আমার প্রস্তাব কি আপনার পছন্দ হয়নি? ইমাম উবাইদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো। এখন তার সুরে অনুনয় নয়, চ্যালেঞ্জ ফুটে উঠলো। যেন ধমক দিচ্ছে।
চুপ বদমায়িশ! উবাইদুল্লাহ ধমকে উঠলেন, এখন আমি তোমাকে তোমার প্রাণ বাঁচানোর প্রস্তাব পেশ করছি। সত্য বলবে তো বেঁচে থাকতে পারবে।
সত্য শুনবে? ইমাম নির্ভয়ে বললো, তোমাদের এই সাধের ইসলামী সালতানাতের পতন শুরু হয়ে গেছে। আমরা আমাদের মেয়েদের যৌবনকে ব্যবহার করি বলে আমাদেরকে তোমরা কাপুরুষ বলবে। যা ইচ্ছা তা বলে নাও। কিন্তু আমরা একে কাপুরুষতা মনে করি না।…..
এই মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখো, ওরা খুশি মনে আমাদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। ওদেরকে কেউ বাধ্য করেনি। বরং ওরাই ওদেরকে নিতে আমাদেরকে বাধ্য করেছে। আমরা আমাদের খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিচ্ছি। আমরা এদেশ থেকে মুসলান ও ইসলামকে বের করবোই। আমরা না পারলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অবশ্যই সফল হবে।…..
আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যে ভয়ংকর ঝড় সৃষ্টি করেছি তার মরণ-ছোবল থেকে তোমরা তোমাদের সালতানাতকে বাঁচাতে পারবে না। আমরা তো তোমাদের ওপর অস্ত্র নিয়ে হামলা করতে পারবো না। তাই তোমাদের ধর্ম বিশ্বাসকে আমরা পাল্টে দিচ্ছি। পাল্টে দিচ্ছি তোমাদের চিন্তাধারাও।
তোমাদের এই দলে কারা কারা আছে এটা কি বলবে না?
না সে জবাব দিলো, আমাদের দলে কে বা কারা আছে এটা জেনে কি করবে তোমরা? নিজেদের দলের দিকে মনোযোগ দাও আগে। তোমাদের অনেক মসজিদে মসজিদে ইমামরা লোকদেরকে বিকৃত তাফসীর শোনাচ্ছে। ঐ বেচারাদের জানা নেই, ওরা যে শিক্ষকদের কাছে পড়েছে তারা মুসলমান নয়, খিষ্টান ছিলো।…..
এখন তোমরা মসজিদগুলোতে বিকৃত তাফসীরই শুনবে। কিছু ইহুদীও আলেম ও ইমামের বেশে তোমাদের ধর্মকে বিকৃত করছে। আর বাকিটা আমার মতো ইমামরা পূর্ণ করছে।…..।
তোমাকে এত কিছু বলে দিচ্ছি কারণ, তুমি একজন সালার। তোমার জীবন তো লড়াইয়ে লড়াইয়ে কেটেছে। তোমরা নিশ্চয় কুরআন তেলাওয়াত করো। কিন্তু নিজেদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তোমরা বুঝেইনি। আমি সেটা বুঝেছি। পবিত্র কুরআন এক পরিপূর্ণ জীবনবিধান গ্রন্থ।…..
মুসলমানরা যদি পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা নিয়ে চলতো তাহলে উন্দলুসের সালতানাত এই ইউরোপীয় সমুদ্র থেকে সমুদ্রের ওপার পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করতো যেখানে সূর্য অস্ত যায়।…..
কিন্তু এই ইসলামী সালতানাত আজ উন্দলুসেই ভুমিশুন্য হয়ে পড়ছে। এটা ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের কৃতিত্ব যে, তারা কুরআনকে জাদু ও তাবীজের এক সূত্র হেসাবে সমাজে প্রচার করে দিয়েছে। তারপর এতে বিভিন্ন বিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি করে এক একটি আয়াতের একাধিক তাফসীর প্রচার করে দিয়েছে।
সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ নীরবে সব শুনে গেলেন। এখন আর তাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। এরা আদাজল খেয়ে ধর্মের বিকৃতি সাধনে নেমেছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসী এরা।
উবাইদুল্লাহ মেয়ে দুটিকে তার এক সহকারীর কাছে হাওলা করে দিলেন তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। তিনি নিজেও সেই ভূয়া ইমামের কাছ থেকে আরো কিছু জানার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার কাছ থেকে আর বিশেষ কিছুই জানা গেলো না।
রাতের শেষ প্রহরে ছাউনি তুলে কর্ডোভার দিকে কোচ করার হুকুম দিলেন উবাইদুল্লাহ। নকল ইমাম ও দুই মেয়েও সৈন্যদের হেফাজতে দলের সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা দিলো।
***
উবাইদুল্লাহ ইবনে উবাইদুল্লাহ পর দিন রাতে কর্ডোভায় প্রবেশ করলেন। কয়েদীদেরকে এই হুকুম দিয়ে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দিলেন যে, আগামীকাল যেন তার সামনে এদেরকে হাজির করা হয়।
কর্ডোভায় ঢোকার মুখে ওযীর হাজিব আবদুল করীম, সালার আবদুর রউফ, সালার মুসা ইবনে মুসা ও সালার ফারতুন শহরের প্রধান ফটকের বাইরে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমীরে উন্দসই এভাবে স্বাগত জানানোর কথা বলে দিয়েছিলেন।
উবাইদুল্লাহ বেশ ক্লান্ত ছিলেন। তবুও ওহীর ও সালারদের সঙ্গে নিয়ে গেলেন তার হাবেলিতে। পথে যা যা ঘটেছে সবকিছু তাদেরকে সংক্ষেপে শোনালেন। তাকে কিভাবে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো এবং প্রায় অলৌকিকভাবে কি করে তিনি বেঁচে গিয়েছেন তাও জানালেন সবাইকে। কয়েদীদের ব্যাপারেও আলোচনা করলেন।
তবে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেছে, খ্রিষ্টানরা ময়দানের লড়াইয়ে যেতে চায় না। উবাইদুল্লাহ বললেন, ওরা মাটির নিচ থেকে আমাদের ওপর আঘাত হানতে চাচ্ছে। ফিরতি পথে আমি বহু জায়গায় তাঁবু ফেলি। আর গোয়েন্দা, গুপ্তচর ও টহল সেনা ইউনিট দ্বারা আশপাশ ও দূরদুরান্ত এলাকার অবস্থা জরিপ করি।…..
আমি যেসব খবরাখবর পাই এতে আমি নিশ্চিত, আমাদের ভেতর থেকেই কোন বড় ধরনের ফেতনা ফাসাদ লালিত পালিত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার লড়াই থেকে যে কয়েদী ধরে এনেছি এদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনাসদস্যও আছে। ওদের থেকে কিছু গোপন তথ্য উদ্ধার করেছি। ওরা বলেছে, ফ্রান্সের বাদশাহ লুই উন্দলুসের বিদোহের পেছনে হাওয়া দিচ্ছেন। তার ফৌজ এখানকার খ্রিষ্টানদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে।…..
আমি তিন তিনবার ইউগেলিস ও ইলওয়ার নামের দুজন লোকের কথা শুনেছি। জানা গেছে, এরা কট্টর খ্রিষ্টান। খ্রিষ্টধর্মের বড় পণ্ডিত এবং অসম্ভব মেধার অধিকারী। এরা দুজন এখানকার সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে বেশি তৎপর।…..
