ঘোড়সওয়ার রাতেই পৌঁছে গেলো মারীদা পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে। সেখানে তাদের দল নেতাকে সংবাদ দিলো, আবদুর রহমান ফ্রান্সের ওপর হামলা করতে যাচ্ছেন।
আবদুর রহমান তার এই অভিযানের কথা এক প্রকার গোপনই রেখেছিলেন। কিন্তু যেখানে তোষামোদকারীদের অস্তিত্ব আছে সেখানে তারা জামার আস্তিনে লালিত পালিত ভয়ংকর সাপ হয়ে উঠতে সময় নেয় না।
পনের ষোল দিন পর সালার মুসা ইবনে মুসা ও সালার আবদুর রউফ যার যার নির্ধারিত রণাঙ্গনস্থলে পৌঁছে গেলেন। আবদুর রহমানও তার পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্ধেক পথ অতিক্রম করে গেছেন।
এ সময় মারীদা থেকে এক সেনা কমান্ডার পথিমধ্যে আবদুর রহমানের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। সে তাকে ভয়ংকর এক সংবাদ দিলো যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার মারীদার ওপর হামলা করেছে। মারীদার গভর্ণরকে গ্রেফতার করেছে। আর খ্রিষ্টানরা সারা শহরে লুটপাট চালাচ্ছে। সেখানে এখন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের হুকুম চলছে।
আবদুর রহমান ফ্রান্সের দিকে তার অগ্রগামীতা স্থগিত করে দিলেন। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে তিনি মোটেও বিলম্ব করলেন না।
দ্রুত গতির এক সংবাদবাহককে এই পয়গাম দিয়ে সালার আবদুর রউফের দিকে পাঠালেন যে, তিনি সংবাদ প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে অভিযান মুলতুবী রেখে যেন তীব্র বেগে মারীদা অভিমুখে রওয়ানা দেন। আবদুর রহমান আরো নির্দেশ দেন, মারীদা পৌঁছেই কাল বিলম্ব না করে মারীদা অবরোধ করে নেবে।
আবদুর রহমান ফ্রান্সের ওপর হামলা মুলতুবী রেখে ঝড়ো বেগে তার সেনা ইউনিটগুলো নিয়ে মারীদার দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন।
উন্দলুসের কালনাগিনী ইতিমধ্যে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ পুরুষকে তার ভয়ংকর ছোবল হানতে সফলই হয়েছে।
***
ক্রুশ-কে কেন্দ্র করে সেদিনই ক্রুসেডের যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো যেদিন গির্জার পূজারীরা অনুভব করলো ক্রুশের ওপর কালেমায়ে তায়্যিবার প্রাধান্য বিস্তার শুরু হয়ে গেছে।
এটা সুলতানা সালাহউদ্দিন আইয়ূবীরও অনেক আগের কথা। ইসলাম যখন রোম সাগর অতিক্রম করে খ্রিষ্টজগতে মহাজাগরণ হয়ে প্রবেশ করলো তখন থেকেই ক্রুশের পূজারীরা কোমরে গামছা বেঁধে ইসলামের বিরুদ্ধে আদা জল খেয়ে লেগে পড়ে।
প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হয়ে ময়দানে নেমে পড়ে। যেটা আগে ছিলো রাজায় রাজায় যুদ্ধ সেটাকে বলা হতে লাগলো দুই ধর্মের যুদ্ধ।
মুসলমানরা সবসময় একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হাতে তলোয়ার নিয়েছে। যুদ্ধের কলা কৌশল ও নেতৃত্বদানে তারা বিশ্বজোড়া দক্ষতা-খ্যাতি অর্জন করে অল্প সময়েই। প্রতিটি রণাঙ্গনে তারা তাদের অসাধারণ রণাঙ্গনীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে।
