যারা আজ তোমাকে কাঁধে করে এ পর্যন্ত এনে এই আসনে বসিয়েছে তারাই একদিন তোমাকে আমাদের অনুগ্রহ আর করুণার ওপর একলা ফেলে রেখে এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়ে যাবে।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার এখন বিজয় ও ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। গভর্ণরকে সে কোন পাত্তা দিলো না। তার কথা শুনবে কখন! চোখেমুখে তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললো,
ওকে নিয়ে যাও।…..ওর সারা খান্দানকে কয়েদখানায় ছুঁড়ে মারো।
গভর্ণরের সীমিত সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করে তাদেরকে সশস্ত্র প্রহরার বেষ্টনীতে রাখা হয়েছে। যে দিকেই চোখ যাচ্ছে সেদিকেই আগুনের জ্বলজ্বলে শিখা দেখা যাচ্ছে।
গভর্ণরের এক সেনা কমান্ডার একটি গাছের ঝোঁপের আড়ালে অনেকক্ষণ লুকিয়ে রইলো। তারপর সুযোগ বুঝে গাছে চড়ে বসলো। শহর জুড়ে তখন কেয়ামতের বিভীষিকা চলছে। মুসলমানদের ও বিত্তশালী খ্রিষ্টান ব্যবসায়ীদের ঘরে লুটপাট চলছে। জ্বলছে বহু বাড়ি ঘর।
কমান্ডার গাছের ওপর বসে পালানোর পরিকল্পনা করতে লাগলো। এর নিচে এক ঘোড়সওয়ার প্রহরী টহল দিচ্ছে। কায়দা করে প্রহরীর ঘোড়ার ওপরই লাফিয়ে পড়লো কমান্ডার। পর মুহূর্তেই তার হাত থেকে তলোয়ার ছিনিয়ে নিলো এবং তার ঘাড়ের অর্ধেক এক কোপে কেটে ফেললো। প্রহরী ঘোড়া থেকে কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে করতে পড়ে গেলো। কমান্ডারও ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো উধ্বশ্বাসে।
শহরের ফটক তো তখন অবারিত। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের বাইরে থাকা সশস্ত্র ফৌজ শহরের ভেতর ঢুকছে। শহরের ভেতরের আতংকিত-ভীতসন্ত্রস্ত লোকজন বাইরে যাচ্ছে। লুটপাট ছুটাছুটির মধ্যে কে কোথায় যাচ্ছে আসছে সেদিকে তাকানোর মতো অবস্থা নেই কারো।
কমান্ডার এই চরম হুলুস্থুল অবস্থার মধ্যে নির্বিঘ্নে শহর থেকে বেরিয়ে গেলো। কর্ডোভার দিকে ঘোড়া ছুটালো। তার সামনে দীর্ঘ পথ। দ্রুত পৌঁছে মারীদার বিদ্রোহের খবর দিতে হবে তাকে। বাকি রাত ঘোড়া ছুটিয়েই কাটালো সে।
সকাল হলো, সূর্য মাথার ওপর উঠে এলো। কিন্তু সে থামলো না।
এক জায়গায় সে উন্দলুসের দুই সেনা সদস্যকে দেখতে পেলো। তাদের কাছে গিয়ে জানতে পারলো, তারা বিশেষ কাজে কর্ডোভা থেকে অন্য এক শহরে যাচ্ছে। তাদেরকে মারীদার অবস্থা জানিয়ে বললো, সে এখন কর্ডোভায় এ সংবাদ জানাতে যাচ্ছে।
কর্ডোভা গিয়ে কী করবে? এক সৈনিক বললো, আমীরে উন্দলুসকে তুমি ফ্রান্সের পথে পাবে। ফ্রান্সের ওপর হামলা করতে যাচ্ছেন তিনি পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে। তুমি সেদিকে চলে যাও। পথ চেনা আছে তো?
