ওদের দুজনকে ভিন্ন কামরায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। তাদেরকে বলা হলো, তারা চাইলে কামরার দরজা ভালো করে বন্ধ করে রাখতে পারে। তবে ইবনে আবদুল জব্বার এমন সুন্দরী খুব কমই দেখেছেন।
তবুও তিনি নিজেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখলেন।
রাতের দুই প্রহর কেটে গেছে। ইবনে আবদুল জব্বার গভীর ঘুমে অচেতন। কামরায় টিম তালে একটি বাতি জ্বলছে। তার চোখ খুলে গেলো। তাকে কেউ মৃদুভাবে ঝাঁকাচ্ছে। তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তার ঘুম এভাবে মধ্য রাতে ভাঙ্গাতে পারে এত বড় দুঃসাহস কার?
তিনি হড়বড় করে উঠলেন এবং দ্রুত খঞ্জর বের করে ফেললেন। তবে ঘরের অস্পষ্ট আলোয় তার খাটে একটি নারী মূর্তি দেখে তিনি স্থির হয়ে গেলেন।
কেন এসেছো এখানে? কি চাও?
আপনার অনুগ্রহের সামান্য প্রতিদান দিতে? মেয়েটি মায়াবী গলায় বললো আমাকে যদি আপনার উপযুক্ত মনে না করেন তাহলে বলুন কিভাবে আপনার ঋণ আমি শোধ করবো?
মেয়েটি তার পাশে খাটে বসে পড়লো।
আমি কোন অনুগ্রহ করিনি মেয়ে! ইবনে আবদুল জব্বার বললেন, আমাকে প্রতিদান না দিয়ে বরং পেরেশান করছে। আমাকে মন্দ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছো তুমি।
মেয়েটি তার একটি হাত নিজের হাতে নিয়ে চোখে চোয়ালো। তারপর হাতে চুমু খেলো। এরপর দুহাত তুলে নিজের বুকের ওপর রাখলো। ইবনে আবদুল জব্বারের যৌবনকাল এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও যৌবনের যে উত্তাপ ছিলে সেটা তো এখন আর নেই। কিন্তু মেয়েটি তার সেই ক্ষয়ে যাওয়া যৌবনে যেন নতুন করে পানি ঢাললো।
নির্জন রাত, উদ্ভিন্ন যৌবনা অপরূপা একটি মেয়ে। মেয়েটির তীব্র কামনার মায়াবী জাল এসব কিছুই মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের বিবেকবোধ থেকে পরিণতির চিন্তা দুর করে দিলো।
রাত শেষে যখন ভোরের আলো ফুটলো ইবনে আবদুল জব্বারের সামন এক নতুন দুনিয়া উন্মোচিত হলো। তার এত দিনের অভ্যস্ত জীবনে যে দুনিয়ার অস্তিত্ব ছিলো, নিষ্ঠা ও চরিত্রমাধুরীময় যে জীবন পদ্ধতি ছিলো সে দুনিয়া তার পাল্টে গেলো। আজ তার দুনিয়ার সবকিছুই অপরূপ মনে হতে লাগলো।
যেখানে দুতিন দিন থাকার কথা ছিলো সেখানে তিনি দশ বার দিন রইলেন। তার তো মারীদায় ফিরে যেতেই হতো। কিন্তু মেয়েদেরকে নিয়ে যেতে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন। মেয়ে দুটিকে সেখানেই রাখার বন্দোবস্ত করলেন। লুটেরা নেতাকে ডেকে বললেন, ওদেরকে যেন খুব যত্ন ও সম্মানের সঙ্গে রাখা হয়। তিনি সময় পেলেই এখানে আসবেন।
লুটেরা প্রধান ওদের জন্য দুজন লোক রেখে দিলো।
মনে হচ্ছে তোমরা বেশ সফলই হয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার চলে যাওয়ার পর লুটেরা প্রধান মেয়েদের কাছে গিয়ে বললো।
তুমি তো বলতে এ লোক পাথরের চেয়ে কঠিন। কিন্তু একে মোমের মতো গলাতে বেশি সময় লাগেনি। এক মেয়ে বললো।
