***
সিপাহসালার ও সব সালাররা যখন তার সামনে গিয়ে বসলেন আবদুর রহমান তখন একজন বদলে যাওয়া মানুষ।
তিনি কামরায় পায়চারী করছিলেন। যেন এক বিজয় সালার দৃঢ় পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তিনি সালারদের সামনে গিয়ে বসলন। তার চোখের দৃষ্টিতে এমন এক দৃষ্টির বিচ্ছুরণ ঘটলো যে, সালারদের ওপর সেই আগের আবদুর রহমানের শ্রদ্ধাযুক্ত ভালোবাসা বিস্তার করলো।
সালারে আলা উবাইদুল্লাহ! তিনি বললেন, আমাকে সীমান্তের সঠিক খবর শোনান যা ফ্রান্সের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়েছে। আমাকে বলুন আমাদের আভ্যন্তরীণ অবস্থা কী? এও বলুন ফ্রান্সের ওপর হামলা করতে গেলে কী কী সমস্যায় পড়তে হবে?
দৃঢ় সংকল্প করে নিলে কোন সমসাই সমস্যা হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারবে না। উবাইদুল্লাহ বলেন, বাস্তবতা ও সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, আমদে মাত্র কয়েকদিনের প্রস্তুতি দরকার।
উবাইদুল্লাহ আবদুর রহমানকে বিস্তারিত সব শোনালেন, বাইরে থেকে এবং ভিতর থেকে উন্দলুস কত বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে। অন্যান্য সালাররাও আরো অনেক কিছু জানালেন। সবকিছু শুনে আবদুর রহমান যখন কথা বললেন তখন সবাই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
আমরা ফ্রান্সের ওপর হামলা করতে যাচ্ছি। আবদুর রহমানের দৃঢ় গলা আন্দোলিত হলো, যেখানে ফেতনা আর ফ্যাসিবাদ লালিত পালিত হচ্ছে আমরা সে জায়গা একেবারে ধ্বংস করে দেবো।
সালারদের নিস্তব্ধতা নির্ভার হাসির মুখরতায় রূপান্তরিত হয়ে উঠলো। ওরা তো সবাই রণাঙ্গণের স্বপ্নপুরুষ। এই হুকুম শোনার জন্যই তো তারা ব্যাকুল ছিলেন। আবদুর রহমান হামলার পরিকল্পনা, কৌশল ও দিক নির্দেশনা দিতে শুরু করলেন।
যে সেনা ইউনিটগুলো অভিযানে বের হতে ও যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত তার থেকে কয়েকটি ইউনিট সালার মুসা ইবনে মুসার নেতৃত্বে কাল সকালে গোথাক মার্চ এর দিকে রওয়ানা হয়ে যাবে। আবদুর রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলে গেলেন,
কয়েকটি ইউনিট সালার আবদুর রউফের কমান্ডে ফ্রান্সের সীমান্ত অভিমুখে কোচ করবে।…..
মুসা ইবনে মুসা গোথাক মার্চের ওপর হামলা করবে। আর আবদুর রউফ সীমান্ত এলাকায় ছোট ছোট হামলা করবে এমনভাবে যাতে মনে হয় সীমান্ত পর্যন্ত এসব হামলা সীমাবদ্ধ থাকবে। আমি নিজে তোমাদের পেছন পেছন রওয়ানা হয়ে যাবো। আমার সঙ্গে উবাইদুল্লাহ, আবদুল করীম ও ফারতুনের সেনা ইউনিটগুলো থাকবে।…..
এদেরকে নিয়ে আমি ফ্রান্সের ওপর তীব্র হামলা চালাবো। তারপর সবগুলো ইউনিট আমার ডানে বামে এসে হামলা করে ফান্সের জয় পূর্ণ করবে।
ওখানকার অভিযান শেষ হলে আমরা আভ্যন্তরীণ চক্রান্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। সবার আগে জরুরি হলো, প্রতিবেশী যেসব দেশ থেকে এসব চক্রান্তের কলকাঠি নাড়া হচ্ছে তাদেরকে আগে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা। আমি এই যুদ্ধকে চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসাবে দেখতে চাই।
সালাররা সবাই এ পরিকল্পনা পছন্দ করলেন। কিছু পরামর্শ দেয়া হলো। কিছু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলো। তারপর এমন এক কুশলী পরিকল্পনা নেয়া হলো, যার দ্বারা ফ্রান্সের সালতানাতে ইসলামিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা সুনিশ্চিত বলে দেখা যাচ্ছিলো।
***
তারপর আবদুর রহমানের বিন্যাস অনুযায়ী সেনাবাহিনী রওয়ানা হয়ে গেলো সীমান্ত এলাকা অভিমুখে। তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে কমপক্ষে বিশ দিন লেগে যেতে পারে। সালার মুসা ইবনে মুসা ও সালার আবদুর রউফ এর সেনা ইউনিট আগেই রওয়ানা হয়ে গেছে। দুদিনের বিরতিতে আমীরে উন্দলুস আবদুর রহমানও তার ইউনিট নিয়ে কোচ করলেন।
প্রায় অধিকাংশ সেনা ইউনিট নিয়ে যখন পুরো সেনাবাহিনী কর্ডোভা থেকে রওয়ানা করছিলো তখন এক ঘোড়সওয়ার সপাটে ঘোড়া ছুটাচ্ছিলো। তার গন্তব্য মারীদা।
যারিয়াব, সুলতানা, আবদুর রহমানের অন্যান্য প্রণয়নী রূপসী মেয়েরা এক উঁচু প্রান্তরে দাঁড়িয় অপসৃয়মান সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়েছিলো। শহরের হাজারো লোক সেনা দলকে খোদা হাফেজ জানাতে বাড়ির ছাদে উঠে দুহাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিলো।
লোকটি কি সময়মতো পৌঁছতে পারবে? যারিয়াবকে সুলতানা জিজ্ঞেস করলো।
সময়ের আগেই পৌঁছে যাবে। যারিয়াব বললো।
আবদুর রহমানকে এই হামলার জন্য উস্কে দিতে মুদ্দাসসিরার অনেক বড় হাত রয়েছে। সুলতানা বললো, আবদুর রহমান এখনো তার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মুদ্দাসসিরাকে আমি জীবিত রাখবো না।
চিন্তা ভাবনা করে যা কিছু করার করো সুলতানা! যারিয়াব বললো, মহলে এমন কোন আচরণ করবে না যাতে আবদুর রহমান সন্দিহান হয়ে উঠেন। তুমি মনে হয় এখনো বুঝতে পারোনি, আবদুর রহমান কতটা দূরদর্শী এবং দুঃসাহসী। চিন্তা করো না, তাকে মাঝ রাস্তা থেকেই ফিরে আসতে হবে।
যে ঘোড়সওয়ার একা উধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো তাকে যারিয়াবই পাঠিয়েছে।
মারীদা থেকে বিতাড়িত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার এখন এক যুদ্ধ শক্তি হয়ে উঠেছে। হাজারো খ্রিষ্টান তার দলে যোগ দিয়েছে। এর মধ্যে সেসব নওমুসলিম আছে যারা প্রকাশ্যে মুসলমান এবং গোপনে খ্রিষ্টানই রয়ে গেছে। এদেরকে বলা হতো মুআল্লিদীন।
এরা উন্দলুসের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলেছে এবং সেটাকে বিদ্রোহ আন্দোলনের রূপ দিয়েছে। ইতিহাসে যাকে তাহরীকে মুআল্লিদীন বলা হয়েছে।
