুদ্ধসঙ্গীত মুজাহিদদের জোশ-জযবা, উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুললো। আবদুর রহমান এটাই চাচ্ছিলেন। ঘোড়াগুলোর চলায় যেন ক্ষুরাঘাতে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো।
আবদুর রহমানের দেহেও যেন নব উদ্যোমের রক্ত ও ভরে দিয়েছে। দারুণ সতেজ তিনি।
তিনি ঝাণ্ডাধারীর হাতে ধরে রাখা ঝাটির দিকে তাকালেন। সেটা এমন পত পত করে উড়ছে যেন সৈনিকদের রণসঙ্গীত ও দৃপ্ত হুংকার এর মধ্যেও নতুন প্রাণ ভরে দিয়েছে। কাপড়ের এই টুকরোর মধ্যেও যেন এই উপলব্ধি জেগে উঠেছে, কুফুরের ঐ কালো পাহাড়ের হৃদপিন্ড ভেদ করে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে হবে।
আবদুর রহমান চলন্ত অবস্থায় তার বাম দিকে তাকালেন। তার চোখ পড়লো সালারে আলা উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহর ওপর। আব্দুর রহমান তার ঘোড়া উবাইদুল্লাহর ঘোড়র কাছে নিয়ে গেলেন।
উবাইদুল্লাহ! আব্দুর রহমান বললেন, যেদিন এমন রক্ত বিশুদ্ধ করা ঈমান জাগানিয়া রণসঙ্গীত থেকে মুসলমানরা মুখ ফিরিয়ে নেবে সেদিনই মুসলমানদের পতন শুরু হয়ে যাবে।
সঙ্গীতে এমন এক শক্তি আছে যে, তা ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলে, উবাইদুল্লাহ বললেন, কিন্তু সঙ্গীতে এই অপশক্তিও আছে যে, জাগ্রত আত্মাকে তা চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রক্ত যেমন উত্তপ্ত করে তুলে তেমনি রক্ত হিম শীতলও করে দেয়। এটা শ্রোতার ওপর নির্ভর করে যে, সে কোন ধরনের সঙ্গীত পছন্দ করে।
এমন শক্তি রয়েছে নারীর মধ্যেও। আব্দুর রহমান বললেন, একজন নারী তলোয়ারের তীক্ষ্ম ফলার মতো। আবার কোষবদ্ধ তলোয়ারও একজন নারী। তীব্র ধারযুক্ত তলোয়ারকে অকেজো করে দিতে পারে একজন নারী। দুই রূপেই আমি নারীকে দেখেছি। আমার হাতে তো মুদ্দাসসিরা নামের এক নারীই তলোয়ার উঠিয়ে দিয়েছিলো।
আর আপনার তলোয়ার কোষবদ্ধ করে কে রেখেছিলো?
