তাকে আমি শাস্তি দেবো উবাইদুল্লাহ! আবদুর রহমান বললেন, আপনার এত উত্তেজিত ও পেরেশান হওয়া উচিত নয়। এই এক লোক আমাদের কী ক্ষতি করতে পারবে? ওর সঙ্গী মেয়ে দুটিই বা উন্দলুসের কী বিগড়াতে পারবে?
উবাইদুল্লাহর বিস্ময়ের সীমা রইলো না। উন্দলুসের শাসকের এটাও জানা নেই যে, তার হুকুমতের বিরুদ্ধে দেশের আনাচে কানাচে কী তুফান উঠছে। আর তিনি বলছেন, এই এক লোক আর দুটি মেয়ে আমাদের কী ক্ষতি করতে পারবে।
উবাইদুল্লাহ তাকে গির্জার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলে আবদুর রহমান তাকে বললেন, ওযীর আবদুল করীম ও সালার আবদুর রউফ বড়ই ভুল কর্মকাণ্ড করেছে। তারা গির্জায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
আমীরে উন্দলুস! প্রধান সেনাপতি উবাইদুল্লাহ হয়রান হয়ে বললেন, আপনি এসব কি বলছেন? মনে হচ্ছে আমার অনুপস্থিতিতে আপনার আশেপাশে আপনার বিরুদ্ধে কী ঘটছে তা থেকে আপনাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
আমি তো একজন মানুষের অধিক কিছু নই, আবদুর রহমান এমন গলায় বললেন যাতে শাহী তেজ বা দাপটের ছিটেফোঁটাও নেই;……
আমি নিজে গিয়ে তো পুরো দেশের অবস্থা দেখে আসতে পারবো না। আমাকে যা বলা হয় তা আমি সত্য বলে ধরে নিই।
আবদুর রহমানের সামনে টেবিলের ওপর লম্বা একটি সুবেশী কাগজ পড়ে আছে। এতে বিশাল এক কবিতা লেখা আছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে উবাইদুল্লাহ কবিতাটি পড়ে নিলেন। এটা আমীরে উন্দলুসের প্রশংসায় লেখা হয়েছে। কবিতাটি হাতে নিলেন উবাইদুল্লাহ।
আমীরে উন্দলুস! উবাইদুল্লাহ বললেন, উন্দলুস যদি আপনার ব্যক্তিগত কোন রাজত্ব হতো এবং আমি আপনার নিজস্ব কর্মচারী হতাম তাহলে আপনার কাছে এলে প্রথমে ঝুঁকে কুর্ণিশ করতাম, তারপর আপনাকে সিজদা করতাম। এরপর সেসব কথা বলতাম, যা এই কবিতায় আপনার কাল্পনিক প্রশংসায় লেখা হয়েছে।…..
আপনার কানে যা কিছু দেয়া হয় তাকেই আপনি সত্য ও সঠিক বলে মেনে নেন।…..কেন? আমীরে উন্দলুস! কেন এমন হবে এবং এমন আর কতদিন চলবে?
উবাইদুল্লাহ! আবদুর রহমান হতাশ গলায় বললেন, তোমাদের কী হয়ে গেলো? আবদুল করীম ও আবদুর রউফকেও মনে হয় আমার প্রতি অসন্তুষ্ট। আমি বুঝি ওরা কী বলতে চায়। ওদের মনোভাব সম্পর্কে তো আমি জানি। কিন্তু তোমরা তো দরবারের আদব-শিষ্টাচারের কথাও ভুলে যাও।
আর এটাই সেই বিষের বীজ যা আপনি আপনার হাতে উন্দলুসের রগ রেশায় বপন করে চলেছেন। উবাইদুল্লাহ বেপরোয়া গলায় বললেন, প্রথম ভয়াবহ ব্যাপার হলো, আপনি তোষামোদ পছন্দ করেন খুব বেশি। ঐ কবি ও কলমবাজ চাটুকারদের আপনার মনমস্তিষ্কে সওয়ার করে নিয়েছেন, যারা আপনার কেবল স্তুতিই পাঠ করতে জানে।…..
