***
এক রাতে প্রতিটি ঘরে বড় গোপনে খবর পৌঁছে গেলো, কাল সকালৈ নাকারা বেজে উঠতেই লোকেরা যেন সশস্ত্র হয়ে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। তারপর গভর্ণর মহলে হামলা করে গভর্ণরকে গ্রেফতার করা হবে।
মারীদার গভর্ণ তো এটা জানতে পেরেছিলেন, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার এ অঞ্চলের পুরো ট্যাক্স উসুল করে নিয়েছেন। কিন্তু তার এতটুকু সন্দেহ কোন দিন হয়নি যে, মারীদার লোকেরা মুহাম্মদের ফৌজ বনে গেছে। যেকোন সময় এর বিস্ফোরণ ঘটবে।
মারীদার অধিকাংশ এলাকাতেই খ্রিষ্টানদের প্রাধান্য রয়েছে। যেসব খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করে তারাও গোপনে খ্রিষ্টানই রয়ে যায়। আরব থেকে আসা মুসলিম পরিবারগুলো ভিন্ন অভিজাত এলাকায় থাকে। শহরে কি হচ্ছে সেটা তো তাদের জানার কথা নয়।
ঐতিহাসিকরা পরিস্কার ভাষায় লিখেছেন, আরব থেকে যে সব মুসলমানরা সরকারি বিভিন্ন পদে চাকরি নিয়ে উন্দলুসে এসেছে তাদের আচার ব্যবহার ছিলো আপত্তিজনক।
এরা নিজেদেরকে উন্দলুসের বিজয়ী ও শাসক শ্রেণীর লোক বলে মনে করতো। রাজকীয় ঢঙে চলাফেলা করতো। খ্রিষ্টান নাগরিকদের থেকে নিজেদেরকে বেশ দূরত্বে রাখতো। তাদেরকে এড়িয়ে চলতো। আর কেউ মুসলমান হয়ে গেলে মুসলমান হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করতো না। তাদের সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলতো, সামান্য ছুতোয় রূঢ় আচরণ করতো।
এই আপত্তিজনক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নওমুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা না জন্মে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। যেটা ক্রমেই ঘৃণা এবং বিদ্রোহের পরিণতিতে পৌঁছে।
খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠি যখন কোন বিশৃংখলা করতো, কোন চক্রান্ত করতো তখন সেটা দেখার মতো কিংবা তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার মতো কাউকে পাওয়া যেতো না। তারা মাটির নিচ থেকে সর্বত্র চক্রান্তের জাল বিছিয়েও মুসলমানদের কাছ থেকে তা গোপন রাখতে পারতো।
তাদের সাফল্যের এটাই ছিলো সবচেয়ে বড় কারণ।
আর গভর্ণরের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এতই দুর্বল ছিলো যে, তারা এটাও অনুসন্ধান করে জানতে পারতো না শহরে কী হচ্ছে।
মারীদার গভর্ণরের নিরাপত্তা বাহিনী সংখ্যায়ও ছিলো কম। কয়েকজন বডিগার্ড ও আধা ইউনিট সেনা সদস্য। মারীদার মতো শহরের জন্য এ পরিমাণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য যথেষ্টই কম বলা যায়।
***
এখনো মাঝ রাত পেরোয়নি। গভর্ণর মহল ও আরব্য মুসলমানদের এলাকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শহরের এক অংশ ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু শহরের বড় এক অংশ তখনো জেগে আছে। প্রতিটি ঘরে প্রত্যেক সদস্য সশস্ত্র হয়ে নিচ্ছে। বাইরের বিশাল এক ময়দান সশস্ত্র লোকে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার দরবেশের ছদ্মবেশে আগেই শহরে এসে বসে আছে। সে পর্যন্ত তার সশস্ত্র লোকের সংখ্যা (ঐতিহাসিকদের মতে) চল্লিশ হাজারে পৌঁছে গেছে।
জানা কথাই, এ এক অনিয়মিত ফৌজ। যাতে শহরবাসীই বেশি এবং ছাটাই করা পুরনো কিছু সেনাবাহিনীর সদস্যও এ দলে আছে।
অর্ধেক ফৌজ শহরের বাইরে শহরের প্রধান ফটক খোলার অপেক্ষায় রয়েছে।
আচমকা শহরের ভেতর শোরগোল উঠলো। যেটা গভর্ণরের মহলের কাছে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি ও উদ্ধত শ্লোগানে পরিণত হলো। মারীদার গভর্ণরের বডিগার্ডরাও সামান্য যে সেনা সদস্য ছিলো তারা পুরোপুরি জেগে উঠারও সুযোগ পেলো না।
গভর্ণরের চোখ যখন খুললো তখন তার চারপাশে আট দশজন লোক। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে নাঙ্গা তলোয়ার। তারা তাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে বাইরে নিয়ে গেলো।
বাইরে এমন হৈ চৈ, চিৎকার চেঁচামেচি যে, নিজের আওয়াজও শোনা যাচ্ছে না।
হাজার হাজার মশালের জ্বলন্ত ফুলকি যেন এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। অসংখ্য ঘোড়া চারদিকে ছুটাছুটি করছে। মুসলমানদের বাড়িগুলো থেকে ওঠা আগুনের শিখা যেন আকাশকে ছাড়িয়ে যেতে যাচ্ছে। মুসলমানদের বাড়ি ঘরগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে। এর আগে সেখানে লুটপাট চালানো হয়েছে।
আমার মুহাফিজরা কোথায়? এসব কী হচ্ছে? মারীদার গভর্ণর গর্জন ছেড়ে বললেন।
ওদেরকে তোমার আগেই কয়েদখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এক বিদ্রোহী নেতা বললো, আর তোমার হাতে গোনা ফৌজকে নিরস্ত্র করে এদের আশেপাশে প্রহরা দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে।…..এটা বিদ্রোহ হচ্ছে। তোমাদের সব শাসন ক্ষমতা খতম হয়ে গেছে। তুমি এখন আর আমীর নও, আমাদের হাতে-বন্দি।
তাকে বড় একট রাজকীয় কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ফানুস জ্বলছে। এটা গভর্ণরের এজলাস কক্ষ। সেখানে এখন কয়েকজন লোক বসে আছে। তাকে একজনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। গভর্ণর লোকটিকে দেখে চমকে উঠলেন।
তুমি? তিনি সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার?…..আরে ডাকাতের গোদা! এসব তোমারই শয়তানি?
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার হো হো করে হেসে উঠলো।
আমার কাছে জবাবদিহি চওয়ার সময় এখন আর নেই, মুহাম্মদ হাসতে হাসতে বললো, তোমার রাগ-অভিমান এখন কচুর পাতা…..বাকি জীবন তোমার কয়েদখানায় পড়ে থাকতে হবে।
হায়রে বেকুব গাদ্দার! মারীদার আমীর বললেন, নিজের পরিণামের কথা এভাবে ভুলে যেয়ো না। গাদ্দাররা কোন বাদশাহকে কতল করতে পারে ঠিক; কিন্তু বাদশাহ হতে পারে না। মাত্র কয়েকদিনই ক্ষমতার নেশা উপভোগ করে নিতে পারবে। তারপর নিজের পরিণাম নিজের চোখেই দেখতে পাবে।…..