আব্দুর রহমান উবাইদুল্লাহর এ কথায় চমকে উঠে তার দিকে তাকালেন। যেন বেখেয়ালে কথা বলতে বলতে আচমকা সম্বিৎ ফিরে পেয়েছেন।
উবাইদুল্লাহ তার মুখের বিব্রত অবস্থা দেখে এ বিষয়ে আর এগুলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন, আব্দুর রহমানের স্মৃতির পাখা উড়ে গেছে তার মহলের দিকে। যেখানে যারিয়াবের মাতাল করা সঙ্গীত ও সুলতানার অবাধ্য রূপ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
উবাইদুল্লাহ মারীদা অবরোধের ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করলেন। আব্দুর রহমান লড়াইয়ের ময়দান থেকে ফিরে যাননি এটা দেখে উবাইদুল্লাহ বেশ স্বস্তিবোধ করলেন।
মারীদার বিদ্রোহ দমনের ব্যাপারে আব্দুর রহমানও বেশ উৎসাহ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর কথার সুরে দারুণ এক আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া অনুভব করলেন উবাইদুল্লাহ। মারীদা এখনো বেশ দূর। কর্ডোভার সেনাদল অবিরত তাদের চলার গতিতে। একটা ছাউনি ফেলা তো জরুরী হয়ে উঠেছে।
৫. মারীদার রাষ্ট্রীয় কোষাগার
মারীদার রাষ্ট্রীয় কোষাগার এখন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বারের দখলে। ইবনে আব্দুল জব্বার এখন মারীদার একচ্ছত্র আমীর বনে গেছেন।
ওখানকার অধিকাংশ নও মুসলিমই ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্মে ফিরে গেছে। এটা তাহরীকে মুআল্লিদীন- ধর্মত্যাগী আন্দোলনকারীদের প্রথম সাফল্য। নও মুসলিমদের দুমুখো সাপের আচরণে অবতীর্ণ করতে পেরে ওরা এখন অন্যরকম এক বিজয়ের স্বাদ উপভোগ করছে।
ইউগেলিস ও ইলওয়ার মারীদাতেই বসে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের হাতে গড়া ফৌজের সংখ্যা এখন চল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মারীদা দখলের পর এদের সৈন্য সংখ্যা হো হো করে বাড়তে থাকে। তবে এরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত কোন সৈন্য নয়।
এরা সবাই এই শহরের নাগরিক। বিচ্ছিন্নভাবে এরা লড়তে জানে। কিন্তু সেনাবাহিনীর আকারে দলবদ্ধ হয়ে এরা কখনো লড়াই করেনি।
তারপরও এরা খুব সহজেই মারীদা জয় করে নেয়। এজন্য ওদের আনন্দ বাঁধ ভাঙ্গা আকার ধারণ করেছে। ওরা এখনো লুটপাট চালিয়ে তাদের বিজয় উৎসব করছে। মুসলমানদের ঘর বাড়িগুলো একেবারেই তছনছ হয়ে গেছে। মুসলিম নারীদের তো কোথাও কোন হদিস নেই। কে কোথায় আছে, এটা কেউ জানে না।
যারা বিদ্রোহীদের হাতে মারা পড়েছে তাদের স্ত্রী, বোন বা মেয়েরা চলে গেছে বিদ্রোহীদের দখলে।
মারীদা শহরের মধ্যাংশে বিশাল বড় এক ময়দান রয়েছে। এখানে ঘোড় দৌড়, সৈনিকদের কুচকাওয়াজ হয় এবং প্রেগ্রাউন্ড হিসাবেও এ ময়দান ব্যবহৃত হয়।
লুটেরা প্রশাসনের ডাকে শহরের সবাই সেই ময়দানে জমায়েত হলো। একটু পর ইউগেলিস ইলওয়ার ও মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার ঘোড়ায় চড়ে সমবেত মানুষের মধ্যে এসে উপস্থিত হলো।
মারীদার বিজয়ী লোকেরা! ইউগেলিস তার ঘোড়ার রেকাবে পা রেখে দাঁড়িয়ে অতি উঁচু আওয়াজে বললো, তোমাদের সবাইকে স্বাধীনতার উষ্ণ শুভেচ্ছা। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার মারীদার আমীর ও এবং সুলতানও। বাদশাহও। তোমাদের বাদশাহ এখন তোমাদরে মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন…।
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল জব্বার জিন্দাবাদ!
ঈসা মাসীহ জিন্দাবাদ!
উন্দলুস আমাদেরই দেশ!
এখানে মুসলমানদের কোন স্থান নেই।
পৃথিবীর কোথাও মুসলমানদের জায়গা নেই।
পুরো পৃথিবী খ্রিষ্টানদের।
হাজার হাজার মানুষের এ ধরণের বিভিন্ন স্লোগানে মারীদার যমীন ও আসমান কেঁপে কেঁপে উঠছে। খ্রিষ্টান মেয়েরাও এই বিজয় উৎসবে যোগ দিয়েছে।