হ্যাঁ, চেনা আছে।
অনবরত সফরে কমান্ডারের ঘোড়া তখন বেশ ক্লান্ত। তারা তাদের একটি তাজাদম ঘোড়া দিয়ে দিলো। তাজাদম ঘোড়া পেয়ে এবার তার ছুটার গতি আরো তীব্রতর হয়ে উঠলো। ঘুম, ক্লান্তি, ক্ষুধার উর্ধ্বে উঠে সে প্রায় উড়ে চললো।
অবিশ্বাস্য কম সময়ে আমীরে উন্দলুস আবদুর রহমানকে সে পেয়ে গেলো।
আবদুর রহমান তার সেনাবাহিনীর অভিমুখ করে দিলেন মারীদার দিকে।
***
সালার আবদুর রউফকে ফ্রান্সের অভিযান থেকে ফিরে আসতে হলো। তীব্র গতিতে তিনি এগিয়ে আসতে লাগলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি মারীদার কাছে ছিলেন। ওদিক থেকে আবদুর রহমনও যথাসম্ভব দ্রুত তার সেনাদল নিয়ে এগিয়ে আসছেন।
আবদুর রহমান সৈনিকদের মধ্যে যারা তবলা, নাকারা বাজাতে পারে, যুদ্ধ সঙ্গীত গাওয়ার মতো যাদের সুকণ্ঠ রয়েছে তাদের সেনাবাহিনীর মাঝখানে অবস্থান দেয়া হলো। যাতে তাদের আওয়াজ দলের শেষ সৈনিকটি পর্যন্ত পৌঁছে।
সারেঙ্গীবাদকদেরকে বলা হলো, তারা যেন এমন উত্তেজক বাদ্যযন্ত্র বাজায় যাতে রক্ত টগবগ করে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াগুলোও উত্তেজিত ও তীব্র গতির হয়ে উঠে। সৈনিকদের তো রক্ত গরম করা এমন উত্তেজক সঙ্গীত ভালোই জানা ছিলো।
কিছুক্ষণ পরই রক্ত টগবগ করা বাদ্যের দামামা ও যুদ্ধ সঙ্গীতের অনলবর্ষী ছন্দায়িত গর্জনে যেন কাছে-দূরের পাহাড়গুলোও হেলে উঠতে লাগলো।
ওরা গাইছিলো এক আরবী সঙ্গীত। উন্দলুসের বিজয় উপলক্ষ্যে শতবর্ষ আগে এক বিখ্যাত কবি খাদ্দান তুসী এটা রচনা করেন।
সমুদ্রের জ্বলোচ্ছাসে ভরা তরঙ্গ
মহাসাগরের একেকটি পৰ্বতীয় ঢেউ চতুরঙ্গ
মন্থন করে, পায়ে পিষে
খোদার সিংহপুরুষ যারা ছিলেন
রণ-হাওয়ার শাহবাজ হয়ে যারা এলেন
রাসূলের (সা) প্রতি উৎসর্গ প্রাণ
অকাতরে করে গেলো দান।
ভয় পায়নি সমুদ্রের চোখ রাঙানি
বিন্দু বিন্দু করে দিয়েছে সিন্ধু,
ঢেউ, তরঙ্গের পাহাড় খন্ড।
সাইক্লোন, ঝড়, টর্নেডো থাকেনি আর অখন্ড।
থমকে গেছে আকাশের বিদ্যুৎ চমক
যখন শুনেছে তারেক অগ্নি সেনাদের বজ্ৰধমক।
এগিয়ে এসেছে সমুদ্র তীর যেন পায়ে হেঁটে
সিজদাবনত হয়ে-বিনীত কণ্ঠে বলে,
মুজাহিদরা! বিশ্বজয়ী বীর যোদ্ধারা।
ছিলো তো তোমাদেরই প্রতীক্ষা
শতাব্দীর অগ্নিপরীক্ষা।
ফেলে আসা পথের দিকে আর তাকিয়ো না
ওখানে লেখা নেই তোমাদের জন্য কোন গৌরবনামা
তারেকের ভেতর কুদরতী হাত জ্বেলে দিলো এই অগ্নিবীনা।
দৃপ্ত পদের মুজাহিদরা!
জ্বালিয়ে দাও স্মৃতি তাড়ানো ঐ কিশতীগুলো
ফিরে যাওয়ার রাহা রুদ্ধ,
শুধু সামনে এগিয়ে যাও, প্রত্যেকেই হয়ে যাও
ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ ঝড় অপ্রতিরোধ্য।
ফিরে যেতে হলে
প্রাণ যাবে না-যাবে না বুকের এক ফোঁটা নিঃশ্বাস
যাবে নিঃসাড় লাশ।
তারপর তো এগিয়ে যাওয়ার গল্প
সৈন্য সংখ্যা তো ছিলো বড় স্বল্প
লড়তে লড়তে, কাটতে কাটতে
মরতে মরতে, মারতে মারতে
আছড়ে পড়লো কিছু এখানে,
ঝাঁপিয়ে পড়লো কিছু সেখানে।
তাণ্ডবলীলা করতে করতে প্রাচীর হয়ে এগিয়ে এলো
জালিম আর কুফরের পাহাড়
ফেটে গেলো, হটে গেলো
হাজারো জয়ের বদ্ধ পথ খুলে দিলো
অবিরত অগ্রসরমান মুজাহিদ দল
চূড়াস্পশী সংকল্প, কী ভীষণ
ঈমানের শক্তি-বল।
উন্দলুসের মাটি-উঠলো হেলে দুলে,
আজানের মর্ম সুরে
কুরআনের গভীর আহবানে
রাসূলের (সা) জীবন্ত অনিঃশেষ বাণীতে।
সেই সুরের মধুর গুঞ্জরণ, আওয়াজের স্মারক
লেখা হয়েছে মুজাহিদদের তপ্ত রক্তে।
আমাদের ওপর রয়ে গেছে রক্তের করজ
এটা আমাদের ফরজ
সেই রক্তের ঋণ শোধ দাও
মুজাহিদরা!
বাঁধভাঙ্গা জলোচ্ছাসের মতো এগিয়ে যাও।
জালিম-কুফরের পাহাড় আজ
আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, ভেঙ্গে পড়ছে,
চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে।
ঈমানের দীপ্তিতে সেজে নাও
রণ সাজ।
মুজাহিদ! মুজাহিদ।
তছনছ করে দাও– চূর্ণ বিচূর্ণ
মুখ-মুখরিত রাখো-আল্লাহ আল্লাহ।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ!
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ!!
