এদের মধ্যে যাদের সামান্যতম মেধা-বুদ্ধি ছিলো তাও তোষামোদকারীরা অকেজো করে দেয়। কল্পজগতে তাদেরকে প্রজাপ্রিয় ও সপ্ত মহাদেশের বাদশাহ বানিয়ে দেয়।
মতাদর্শিক ও বিশ্বাসগত স্নায়ুযুদ্ধে জয় হয় সে জাতি, যাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের কোন ব্যক্তিগত লোভ ও স্বার্থ কাজ করে না।
যারা নিজেরা ব্যক্তির উর্ধ্বে উঠে সব চিন্তা চেতনাকে কার্যকর করে এবং বাইরের কোন প্রভাব, উস্কানি কিংবা কোন লোভ লালসার সামনে নিজেদেরকে বিকিয়ে দেয় না। তারা শত্রুকে শত্রুই মনে করে। নিজেদেরকে বাদশাহ মনে করে তৃপ্ত থাকে না।
কিন্তু মুসলিম শাসকদের মধ্যে এ গুণটি খুব কম সময়েই দেখা গেছে। আল্লাহ তাআলার দেয়া শাসন ক্ষমতাকে তারা ব্যক্তিগত শাসন ক্ষমতা মনে করতে লাগলো। আর ইসলামের দুশমনরা তো তাদের মধ্যে এ মনোভাবই জাগিয়ে তুলতে চাইতো।
***
৮২২ থেকে ৮৫২ খ্রিঃ উন্দলুসের এক উত্তাল কাল। সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ ইবনে উবাইদুল্লাহ, ওযীর ও সালার হাজিব আবদুল করীম, সালার আবদুর রউফ, সালার মুসা ইবনে মুসা, সালার ফারতুন উন্দলুসের শাসক আবদুর রহমানকে এমনই এক মায়াবী জালের ভেতর থেকে টেনে তুলেন।
অবশ্য এতে মুদ্দাসসিরা নামের অতি রূপসী ও ঈমানদীপ্ত এক নারীর কথা না বললে তার প্রতি অবিচারই করা হবে। মুদ্দাসসিরার পবিত্র স্পর্শেই আবদুর রহমান অনেকটা জেগে উঠেন।
যারিয়াব ও সুলতানার মায়াবী জালের কঠিন নিগড় থেকে তারা ছাড়া আর কেউ মুক্ত করে আবদুর রহমানকে রণাঙ্গনে নিয়ে যেতে পারতেন না।
আবদুর রহমান যখন সেনাবাহিনরি মূল অংশ নিয়ে ফ্রান্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছিলো, এই সেই আবদুর রহমান নন যিনি মহলের মাদকীয় আচ্ছন্নতায় বিভোর হয়ে থাকেন।
তার চোখ মুজাহিদীনে ইসলামের উজ্জল দীপ্তিতে পূর্ণ ছিলো। তার দেহের ভাষা ছিলো ঋজুতোয় দৃঢ়। তিনি আপাদমস্তক সিপাহসালার বনে গিয়েছিলেন। তার মন-মস্তিষ্ক কর্মতৎপর সালারের মতো ধারালো হয়ে উঠলো।
তার কাছে যখন খবর পৌঁছলো মারীদায় বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এবং এর নেতৃত্ব দিচ্ছে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার, তার চেহারায় তখন সামান্যতম দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েনি। যেন তার জন্য এ খবর প্রত্যাশিতই ছিলো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে নিলেন এবং ফ্রান্সের দিকে অগ্রসরমান অভিযান মুলতবী রাখলেন।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারকে যখন দুর্নীতির অভিযোগে মারীদার গভর্ণরের পদ থেকে পদচ্যুত করা হলো তখন খ্রিষ্টান সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় দুই লিডার ইউগেলিস ও ইলওয়ার মারীদায় পৌঁছে গেলো।
তারা সেখানে অনেকটা গা ঢাকা দিয়ে রইলো। গোপন এক জায়গায় মারীদার সব গির্জার পাদ্রীদের ডেকে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা দিয়ে দিলো।
তাদের দিক নির্দেশনা মতে পাদ্রীরা লোকদেরকে বলতে লাগলো, মারীদার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে গোলাম বানানোর জন্য অনেক বড় ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। খ্রিষ্টানরা যদি এ বোঝা মাথা পেতে নেয় তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই এই বোঝার নিচে চাপা পড়ে তারা ভিখিরী হয়ে যাবে।
লাঞ্ছনা থেকে বাঁচার জন্য তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। আর মুসলমানরা সহজেই তাদেরকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে নেবে। এর একমাত্র প্রতিকার হলো, কর্ডোভায় কেউ যেন ট্যাক্স না দেয়। প্রতিটি গির্জায় রাত দিন এভাবে ক্ষোভ ছড়িয়ে দিতে লাগলো পাদ্রীরা।
এর মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার তার লুটেরা বাহিনী দিয়ে ট্যাক্স উসুলকারী সরকারি কর্মকর্তাদেরকে হত্যা করায়। এর সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করিয়ে দেয়, এখন থেকে ধার্যকৃত ট্যাক্সের অর্ধেক দিলেই চলবে এবং তার লোকেরা ট্যাক্স উসুল করবে।
ট্যাক্স উসুলকারি কর্মকর্তাদেরকে শহরের বাইরে জঙ্গুলে এলাকায় হত্যা করে সেখানেই লাশ দাফন করে দেয়া হয়।
তারা যখন সময়মতো অফিসে ফিরে আসলোনা তখন সংশ্লিষ্ট অফিসের লোকেরা তাদেরকে খুঁজতে শুরু কররো। কিন্তু কোথাও তাদের কোন হদিস পাওয়া গেলো না। এদিক ওদিক লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোন সদুত্তর মিললো না।
কিছুদিন পর জানা গেলো, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার ট্যাক্স উসুল করে নিয়েছে। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। সাধারণ লোকেরাও যেহেতু অর্ধেক পয়সা বেঁচে যাওয়ায় তার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলো তাই তারাও তার কোন হদিস দিলো না।
ইউগেলিস ও ইলওয়ার শহরের আনাচে কানাচে ও দূর দুরান্তের গ্রামে ঘুরে লোকদেরকে ধর্মের নামে ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলে উস্কে দিতে লাগলো। তারা বলতে লাগলো,
আমাদের বাদশাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার। এখন মারীদা ও আশপাশের এলাকা স্বাধীন। তাই প্রত্যেকে যেন আজ থেকেই সৈনিক হয়ে যায়। মারীদার বর্তমান গভর্ণর আমাদের হাতে বন্দি। এজন্য এখন কর্ডোভা থেকে ফৌজ আসবে। এই ফৌজের মোকাবেলা করা আমাদের এখন বড় কর্তব্য কাজ। নিশ্চয় উন্দলুসকে মুসলমানদের কবল থেকে মুক্ত করার সৌভাগ্য মারীদার লোকদেরই হবে।
লোকেরা দলে দলে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের ঝান্ডাতলে জমা হতে লাগলো। গোপনে চলতে লাগলো তার জঙ্গি প্রস্তুতি। মারীদার প্রশাসন এ ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ রইলো। অবশ্য তাদের লোকবলও খুব বেশি ছিলো না।
