ইতিহাস সাক্ষী, উন্দলুসের প্রায় সব শাসকই তোষামোদ ছাড়া অন্য কিছু বুঝতেন না। তারা ইসলামী খেলাফতের প্রতিনিধি ছিলেন কাগজে কলমে। কিন্তু বাস্তবে তারা রাজকীয় দরবার প্রতিষ্ঠা করেন। টুকারদের পরিবেষ্টনে তারা সবসময় থাকতেন। বাইরের কোন সঠিক রিপোর্ট তাদেরকে দেয়া হতো না।
চাটুকার হাকিমরা ইসলামের কথা বলতে ঠিক, কিন্তু তাদের বাস্তব জীবন ছিলো ইসলাম বিরোধী।
উবাইদুল্লাহ যখন আবদুর রহমানকে বললেন তিনি একান্তে তার সঙ্গে কথা বলতে চান তখন আবার তার চোখ মুখ থমথমে হয়ে উঠলো। দুজনের মধ্যে কিছুটা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো।
আমাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিন। উবাইদুল্লাহ বলেন, তবে আপনাকে বলে দিচ্ছি আপনার দরবার থেকেও আমি চলে যাবো। উন্দলুস থেকে অবশ্য যাবো না। আমি আপনাকে এই মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে যাবো না যে, উন্দলুস আপনার মালিকানাভুক্ত রাজত্ব।…..
যে পর্যন্ত আমার মধ্যে ও আমার সঙ্গের কমান্ডারদের মধ্যে ঈমান ও স্বাধীনতার আপোষহীন চেতনা উজ্জীবিত থাকবে, সে পর্যন্ত উন্দলুসকে কেউ তার ব্যক্তিগত জায়গীর বানাতে পারবে না।
আমি তো তোমার কথা শুনছিই উবাইদুল্লাহ! আবদুর রহমান বললেন, যারিয়াব ও সুলতানার সামনে কথা বললে কোন সমস্যা নেই।
আমি ওদের দুজনের মুখের ওপরই বলে দিচ্ছি, এক দরবারী চাটুকার গায়ক ও হেরেমের এক রূপসী নারীকে যদি আপনি আপনার সালতানাতের স্পর্শকাতর ও গোপন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেন তাহলে না আপনি থাকবেন, না থাকবে উন্দলুস। উবাইদুল্লাহ বললেন, আপনি যদি বাদশাহ না হতেন এরা আপনার চেহারাও কখনো দেখতে চাইতো না।…..
আর এই লোক যদি এমন চাটুকার গায়ক না হতো এবং এই নারী যদি এমন রূপসী না হতো, আপনি কখনো তাদের দিকে চোখ উঠিয়ে তাকাতেন না। ওদের মধ্যে এই জাদুই আছে…..একজনের কাছে সঙ্গীত, আরেকজনের কাছে রূপ আর মনভোলানো অঙ্গভঙ্গি…..
এ ছাড়া অন্যকিছু নেই ওদের মধ্যে। এই জাদুর গুণেই ওদেরকে আপনার একান্ত বিশ্বস্ত মনে হয়।
যারিয়াব ও সুলতানা একে অপরের দিকে তাকালো। চোখে ইঙ্গিত করলো এবং ওখান থেকে এমনভাবে বেরিয়ে গেলো যাতে ক্ষোভ আর প্রতিবাদের অঙ্গভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আবদুর রহমান উবাইদুল্লাহর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
উবাইদুল্লাহ। আবদুর রহমান রুক্ষ গলায় বললেন, তুমি চাচ্ছোটা কী? তোমরা কেন ভুলে যাচ্চে আমি আমীরে উন্দলুস এবং আমাকে ইতিহাস শাহে উন্দলুস বলে স্মরণ করবে। আমার একটি ব্যক্তিগত জীবনও আছে। এতে কেন তোমরা বিঘ্ন ঘটাতে আসো?
এজন্য যে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে সালতানাতে ইসলামিয়ার বিশাল এক অঞ্চলের আমীর বানিয়েছেন, উবাইদুল্লাহ বললেন, আর আমীরের কোন ব্যক্তিগত জীবন থাকে না। আমীর এই মসনদে বসে-যার ওপর আপনি বসে আছেন- ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েন না।
তিনি দেশের পয়সা দিয়ে তোষামুদে গায়ক আর সুন্দরী বেলেল্লা নারীদের লালন পালন করেন না। তিনি পারেন না আনন্দ উৎসব করতে। তার কাছে যদি ব্যক্তিগত জীবন এত প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে তার এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়া উচিত।
উবাইদুল্লাহ! তোমার আসল উদ্দেশ্য কী সেটা বলে ফেলো। আবদুর রহমান অসন্তুষ্ট গলায় বললেন।
যে মানসিক অবস্থা আপনি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে রেখেছেন এ অবস্থায় আসলে কোন উদ্দেশ্য, গুরুত্বপূর্ণ কোন আলোচনাই চলে না। উবাইদুল্লাহ বললেন, আমি যুদ্ধের কথা বলবো। লড়াইয়ের কথা বলবো। আপনি কি ফ্রান্সে হামলা করার কথা শুনবেন?…..।
আপনি সেই বিদ্রোহীদের কথা শুনবেন যারা আপনারই আশেপাশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে? আপনি সেই রক্তদানের কথা শুনবেন যা উন্দলুসের মাটি আমাদের কাছে দাবী করছে?
আবদুর রহমানের মেজাজ একেবারেই চড়ে গেলো। যতই হোক, তিনি তো একজন বাদশাহই। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
এ ফয়সালা করবো আমি, ফৌজ কোথায় যাবে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে! আবদুর রহমান পায়চারী করতে করতে বললেন, আমি কোন সালার বা সেনাপতিকে এ অনুমতি দিতে পারি না যে, সে তার মন মতো যা ইচ্ছা তাই করবে। তুমি তোমার অধীনস্থ সালারদের বলে দাও, আমি যে কোন সময় সবাইকে ডাকবো এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করবো।
পরিস্থিতি এতই উদ্বেগজনক যে, আপনাকে এখনই ফয়সালা করতে হবে। উবাইদুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন, আমি প্রধান সেনাপতি! পরিস্থিতি সম্পর্কে আমিই সালারদেরকে অবহিত করবো। এটা আমারই দায়িত্ব। আর শিগগিরই আমাদেরকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমার হুকুম ছাড়া ফৌজের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া চলবে না। আবদুর রহমান এক রোখা গলায় বললেন।
আমীরে উন্দলুস! শান্ত ও মৃদুকণ্ঠে বললেন উবাইদুল্লাহ, আপনি মুসলিম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছেন। মুহাম্মদ ইবনে কাসিম হিন্দুস্তানের কুফরস্তানে ইসলামের আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং ইসলাম ক্রমেই পুরো উপমহাদেশে বিস্তার করছিলো। কিন্তু তখন খলীফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক জ্বলে উঠলেন এ কারণে যে, মানুষ খলীফার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেবে এবং এক সেনাপতির গীত গাইবে।
তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মুহাম্মদ ইবনে কাসিমকে ভারতবর্ষ থেকে ডাকিয়ে এনে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করলেন। তারপর তার রহস্যজনক মৃত্যু হলো।