মুহম্মদের সামনে মাত্র পাপের একটি দরজা খুলেছিলো। তারপর একের পর এক দরজা খুলতেই লাগলো। যে কোন পাপের পথে একটি বিবেকের বাধা এসে দাঁড়ায়। পূণ্যবানদের জন্য তো সে বাঁধা একটি পাহাড়ের মতো এসে দাঁড়ায়। কিন্তু মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতা সেই পাহাড়কে পলকের মধ্যে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়।
যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার সালতানাতে উন্দলুসের রাজস্বকর থেকে একটি পয়সাও এদিক ওদিক করতে রাজি ছিলেন না, সেই তিনিই খ্রিষ্টীয় চক্রান্তকারীদের বড় মনোরম জালে ফেঁসে গেলেন।
তিনি এমন এক পাপের উড়না নিজের ওপর জড়িয়ে নিলেন, যা থেকে প্রতিটি পাপই জন্মগ্রহণ করে। কয়েকদিন পরপরই বিভিন্ন ছুতোয় সেই মফস্বল এলাকায় আসতে লাগলেন যেখানে মেয়ে দুটিকে রেখে গিয়েছিলেন।
একটি অতি পুরনো পলেস্তারা খসানো বাড়িতে মেয়েগুলোকে রেখেছিলেন। সেই জীর্ণ বাড়িটি ক্রমেই উজ্জল হতে হতে মহলের রূপ নিলো। একে একে মদ, নাচ-গানের উপকরণ সেখানে আসতে লাগলো।
রাজস্ব করের তহবিল দিন দিন শূন্য হতে লাগলো। ওদিকে লুটেরাদের দলও বড় হতে লাগলো। মুহাম্মদ বিশাল এক এলাকার মুকুটবিহীন সম্রাট বনে গেলেন।
***
অনেক দিন পর তিনি জানতে পারলেন তার চারপাশে যারা জড়ো হয়েছে। এবং যারা তার গোলাম হয়ে আছে এরা সব খ্রিষ্টান। এদের মধ্যে যারা মুসলমান তারা সব নও মুসলিম। যারা প্রকাশ্যে মুসলমান হলেও ভেতর ভেতর খ্রিষ্টান।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার যেখানেই যেতেন তার সঙ্গে একটি মুহাফিজ দল থাকতো। এরা সবাই তার নিজের বাছাই করা লোক। এদেরকে তিনি দুহাত ভরে পয়সা দিতেন এবং মদ-নারীও ভোগ করতে দিতেন।
এই মুহাফিজরা শধু তার প্রাণই নয়, তার এই রহস্যময় জীবনের কথাও হেফাজতে রাখতো।
একবার সেই দলে নতুন এক মুহাফিজ যোগ দিলো। মুহাফিজরা আসে সেনাবাহিনী থেকে। এই মুহাফিজ আসার পর তার পুরনো সঙ্গীরা তাকে শক্ত করে বলে দিলো, হাকিমের সঙ্গে মারীদার বাইরে যেখানেই যাবে সেখানে যা কিছু দেখবে তা যেন কাউকে না বলে। এর বদলে সে বিরাট বখশিষ পাবে।
হাকিম মুহাম্মদের সঙ্গে একবার সেই মুহাফিজও সেই মফস্বলে গেলো। প্রথম রাতেই সে যা দেখলো এতে তার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেলো। নর্তকী দিয়ে নাচ গান, মদপান, অশ্লীল কর্মকাণ্ড সবই তার চোখের সামনে ঘটলো।
সে কারো সঙ্গে এ ব্যাপারে ভালো মন্দ কোন মন্তব্য করলো না।
পর দিন মুহাম্মদ সেখানে রীতি মতো দরবার সাজিয়ে বসলো। অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থীই তার কাছে আসলো বিভিন্ন আর্জি নিয়ে। অধিকাংশই এ আর্জি নিয়ে এসেছে যে তাদের কাছে ট্যাক্স, খাজনা ও অন্যান্য কর দেয়ার মতো পয়সা নেই বা থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণ নেই। মুহাম্মদ যে ফয়সালা করলেন, সেটা লোকদের পক্ষে গেলেও দেশের অর্থনীতির বিরুদ্ধে হলো।
