মুহাম্মদ কাজ শেসে করে মারীদা ফিরে এলেন। সেই মুহাফিজ এক ছুতোয় তার সালারের সঙ্গে সাক্ষাত করলো। মুহাম্মদ মারীদার বাইরে গিয়ে যা করেন তার বিস্তারিত কর্মকাণ্ড তাকে জানালো।
সেনাবাহিনীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের মধ্যে আগ থেকেই আলোচনা চলছিলো যে, মারীদার অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।
এর পরের বার মুহাম্মদের সেই মফস্বলের খাস মহলে অভিযান চালানো হলো। তাকে গ্রেফতার না করা হলেও তার পদ থেকে তাকে পদচ্যুত করা হলো। তারপর আরেক নতুন হাকিম নিয়োগ করা হলো।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার লুটেরাদের দলে চলে গেলেন। লুটেরাদের দলটি এখন সেনা ইউনিটের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দলে এখন কয়েকজন সরদার আছে।
তাদেরকে ডেকে মুহাম্মদ বললেন, পুরো এলাকায় হুকুমের মতো করে এ ঘোষণা দিয়ে দাও, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার এখন থেকে মারীদার পরিবর্তে এখানে থাকবেন। কর ইত্যাদির অফিসও এখানে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং সেগুলো এখানে এসে আদায় করতে হবে।
ইউগেলিসের সঙ্গে তখনই তার সাক্ষাত হয়।
আপনার এটা জেনে রাখা উচিত, ইউগেলিস মুহাম্মদকে বললো, আপনার এখন কোন মূল্যই নেই। আপনাকে যে কোন সময় কতল করা যাবে। কিন্তু আমি চাই, আপনাকে আবার মারীদার আমীর বানাতে। আর মারীদা স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রদেশ বনে যাক।…..
আপনাকে নও মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা সাহায্য করবে। এরা আপনার ফৌজ হবে। কিন্তু আপনি যদি পূর্বের সেই সরকারি অবস্থান বা পদ বহাল করার জন্য এবং পদমর্যাদা বাগিয়ে নেয়ার জন্য আমাদেরকে ধোকা দেন তাহলে কল্পনাও করতে পারবেন না, আপনার পরিণাম কী হবে।
ইউনেলিসের পরামর্শ মতো মুহাম্মদ সবকিছু করবেন এটাই চুক্তি হলো। আর তারা মুহাম্মদকে বাদশাহ বানিয়ে রাখবে। ইউগেলিস চাচ্ছিল, বিদ্রোহের নেতৃত্ব কোন মুসলমানের হাতে থাকবে। সেই মুসলিম নেতা তারা পেয়ে গেলো।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের এই দ্বিচারী চরিত্রের কথা জানতে পেরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার প্রতি নিন্দাবাদ জানালো এবং এই ঘৃণিত নাম তাদের মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলো। এক সময় প্রায় ভুলেও গেলো।
মারীদা থেকে নির্বাসিত হওয়ার প্রায় পাঁচ ছয় মাস কেটে গেলো। তবে যে এলাকায় মুহাম্মদ গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সে এলাকার ব্যাপারে প্রায় সময়ই খবরাখবর আসতে রাগলো, ওখানে লুটেরারা তাদের রাজত্ব কায়েম করেছে। কিন্তু এরা কারা জানা ছিলো না। ওদের বাদশাহ বনে যান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার।
নয়া হাকিমের নিয়োগ করা নতুন করপাল এবং কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও আরো দশ বারজন মুহাফিজ নিয়ে হাকিম মারীদা থেকে বের হন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন এলাকার রাজস্ব আদায়ে তদারকি। তারা মারীদা থেকে কয়েক মাইল দূরের এক পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছলো। একটি মোড় ঘোরার সময় ডান ও বাম দিকে থেকে প্রান্তর বেয়ে এমন তীর বৃষ্টি শুরু হলো যে, একজনও বাঁচতে পারলো না।
তীর খেয়ে যারা ঘোড়া উল্টো দিকে ছুটালো তাদের কেউ বেশি দূর যেতে পারলো না। তাদের লাশগুলো গভীর এক গর্তে ফেলে মাটি ও পাথর দিয়ে চাপা দেয়া হলো।
ট্যাক্স ইত্যাদি উসুল করলো মুহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বারের লোকজন। মুহাম্মদ সব ধরনের রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দিলেন। এজন্য তিনি লোকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তারপর তিনি তার ঠিকানা বদলে ফেললেন। কেউ জানতেও পারলো না তার নয়া ঠিকানা কোথায়।
এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তার আস্তানা গড়ে তোলা হয়। সেখানে ইউগেলিসেরও যাতায়াত করতে বেশ সুবিধা।
যেদিন নয়া হাকিমের দলটিকে অতর্কিত হামলায় মেরে ফেললো মুহাম্মদের লোকেরা সেদিনই সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ তার সেনাদল নিয়ে কর্ডোভার পথের শেষ মনযিল অতিক্রম করছিলেন। এ সফরে এটাই তার শেষ বিশ্রাম।
যেখানে তাঁবু ফেলা হলো এর সামান্য দূরে কিছু জনবসতি গড়ে উঠেছে। উবাইদুল্লাহ ফিরতি পথের চারপাশের অবস্থা জরিপ করতে করতে আসছিলেন।
একবার তার ওপর আত্মঘাতি হামলাও হয়। এখানে তাঁবু ফেলার পর তার লোকজন আশপাশের এলাকায় গোয়েন্দা অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। ওরা সাধারণত স্থানীয় গ্রামীন লোকদের পোষাক পড়ে যেতো।
একেবারে কাছের জনবসতিতে যে লোকটি গেলো সে ফিরে এসে উবাইদুল্লাহকে জানালো, ঐ জনবসতিতে একটি মসজিদ আছে। মসজিদের ইমাম লোকদেরকে বেশ রহস্যজনক কায়দায় ওয়াজ-নসীহত করে।
উবাইদুল্লাহ এশার নামাযের সময় ছদ্মবেশে সেই মসজিদে গিয়ে হাজির হলেন। নামাযের পর লোকজন ঘরে না গিয়ে সেখানেই বসে রইলো। জানা গেলো, নামাযের পর ইমাম সবাইকে পাঠদান করে। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে ইমাম শিক্ষা দেয়।
আজ আমি আপনাদেরকে বলবো জিহাদ কী? লোকদের দিকে ফিরে ইমাম পাঠদান শুরু করলো,
মুসলমানদের বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, নিজেদের শেষ পরিণতির জন্য কিছু করে যাওয়া। যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করা হোক বা মসজিদে ইবাদত করা হোক উভয়টার সওয়াব সমান। পরকালে এর পরিণামও একই হবে। তাহলে কেন নিজেদের ও অন্যদের বাচ্চাদের এতীম ও নারীদের বিধবা করা হবে? নামাযও একটি জিহাদ। যুদ্ধের ময়দান থেকে মসজিদই উত্তম।
ইমাম দুএকটি আয়াত পড়লো, কয়েকটি ভিত্তিহীন হাদীস শোনালো। কথায় কথায় বললো, রাসূরে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনে কয়েকবার তো এমন হয়েছে যে, তিনি লড়াই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। একাধারে কয়েকদিন ও কয়েক রাত অনবরত নফল পড়েছেন।