আপনার কানে শুধু চাটুকারদের কথাই ঢুকে। আরেকটা বিষের বীজ যেটা আপনি বপন করেছেন। সেটা হলো দরবারের আদব ও শিষ্টাচার। কোন মানুষের কখনো দরবার থাকতে পারে না। ইসলাম একমাত্র আল্লাহর দরবারের কথাই বলে। যাতে আমরা সবাই সিজদাবনত হয়ে থাকি।…..আমীরে উন্দলুস! নিজেকে আপনি খোদা বানাবেন না।
উবাইদুল্লাহ! এসব কি বলছো? আবদুর রহমান গর্জন করে উঠলেন, তুমি কি আমাকে ফেরাউন বানাচ্ছো?
উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন এসময় কামরায় যারিয়াব ঢুকলো। প্রধান সেনাপতি উবাইদুল্লাহকে দেখে প্রথমে থমকে গেলো। তারপর দুদিকে দুই হাত প্রসারিত করে উবাইদুল্লাহর দিকে এগিয়ে গেলো।
স্বাগতম! সুস্বাগতম….বিজয়ী সেনাপতি উবাইদুল্লাহ!…..যারিয়াব একথা বলে উবাইদুল্লাহর সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হতে এগিয়ে এলো।
উবাইদুল্লাহ কোন পাত্তা দিলেন না। বসে থেকেই শুধু করমর্দন করলেন। যারিয়াব আনন্দ প্রকাশ করতে করতে বললো,
আমীরে উন্দলুস! আমরা প্রধান সেনাপতির ফিরে আসাতে আনন্দোৎসব করবো। আমার পুরো নর্তকী দল এমন সেরা নাচ নাচবে যা আকাশের নক্ষত্ররাজিকেও নাচিয়ে তুলবে। আমি এমন গান শোনাবো যা আজ পর্যন্ত আপনাকেও শোনাইনি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ যারিয়াব! যেন ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন আবদুর রহমান, আমার এই সিংহ, এই উবাইদুল্লাহ ভাই, এতই ক্লান্ত যে, ওর মন মেজায বড় চটে আছে।
কিসের উৎসব করবে যারিয়াব! উবাইদুল্লাহ তীর্যক কণ্ঠে বললেন, সে সব শহীদদের শাহাদাত বরণের জন্য উৎসব করবে যাদের ব্যাপারে এখানে দরবারের কারো এটাও জানা নেই যে, ওরা কেন ওদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে?
এ সময় কামরায় ঢুকলো সুলতানা। সেও যারিয়াবের মতো উবাইদুল্লাহকে দেখে আনন্দে ফেটে পড়ার অভিনয় করে উৎসবের কথা বললো। তারপর আবদুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে পড়লো।
উবাইদুল্লাহ লক্ষ্য করলেন, তার কথায় আবদুর রহমানের চেহারায় যে থমথমে ভাব ফুটে উঠেছিলো, রাগে প্রায় লালচে দেখাচ্ছিলো। সুলতানার স্পর্শে সে চেহারা অন্যরকম হয়ে উঠলো।
উবাইদুল্লাহর যেন শরীরে আগুন লেগে গেছে। কিন্তু তিনি নিজের রাগকে বড় কষ্টে চেপে রাখলেন।
আমীরে উন্দলুস! তিনি বড় নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে বললেন, লড়াইয়ের ময়দানে আত্মবিসর্জনকীদের উৎসব করার আগে আমি আপনার সঙ্গে একা একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।
উবাইদুল্লাহ সুক্ষ্মদর্শী লোক। তিনি যারিয়াব ও সুলতানার এই কুট চালের ধরণ বুঝে ফেললেন। তাকে ওযীর আবদুল করীম ও আবদুর রউফ আগেই বলে দিয়েছেন। এরা দুজন আমীরে উন্দলুসকে একা থাকতে দেয় না। কোন সালার বা কোন উচ্চপদস্থ হাকিম তার সঙ্গে কথা বলতে এলে এরা লেজ তুলে ঠিকই সেখানে পৌঁছে যায়। আর আমীরে উন্দলুসের কান বন্ধ করে রাখে।
