আমার মনে এমন কোন হিংসা-বিদ্বেষ নেই উবাইদুল্লাহ!
উন্দলুসের ইতিহাস নিশ্চয় আপনার স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। উবাইদুল্লাহ আবদুর রহমানের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, যার মধ্যে হিংসা কাজ করে সে নিজেকে অহিংসই মনে করে আত্মতৃপ্তি বোধ করে। উন্দলুসের সীমান্ত সমুদ্র তীরে পৌঁছে নৌযানগুলোকে যে তারিক জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন তিনি যখন উন্দলুস জয় করলেন তখন সালারে আলা মুসার মনে এ ধরনেরই হিংসাত্মক মনোভাব জেগে উঠলো।…..
তিনি তারিক ইবনে যিয়াদের অগ্রগামীতার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন। শুধু বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন না। বরং কুচক্রী হয়ে তার কাছে কৈফিয়তও চাইলেন, তিনি কেন তার হুকুম ছাড়া এতদূর চলে এলেন?
তিনি তারিকের হাত থেকে কমান্ডিং নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন। কিন্তু তারিক শান্ত মাথায় ব্যাপারটা সামাল দিলেন এবং তাকে এ নিশ্চয়তা দিলেন যে, হুকুম মুসারই চলবে। তারিক তারই অধীনস্থ হয়ে থাকবে। অবশেষে দুজনের মধ্যে চমৎকার একটা সমঝোতা হয় এবং উভয়ে ফ্রান্সের সীমান্ত পর্যন্ত তাদের বিজয় কেতন ওড়াতে সক্ষম হয়।
আমার মনে আছে উবাইদুল্লাহ! এ তো আমার বাপ দাদাদের কথা। আমি এসব ভুলবো কি করে? আবদুর রহমান বললেন।
***
না, আপনার সেভাবে কিছুই মনে নেই যেভাবে মনে থাকলে বিবেক কখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতে পারে না। উবাইদুল্লাহ বললেন, আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি আপনার পূর্ব পুরুষরা কী কী পদস্খলনের শিকার হয়েছিলো।…..
যখন মুসা ও তারিক বিন যিয়াদ ফ্রান্সের সীমান্তে পৌঁছে গেছেন তখন খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের হুকুম এসে গেলো, তাদের দুজনকে বাগদাদে ফিরে যেতে হবে। আর সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন নেই।
এদের জনপ্রিয়তার কারণে তিনিও তার খেলাফতকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছিলেন। মুসা জিদ ধরেছিলেন তিন ফিরে যাবেন না। কিন্তু তারিক বলেছিলেন, তিনি খেলাফতের হুকুমকে অমান্য করার মতো পাপ করবেন না। তিনি চলে গেলেন বাগদাদে। তারপর মুসাকেও যেতে হলো।
তারপর কি হয়েছিলো আমি জানি ইবনে আবদুল্লাহ। আবদুর রহমান ঝাঝালো কণ্ঠে বললেন, খলীফা মুসার সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করেছিলেন। আর তারিকের অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়।
আমীরে উন্দলুস আবদুর রহমানের অবস্থা এখন এমন হয়ে গেলো যেন তিনি সেনাপতি উবাইদুল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সেনাপতি তাকে তার পিতৃপুরুষের ইতিহাস শুনাচ্ছেন। তার শোনানোর ভঙ্গিতে একে তো ছিলো তিক্ত বাস্তবতা, তারপর তিনি আবেগদীপ্ত কণ্ঠে বলে যাচ্ছিলেন।
এই আবেগে ক্রোধ থাকলেও তাতে আগ্রাসী মনোভাব ছিলো না।
উবাইদুল্লাহ তাকে দোষারোপ করছিলেন না। তার দৃঢ় কণ্ঠের বক্তব্যে একটি সংকল্পই ফুটে উঠছিলো। সেটা হলো, আমীরে উন্দলুস কিছু না করলে তিনি নিজেই উন্দলুসকে বাঁচাতে যুদ্ধের সব ধরনের পদক্ষেপই নেবেন।
আবদুর রহমান তাকে চুপ করাতে অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু তিনি স্বয়ং আবেগ ও নতুন এক স্বংকল্পময় ক্ষুব্ধতায় ভেসে গেলেন। তার রাজত্ব ও শাসন ক্ষমতা এবং তার ব্যক্তিত্ব এই উবাইদুল্লাহর ব্যক্তিত্বে যেন একাকার হয়ে গেলো।
উবাইদুল্লাহ তাকে বনী উমাইয়ার ইতিহাস শোনাচ্ছিলেন। আবদুর রহমান তো বনী উমাইয়ারই এক উজ্জ্বল শাসক পুরুষ ছিলেন এক সময়।…..
উবাইদুল্লাহ তাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন অক্লান্ত। তিনি তাকে কোন গল্প কাহিনী শোনাচ্ছিলেন না। এটা সেই শতাব্দী এর আগের শতাব্দীরই খেলাফত ও উন্দলুসের ইতিহাস। …..
এই ইতিহাসই আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। আমরা সেই ইতিহাসকে উপেক্ষা করতে করতে আজ অধঃপতনের চরমে পৌঁছেছি।
***
আমীরে উন্দলুস! উবাইদুল্লাহ বলে গেলেন, আপনি বলছেন, সিপাহসালার মুসার সঙ্গে খলীফা খুব বাজে ব্যবহার করেছিলেন। এতটুকু বলাই যথেষ্ট হবে না। মুসা ও তারিক যখন দামেশকের কিছুটা দূরে তখন খলীফা ইবনে আবদুল মালিকের ভাই সুলাইমান তার সঙ্গে এসে সাক্ষাত করলেন। খলীফা তখন মৃত্যু শয্যায়। আর কয়েকদিনের মেহমান মাত্র তিনি।…..।
সুলাইমান তাদেরকে বললেন, তারা এ অবস্থায় যেন দামেশকে না যায়। তার খেলাফতের গদির দাবীদার একের অধিক। এর মধ্যে সুলাইমানও একজন। তিনি মুসা ও তারিককে তার দলে ভিড়িয়ে অর্থাৎ সেনাবাহিনীকে হাত করে খেলাফতের গতি দখল করতে চান।…..
মুসা তাকে বললেন,
‘খেলাফতের ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি কিংবা তারিক আমরা কেউ খলীফা হতে চাই না। আমাদেরকে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। আমরা ফিরে এসেছি। আমরা খলীফার কাছে তো অবশ্যই যাবো। তাকে না পেলে কমপক্ষে তার জানাযায় তো শরীক হতে পারবো।‘
‘সুলাইমান মূসাকে রাজি করাতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন। অবশেষে মুসা তাকে এই জবাব দিয়ে চুপসে দিলেন যে, কোন সিপাহসালার বা সালারের রাজনীতির ব্যাপারে কোন আগ্রহ থাকা উচিত নয়। আর আমি ফৌজেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে দেবো না। সুলাইমান এ কথা শুনে রুষ্ট হয়ে চলে গেলেন।…..’
‘অবশেষে সিপাহসালার মুসা ও তারিক খলীফার সামনে গিয়ে হাজির হলেন। তার সামনে উপহার-উপঢৌকনের স্তূপ আর কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা রাখা হলো। খলীফা ওয়ালিদ তখন কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তিনি তো খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু তার ভাই সুলাইমান জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে রইলেন। তারপর মাত্র চল্লিশ দিন ওয়াীলদ ইবনে আবদুল মালিক বেঁচে ছিলেন।…..’
