মুদ্দাসসিরা এক সময় তার পরিচারিকা ছিলো। এখন তার স্ত্রী। রূপ যৌবনে সুলতানার চেয়ে বেশি না হলেও কম নয়। তার মুখের ভাষায় বাচ্চাদের মতো কেমন নিষ্পাপ এক সরলতা রয়েছে। সুলতানা আসার আগে আবদুর রহমানের সবচেয়ে প্রিয় ছিলো এই মুদ্দাসসিরা। এখনো কম প্রিয় নয়।
আপনি কি হেরে গেছেন? মুদ্দাসসিরা আবেগদীপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি সে আবদুর রহমান নন যিনি তার পিতার শাসনামলে সীমান্ত, এলাকায় কয়েকবারই ফ্রান্সীয়দেরকে রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন?
আপনি কি আর সে আবদুর রহমান নন যিনি সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে শারলেমীন সালিবীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন। শারলেমীন যখন তার পরাজয়ের প্রতিশোদ নিতে ওরতুশা অবরোধ করলো, তখন এমন শক্তিশালী ও নিশ্চিদ্র অবরোধ কে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিলেন?…..আবদুর রহমানই সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন।…..হ্যাঁ, আপনিই।
আবদুর রহমান তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তার এই সরল ও নিষ্পাপ সজীব-পেলবতায় ভরা মুদ্দাসসিরাকে বেশ ভালো লাগলো।
মুদ্দাসসিরাকে একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু মুদ্দাসসিরা তখন তীব্র বেগে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো। আবদুর রহমান স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। কিন্তু তার ভেতর এক ঝড় দানা বেঁধে উঠতে লাগলো।
মুদ্দাসসিরা কয়েক মুহূর্ত পরেই ফিরে এলো। তার হাতে কোষবদ্ধ। তলোয়ার। তলোয়ারটি খাপ থেকে এক ঝটকায় বের করে ফেললো মুদ্দাসসিরা। তারপর খাপটি এত জোরে একদিকে ছুঁড়ে মারলো যে, সেটি দরজার বাইরে। গিয়ে পড়লো। মুদ্দাসসিরা তলোয়ারটি আবদুর রহমানের মুখের কাছে নিয়ে ধরলো।
এর ঘ্রাণ নিন আগে, মুদ্দাসসিরা বললো, একে ভালো করে দেখুন। সেসব কাফেরদের রক্তের গন্ধ পাবেন যাদেরকে এই তলোয়ার দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে হত্যা করেছেন। এই তরোয়ারের চকচকে দীপ্তিতে সেসব কাফেরদের দুর্গগুলো দেখতে পাবেন যেগুলো আপনার তলোয়ারের আঘাতে জয় করেছিলেন। এই তলোয়ার ভোতা হয়ে যায়নি। এতে ঝং ধরেনি। আপনি কেন এভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলবেন?
তুমি কি শোনোনি এ লোক আমকে কী সব কথা বলে গেছে? আবদুর রহমান বললেন অনেকটা অভিমানী গলায়।
এক সিংহকে জাগাতে এবং তাকে গভীর গুহা থেকে বের করতে হলে সেই গুহার সামনে আগুন জ্বালাতে হয়। মুদ্দাসসিরা বললো, প্রধান সেনাপতি আপনাকে যা বলেছে তার প্রতিটি শব্দ আমি শুনেছি। আমি তো আপনাকে আমার ভালোবাসার দোহাই দিতে পারবো না। কারণ, আপনি আপনার ভালোবাসা একাধিক নারীর মধ্যে বণ্টন করে রেখেছেন।…..
আপনাকে আমি সেই দুই বাচ্চার দোহাই দিয়ে বলছি, যাদেরকে আপনি জন্ম দিয়েছেন। আপনার সেই সন্তানদেরকে এবং তাদের অনাগত সন্তানদেরকে আপনার সামনে রাখুন। তাদেরকে ইতিহাসের সেই পাথেয় দিয়ে যান যা আপনার পূর্বপুরুষরা দিয়ে যেতে পারেনি। তাদেরকে তো বনী উমাইয়ার কিংবদন্তী সালার ও বিজয়ী সিপাহসালারদের নিকৃষ্ট হন্তারক বলা হয়। তাদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন আপনার দ্বারা না হয়।
মুদ্দাসসিরা তলোয়ারটি তার কোলে রেখে দিলো এবং তার চেহারা দুহাতে তুলে ধরে চোখে চোখ রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
কিন্তু ওরা চাচ্ছেটা কী? আবদুর রহমান সজাগ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাছে যে সালাররা আসে তারা কিছু বাঁকা ও তীর্যক কথাবার্তা ছুঁড়ে চলে যায়।
গোথাক মার্চ এক শক্তি হয়ে উঠছে, মুদ্দাসসিরা বললো, ফ্রান্সের শাহ লুই তাকে মদদ দিচ্ছে…..আপনার নিজের এক রাজ্য মারীদায় বিদ্রোহের অঙ্গার জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।
তোমাকে একথা কে বলেছে?
তারাই বলেছেন যাদের কথা আপনি শুনতে চান না।
আর আমার কাছে এসব কথা কে গোপন করছে?
আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেবো না। মুদ্দাসসিরা বললো, না হয় আপনি সতীন বিদ্বেষ ও হিংসার অপবাদ আমার ওপর আরোপ করবেন। কে জানে আপনি না আবার বলে দেন, মুদ্দাসসিরা তুমি আর যাই হও একজন পরিচারিকাই তো ছিলে। তুমি অপূর্ণ জ্ঞান-বুদ্ধির মেয়ে।
আপনাকে আমি রাজত্ব ও নেতৃত্বের উচ্চাসন থেকে টেনে হেঁচড়ে নাময়ে অধঃপতনের নোংরা আঁস্তাকুড়ে ফেলতে চাই না। আপনার প্রিয় লোকদের কেউ কেউ মনে প্রাণেই তা চায়। যাদের প্রেম-ভালোবাসায় আপনি আজ উন্মত্ততা আর অন্ধত্ব বরণ করে ভাবছেন আপনি ও আপনার রাজত্ব নিরাপদ রয়েছে। আপনার অন্তরে শুধু এই তলোয়ারেরই প্রেম ভালোবাসা লালন করা উচিত।
আবদুর রহমান তলোয়ারটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুদ্দাসসিরাও নিশ্চুপ তার দিকে অর্থপূর্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো।
আবদুর রহমানের মুখের বর্ণ ক্রমেই দীপ্তিময় হয়ে উঠলো। আচমকা তিনি উঠে দাঁড়ালেন। প্রহরীকে আওয়াজ দিলেন। প্রহরী দৌড়ে এলো।
সিপাহসালারকে গিয়ে বলো তার সব সালার ও নায়েবে সালারকে নিয়ে যেন এখনই আমার কাছে চলে আসেন।
মুদ্দাসসিরার দিকে তাকিয়ে তার মুখটি এক হাতে তুলে কপালে একটি গভীর চুম্বন একে বললেন,
মুদ্দাসসিরা! তুমি এখন যাও। তলোয়ারটি নিয়ে যাও। সময় হলে আমি এটি তোমার কাছ থেকে চেয়ে নেবো।
মুদ্দাসসিরার দুচোখ কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে উঠলো। কান্নার প্রবল একটা বেগ সামলে সে আর কিছু বলতে পারলো না। ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেলো।
