***
৪. উন্দলুসের বাদশাহ
উন্দলুসের বাদশাহ যিনি উন্দলুসকে ইসলামী সালতানাত বলেন এবং আপনাদেরকে ইসলামের শিক্ষা দেন তিনি বড় বড় পাপের মধ্যে ডুবে আছেন। ইমাম বললো, তিনি মদ পান করেন, সুন্দরী মেয়েদেরকে উলঙ্গ করে নাচান এবং সবার সামনেই অশ্লীল কর্ম করেন।……
মুসলমান কারো গোলাম নয়। আপনাদের কাছ থেকে যে ভূমিকর, আয়করসহ আরো নাম না জানা কত ধরনের খাজনা আদায় করা হয় এসবের পয়সা আপনাদের বাদশাহর ভোগে বিলাসে খরচ হয়।
এভাবে ইমাম দেশের বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা বলে লোকদের মধ্যে ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দিতে লাগলো। প্রমাণের স্থলে কিছু কুরআনের আয়াত ও বানোয়াট হাদীসের উদ্ধৃতি দিলো।
তার পাঠদান শেষ হলো। মুসল্লীরা একে একে চলে গেলো। উবাইদুল্লাহ। উঠলেন না, বসে রইলেন। তার সঙ্গে দুজন কমান্ডার ছিলো। তারাও বসে রইলো।
আপনারা কেন বসে আছেন? ইমাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলো। আপনার পাঠদানে এতই মুগ্ধ হয়েছি যে, আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। উবাইদুল্লাহ বললেন।
অবশ্যই, অবশ্যই, ইমাম বললো এবং জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কোত্থেকে এসেছো? আগে তো তোমাদেরকে আর দেখিনি।
আমরা মুসাফির। কর্ডোভা যাচ্ছি। উবাইদুল্লাহ বললেন, আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, উন্দলুসের বর্তমান এই পাপিষ্ঠ বাদশাহর বিরুদ্ধে আমরা কী করতে পারি? আপনি বলেছেন, বাদশাহ অপকর্ম করে যাচ্ছেন। আর আমাদের পেট কেটে পয়সা নিয়ে ভোগবিলাসে মজে আছেন।
আমার কাছে তো মনে হয় এ ধরনের বাদশাহকে সিংহাসন থেকে গলাধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেয়াই সবচেয়ে বড় জিহাদ। যাতে খোদার নিরপরাধ বান্দারা তার জুলুম অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়। এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
তোমরা কি আরেকদিন আসতে পারবে? ইমাম বললো, তখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবো। আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে।
ইমাম উঠে দাঁড়ালো এবং মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলো। উবাইদুল্লাহ ও তার কমান্ডাররাও তার পিছু নিলেন। ইমাম যে গলিতে ঢুকতো তারাও তার পিছু পিছু সে গলিতে ঢুকতেন। একবার ইমাম দাঁড়িয়ে পড়লো।
তোমরা আমার পিছু পিছু আসছো কেন? ইমাম জিজ্ঞেস করলো ভঁ কুচকে।
আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা চলতে চাই। উবাইদুল্লাহ সরল গলায় বললেন।
ইমাম কিছু না বলে আবার হাঁটা দিলো। উবাইদুল্লাহরাও তার পিছু নিলেন। হাঁটতে হাঁটতে ইমাম একসময় জনবসতি থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং খোলা তেপান্তরে গিয়ে উঠলেন। উবাইদুল্লাহ তার পথরোধ করে দাঁড়ালেন।
ইমাম সাহেব! আপনি কোথায় থাকেন? উবাইদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন।
