সারা দেশে প্রথমে আমাদেরকে গুপ্তচর বৃত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সংবাদ পৌঁছানোর মাধ্যমটা যেন খুব দ্রুততর হয়। দ্বিতীয়তঃ সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে হবে। গ্রাম্য এলাকাতেও সেনা চৌকি বসাতে হবে। কারণ, উন্দলুসকে আমি অনেক বড় শংকার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
উবাইদুল্লাহ! হাজিব আবদুল করীম কাষ্ঠ হাসি হেসে বললেন, এখানে তুমি আরো অনেক কিছুই দেখবে। তুমি সীমান্ত অভিযানে চলে যাওয়ার পর এখানে ঈসা মাসীহের আত্মপ্রকাশের নাটকও খেলা হয়েছে। আবদুল করীম সেই গির্জার পুরো ঘটনা ও এর বিরুদ্ধে তাদের নেয়া পদক্ষেপের কথা শুনিয়ে বললেন,
আমাদের শাহে উন্দলুস ভয়ংকর সেই অপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছেন এবং শহীদদের লাশগুলো পর্যন্ত প্রথমে দেখতে চাননি। তার এই নির্বিকার ভাব দেখে আমরা ভীষণ হারান হয়েছি।
তোমরা কি তাকে এভাবেই ছেড়ে দিলে?
না ভাই! আমি ও আবদুর রউফ তাকে শাহী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অনেক কিছুই বলেছি। তাকে লজ্জা দিয়েছি। অতি ক্ষুব্ধ অবস্থায় তার ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। ওযীর বললেন।
যারিয়াব ও সুলতানা তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। এখন তিনি ওদের মাথা দিয়েই চিন্তা ভাবনা করেন। সালার আবদুর রউফ বললেন।
দরবারে তো তোষামোদকারী চামচা ও তোষামোদে উপদেষ্টাদের শাসন চলছে। অন্ধের মতো নজরানা আর বখশিষ দেয়া হচ্ছে। সালার মুসা ইবনে মুসা বললেন।
এর একটাই প্রতিকার। সালার ফারতুন বললেন, এ লোকগুলোর কাউকেই বেঁচে থাকতে দেয়া হবে না। না হয় উন্দলুস থেকে আমাদের সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যেতে হবে।
না। সালার উবাইদুল্লাহ বললেন, রক্তপাত ও সিংহাসন কেড়ে নেয়ার পরিণাম সাধারণত ভালো হয় না। এতে গৃহযুদ্ধেরও সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দুশমন তো এর আগুনে তেল-ঘি ঢালতে থাকবে।……
পুরো জাতিই এতে লড়াই করে নিজেদের বৃথা রক্ত ঝরিয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়বে। আর দুশমন বড় আরামে আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়বে। তখন আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবো। আমরা যদি আমীরে উন্দলুসকে হত্যা করি তাহলে রেওয়াজ দাঁড়িয়ে যাবে হত্যা করো আর রাজত্ব করো।
কিন্তু এর তো কোন প্রতিকার ভেবে চিন্তে বের করতেই হবে। সালার ফারতুন বললেন, ওদের কাউকে জীবিত রাখা যাবে না। আর না হয় উন্দলুস থেকে আমাদেরকেও জীবিত পালাতে দেবে না খ্রিষ্টানরা।
না এতে তো কোন প্রতিকার হবে না এটা আগেই বলেছি। উবাইদুল্লাহ বললেন, তবে একমাত্র প্রতিকার আমার মনে যা আসছে তা হলো আমীরে উন্দলুসকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি গতানুগতিক কোন শাসক হওয়ার কথা ছিলো না। তার দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার ব্যাপারে আপনারা সবাই জানেন।
তার পিতার শাসনামলে সালতানাতের শাসনভার তার হাতেই এক প্রকার নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তিনি নিজে লড়াইও করেছেন এবং সেনাদলকে লড়িয়েছেনও। আমি তো বলবো, উন্দলুসে এর চেয়ে যোগ্য কোন শাসক আর পাওয়া যাবে না।
আমরা আর কত দিন এর অপেক্ষায় থাকবো? হাজিব আবদুল করীম বললেন, আমরা কিন্তু আবদুর রহমানের মানসিকতায় নিজেদেরকে নিয়ে যেতে পারবো না। আমাদের ঈমান ও স্বাধীনতার অপ্রতিরোধ্য চেতনা জিবন্ত রাখতে হবে। আমীর কেন খলীফাও যদি বিপথগামী হয়ে যায় তাহলে ইসলাম তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনুমতি দেয়। তাকে বাধা দিতে বলে। আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু করতে হবে। আবদুর রহমানের সন্তুষ্টি নয়।
আমি সকালে তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাচ্ছি। উবাইদুল্লাহ বললেন, আমি ঐ ছদ্মবেশী ইমাম ও তার সঙ্গের মেয়েদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাবো। আমার কথা শুনে তিনি যদি আমার আবেগকে ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করেন তখন আমি আপনাদের সঙ্গে আলাপ করে কোন উপায় বের করবো।…..
ফ্রান্সের দিক থেকে আমি বেশ শংকিত। ফ্রান্স আমাদের ওপর হামলার করার আগে আমরা যেন ফ্রান্সের ওপর হামলা চালাতে পারি আমীরে উন্দলুসকে এ ব্যাপারে রাজি করতে চেষ্টা করবো।
আপনারা সবাই সালার। আপনারা জানেন, দুশমন আপনাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হয়ে উঠছে। এজন্যই ওদের ওপর এখনই হামলা করে দিতে হবে। প্রস্তুত অবস্থায় ওদেরকে পাকড়াও করতে হবে। বড় শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের উন্দলুসকে বাঁচাতে হবে আমাদের। ইসলামের দুর্গকে আমাদের অজেয় রাখতে হবে।
***
প্রধান সেনাপতি উবাইদুল্লাহ আবদুর রহমানের সাক্ষাত কামরায় বসে তাকে তার অভিযানের কথা শোনাচ্ছেন। এসব কথা ও ঘটনা সালারদেরকেও একবার। শুনিয়েছেন। গির্জায় আগুন লাগার ঘটনার পর আরো কয়েক মাস কেটে গেছে।
আমীরে উন্দলুস! উবাইদুল্লাহ বললেন, গির্জাগুলোয় তো হুকুমতে উন্দলুসের বিরুদ্ধে বক্তৃতা চলে, মসজিদেগুলোতেও এ বিষ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি এক খ্রিষ্টান ও দুটি মেয়েকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছি। এ লোক অনেক দিন ধরে এক মসজিদে ইমামতি করছিলো। আমার দুই কমান্ডার এই খিষ্টান ইমামকে মসজিদে গিয়ে ওয়াজ করতে দেখে। তারা এসে আমাকে বিস্তারিত জানায়।…..
ছদ্মবেশে আমরা সে মসজিদে গেলাম। সে লোকদেরকে প্রতিদিন সবক দেয়। আমি শুনলাম তার সবক। সে পবিত্র কুরআনের বিকৃত তাফসরি করে কুরআনের অবমাননা করছিলো। তারপর সে মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করছিলো। তার বাড়িতে তল্লাশি চালালাম। বাড়ির এক কামরা থেকে ক্রুশ, ইঞ্জীল, হযরত ঈসা ও মরিয়ম (আ) এর মূর্তি উদ্ধার করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে এই মেয়ে দুটিকেও পাওয়া গেলো।….. ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই ওরা জানালো, ওরা খ্রিষ্টান ও ইসলামকে বিকৃত করে প্রচার করছে।
