কিন্তু মুসলিম জাতির দুর্ভাগ্য যে, খেলাফতের গতিতে বসলেন সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক। তিনি সিপাহসালার মুসা থেকে সেই প্রতিশোধ নিলেন যা, বনী উমাইয়ার ইতিহাসকে চিরদিন লজ্জা দেবে।
মুসার বিরুদ্ধে নিজের লোকজনকে লেলিয়ে দিয়ে নিজের মতো করে অনুসন্ধান চালিয়ে তাঁর সব অর্জনকে তছনছ করে দিলেন। তার বিরুদ্ধে সাজানো, মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করা হলো।…..
তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ পরবর্তীতে এক অক্ষরও কেউ সত্য বলে প্রমাণ করতে পারেনি। তার ওপর এমন বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেয়া হলো যে, তিনি সেটা পরিশোধ করতে পারলেন না।……
সেফাট নামে এক ইংরেজ ঐতিহাসিক লিখেছেন, সুলাইমান সিপাহসালার মুসার ওপর এক লাখ দীনার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ দায়ের করে। কেউ কেউ দেড় লাখ দীনারের কথাও উল্লেখ করেছেন।
একজন সৎ, নির্লোভ সিপাহসালার এত টাকা কী করে পরিশোধ করবেন? উবাইদুল্লাহ বলছিলেন কিন্তু সুলাইমান তার বিরোধী পক্ষ থেকে বড়ই পৈশাচিক প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। যে ব্যবহার তিনি মুসার সঙ্গে করলেন তা শুনে আজো অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। উত্তপ্ত বালিতে একটি কাঠের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিলেন নরপিশাচ সুলাইমান।…..
আপনি কি জানেন তখন মুসার বয়স কত ছিলো?…..আশি বছর বয়সে তিনি তারিককে সঙ্গে নিয়ে উন্দলুস জয় করেন। এর পুরস্কার তিনি এই পেলেন যে, একাধারে কয়েক দিন মরুর আগুন ঝরা সূর্যের নিচে ফুটতে থাকা বালির ওপর খালি পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। তারপর তাকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা হলো।…..
আপনি কি জানেন আমীরে উন্দলুস! সিপাহসালার মুসার এক যুবক ছেলে ছিলেন আবদুল আজীজ। তিনিও ছিলেন মুসলিম সেনাদলের একজন সালার। খলীফা সুলাইমানের এই ভয় ছিলো, মুসার এই ছেলে তার বাপকে নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে পারে। সুলাইমান আবদুল আজীজকে এক মুনাফিক সন্ত্রাসী আরব দিয়ে তখন খুন করিয়েছেন যখন তিনি তার সেনাদলকে নিয়ে ফজর নামায পড়ছিলেন। আর তিনি ইমামতি করছিলেন।…..
ইতিহাস থেকে আপনি এই কুৎসিত অধ্যায় কি করে মুছে ফেলবেন যে, আবদুল আজীজ সুরা ফাতেহা শেষ করে সুরা ওয়াকিয়া শুরু করেছিলেন। এ সময় সুলাইমানের পাঠানো সেই খুনী তাকে হত্যা করে।…..
নরাধম সুলাইমান এতেই ক্ষান্ত হলেন না। বরং আবদুল আজীজের কর্তিত মাথা তার পিতা কিংবদন্তী বীর মুসার কাছে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দিলেন। মুসা সন্তানের এই কর্তিত মাথা দেখে চিৎকার করে বললেন, ঐ হতভাগা এমন এক মানুষকে খুন করলো যে দিনে জিহাদ করতো, আর রাত কাটিয়ে দিতে ইবাদতে…..মুসা আশি বছর বয়সেও এই চরম আঘাত বুক পেতে নিলেন।…..
***
উবাইদুল্লাহ কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন। কান্না চাপা কণ্ঠে বলে গেলেন,
৯৭ হিজরীর হজ্জের কথা মনে করুন আমীরে উন্দলুস! সে বছর ইসলামের দুমুখী সাপ, মুনাফিক সুলাইমান হজ্বে গিয়েছিলেন। তিনি সেই বৃদ্ধ সিপাহসালার মুসাকে পায়ে শিকল বেঁধে তার সঙ্গে নিয়ে যান। তারপর তাকে সেই বুদ্ধ-ভিক্ষুকদের সারিতে দাঁড় করিয়ে দেন যারা হাজিদের কাছ থেকে ভিক্ষা চাইতে থাকে। সুলাইমান তাকে বলেন, ভিক্ষা চাও, আর জরিমানা আদায় করো এবং মুক্ত হয়ে যাও।…..
সে বছরের হাজিরা দারুন আনন্দিত ছিলো। একে অপরকে মোবারকবাদ দিচ্ছিলো এ কারণে যে, সালতানাতে ইসলামিয়ায় উন্দলুসের মতো এত বড় একটি দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু কারো জানা ছিলো না, উন্দলুস বিজয়ের অন্যতম রূপকার শিকল বাঁধা পায়ে ভিখিরীদের সারিতে দাঁড়িয়ে আছে।…..
অবশেষে আল্লাহ তাআলারও তার ওপর রহম হলো। তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় আল্লাহর প্রিয় হয়ে গেলেন।…..আর তারিক ইবনে যিয়াদ গুমনাম হয়ে এই দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। পশুত্ব বরণকারী সুলাইমান তাকে আর কোন অভিযানে যেতে দেননি।
আবদুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অস্থির হয়ে কামরায় পায়চারী করতে লাগলেন।
আল্লাহর দেয়া কানুন আর বিধি বিধানকে নিজের হাতে নেয়ার চেষ্টা করবেন না আমীরে উন্দলুস! উবাইদুললাহ বললেন, আপনি চাইলে আমার সঙ্গে সে ব্যবহার করতে পারেন যা খলীফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক মুহাম্মদ ইবনে কাসিম, সিপাহসালার মুসা ও সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদের সঙ্গে করেছেন।
কিন্তু আপনাকে এও বলে দিচ্ছি, আমি ও আমার কোন সালার সত্যের আওয়াজ ও সত্যপথ থেকে এক চুল পরিমাণও হটবো না। আপনাকে আমি সতর্ক করে দিচ্ছি, আপনার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
এতটুকু বলে উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ উঠে পড়লেন এবং আর কিছু না বলে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আবদুর রহমান নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন যে দরজা দিয়ে তার প্রধান সেনাপতি উবাইদুল্লাহ ধুপধাপ পায়ে বেরিয়ে গেছেন।
উবাইদুল্লাহ সেই তাল-তরঙ্গ ছিঁড়ে দিয়ে গেছেন যেটা ব্যবহার করে যারিয়াব ও সুলতানা তাকে বাস্তবতা থেকে দূরে নিস্তব্ধ-শীতল রাখতে চেষ্টা করতো। তিনি দাঁড়ানো থেকে বসে পড়লেন। মাথা নামিয়ে এক হাত কপালে ঠেকিয় গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
***
তিনি কাঁধের ওপর কারো হাতের মৃদু স্পর্শ অনুভব করলেন। মাথা উঠিয়ে দেখলেন, মুদ্দাসসিরা।