আমি এই বসতিতেই থাকি। কিন্তু আমি তো বলেছি একটু বাইরে যাচ্ছি। এক কাজে। ইমাম একটু উষ্ণ গলায় বললো।
চলুন। এক সঙ্গে আমরাও যাই। অসুবিধা তো আর নেই কিছু। উবাইদুল্লাহ বললেন।
ইমাম কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে তাদেরকে এড়িয়ে যেতে চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে উবাইদুল্লাহর চোখের ইংগিতে দুই কমান্ডার খঞ্জর বের করে ফেললো। দুই খ রের ফলা তার দুই পাঁজরে গিয়ে ঠেকলো।
আমাদেরকে তোমার ঘরে নিয়ে চলো। উবাইদুল্লাহ বললেন, চালাকি করতে চেষ্টা করবে না। আমার সঙ্গে ফৌজ আছে। বসতির প্রতিটি ঘরে তল্লাসি চালানো হবে। আর বিশৃংখলার সৃষ্টি করলে তোমার দুপা ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়া হবে।
রহস্যজনক ইমাম বসতির এক পাশে একেবারে জনবিচ্ছিন্ন একটি বাড়িতে থাকতো। পরে জানা যায় সে বাড়িতে অন্য কারো প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। কারণ বলা হতো, ইমাম সাহেবের কাছে কিছু অশরীরী আত্মা ও জ্বিন পড়তে আসে।
ইমাম উবাইদুল্লাহ ও তার দুই কমান্ডারকে তার সেই বাড়িতে নিয়ে গেলো। বাড়িতে প্রথমেই দুটি অতি সুন্দরী মেয়ে দেখা গেলো। বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পর দেখা গেলো, একটি কামরাকে রীতি মতো গির্জা বানিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে ক্রুশ, কুমারী মরিয়াম (আ) ও ঈসা মাসীহের প্রতিমূর্তিও আছে। গির্জাকে যেমন উপাসনার জন্য সাজানো হয় সে কামরাটিকেও খুব যত্ন করে সাজানো হয়েছে।
উবাইদুল্লাহর জিজ্ঞাসাবাদ থেকে জানা গেলো, ইমাম ছয় সাত মাস ধরে মসজিদে ওয়াজ-নসীহতের নামে এভাবে মানুষকে বিকৃত শিক্ষা দিচ্ছে।
কমান্ডাররা সবকিছু উঠিয়ে নিলো। তারপর মেয়ে দুটি ও ইমামকে গ্রেফতার করে ওরা বসতি থেকে বেরিয়ে গেলো। পথ চলতে চলতে ইমাম উবাইদুল্লাহকে লোভাতুর প্রস্তাব দিয়ে বললো,
আপনারা মেয়ে দুজনকে নিয়ে নিন। যত টাকা চাইবেন আগামীকালকে পরিশোধ করে দেয়া হবে। চাইলে আপনাদের তিনজনকে এর চেয়ে অনেক সুন্দরী মেয়ে চিরদিনের জন্য দিয়ে দেয়া হবে।
অন্ধকার রাস্তায় মেয়ে দুটি উবাইদুল্লাহ ও দুই মান্ডারের গায়ে ঘেঁষে ঘেঁষে পথ চলছিলো। নিজেদেরকে অর্ধ উলঙ্গ করে সবরকম জাদু চালানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু উবাইদুল্লাহ পাথর হয়ে রইলেন। সঙ্গে দুই কমান্ডারও। তারা কোন কথাই বললো না পথে।
অবশেষে তারা তাদের তাঁবুর শিবিরে পৌঁছে গেলো।
উবাইদুল্লাহ তাদেরকে নিজের তাঁবুতে নিয়ে গেলেন।
তোমরা দুজন ভালো করে শুনে রাখো, উবাইদুল্লাহ মেয়ে দুজনকে বললেন, তোমরা এক সেনা তাঁবুতে আছো। তোমাদেরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করা হবে। যদি তোমরা মিথ্যা বলো তাহলে সৈনিকদের কাছে তোমাদেরকে ছুঁড়ে দেয়া হবে। এরা সবাই হিংস্র-ক্ষুধার্ত। যে চরম যন্ত্রণা ভোগ করবে সেটা কল্পনা করে দেখো। কখনো তা সহ্য করতে পারবে না। বাঁচতেও পারবে না এবং মরবেও না।