নিপুণ নেতৃত্বদান ও গেরিলা কৌশল এবং অদৃশ্য বিজয়ী স্পৃহা স্বল্পসংখ্যক সেনাদল নিয়ে পাঁচ থেকে দশগুণ সেনা শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে থাকে মুসলমানরা।
মুসলমানরা যে এলাকা জয় করতে সে এলাকা তলোয়ার দিয়ে নয়, প্রেম, ভালোবাসা, চারিত্রিক মধুরিমা দিয়ে সে এলাকার মানুষের মন জয় করে নিতো।
খ্রিষ্টজগত ইসলামের অপ্রতিরোধ্য বিজয় ও সাফল্য দেখে নিজেদের যুদ্ধ শক্তির সঙ্গে অন্যান্য কলা-কৌশলও ব্যবহার করতে শুরু করলো। সেটা হলো মাটির নিচ থেকে চক্রান্তের জাল বিস্তার করা। মানুষের মানবিক দুর্বলতা, নারীর রূপ-সৌন্দর্য, শাসন ক্ষমতা ও ধন-সম্পদের লোভকে গির্জার পূজারীরা ব্যবহার করতে শুরু করলো।
মুসলিম আমীর উমারা, ওযীর, হাকিম, সালার, সিপাহসালারদের মধ্যে নারী ও সম্পদের লোভ জাগিয়ে ক্রমেই তাদেরকে জাতির গাদ্দারে কাতারে নিয়ে দাঁড় করালো।
ইসলামের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর শত্রু ইহুদীরা মাটি খুঁড়ে উঠা এসব ষড়যন্ত্র ও পায়তারার পক্ষে সর্বশক্তিতে হাওয়া দিয়ে গেলো। ইহুদীরা খ্রিষ্টানদেরকে নতুন নতুন ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টির মাল মশলা জোগাড় করে দিলো। নিজেদের অতি সুন্দরী ও চরিত্রহীন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তা অসংখ্য মেয়ে সরবরাহ করলো।
খ্রিষ্টানরা এই মায়াবী কৌশলের সাফল্য দেখে নিজেদের মেয়েদেরকেও এ কাজে ব্যবহার করতে শুরু করলো এবং তাদেরকে মুসলিম আমীর উমারাদের মহলে ঢুকিয়ে দিলো।
ইসলামের মূল ভিত্তিকে বিকৃত করার জন্য ওরা এমন এমন আলেম শ্রেণী গড়ে তুললো যারা কুরআন হাদীসের শিক্ষা নিয়ে মসজিদে মসজিদে ইমামের ছদ্মবেশে ঢুকে পড়লো এবং মনগড়া তাফসীর ও জাল হাদীস শুনিয়ে মুসল্লীদেরকে বিভ্রান্ত করতে লাগলো।
এভাবে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওরা চিন্তা-চেতনা, আকীদা বিশ্বাস ও আদর্শিক সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেয়।
আর এর বিপরীতে মুসলিম পথনির্দেশক ও শাসক শ্রেণীর চিন্তা-চেতনা তিমির থেকে তিমিরেই তলিয়ে যেতে থাকে।
ইহুদী-খ্রিষ্টানদের পাতা মায়াবী জালে তারা বড় আয়েশী ভঙ্গিতে পা দিতে থাকে। নিজেদের ওপর ক্ষমতার নেশা সওয়ার করে তাতেই বুঁদ হতে থাকে। অনেক সালার ও সিপাহসালারকে ক্ষমতার লোভী বানিয়ে তাদেরকে গৃহ-যুদ্ধে নামিয়ে দেয়।
যারা এসব গৃহ-যুদ্ধের অবতারণা করে দেশের ছোট-বড় অংশের ক্ষমতা পেলো তারা সে অঞ্চলগুলোকে এত দুর্বল করে ছাড়লো যে, সেটা দেশ ও জাতির অতি রুগ্ন অংশ হয়ে উঠলো। রণাঙ্গন ছেড়ে ওরা প্রশাসন চালাতে এসে চরম অযোগ্যতা ও অক্ষমতার পরিচয় দিলো।
