বাস্তবে সরকারি বয়্যভার নয়, বেড়ে গিয়েছিলো শাহী মহলের ব্যয়ভার।
বিশেষ করে আবদুর রহমানের সময় তো সরকারি কোষাগার অর্ধেক খালি হয়ে যায়। যারিয়াব, সুলতানা ও আবদুর রহমানের রক্ষিতারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার খালি করতে থাকে।
আবদুর রহমান নিজেও তোষামোদকারীদের সামান্য সামান্য কথায় দুহাত ভরে বখশিষ আর নজরানা দিতে থাকেন। যারিয়াব ও সুলতানাও যাকে চাইতো তাকেই এভাবে বখশিষ দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার প্রদর্শন করতো।
রাজস্ব কর, ভূমি করের সবচেয়ে বড় বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় মারীদার লোকদের ওপর। মারীদার অবস্থান উন্দলুসের একটি প্রদেশের মর্যাদায়। সেখানকার হাকিম গভর্ণরের মর্যাদা পেতো। মারীদার হাকিম তখন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার।
বিভিন্ন খাতের কর আদায়ের জন্য যদিও সরকারিভাবে অনেক লোক নিয়োগ করা ছিলো তবুও মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারকে মারীদার বিভিন্ন শহর, উপশহর ও গ্রামে-গঞ্জে যেতে হতো। বেশ নীতিবান হাকিম হিসেবে তিনি তখন সবার কাছে পরিচিত। কর আদায়ে বেশ কঠোরতাও করতেন। লোকজন এ কারণে তাকে বেশ ভয় পেত এবং সম্মানও করতো।
সরকারি লোকজন ছাড়াও গ্রাম্য এলাকার কিছু অপরাধ জগতের লোকজনের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রাখতে হয়। যারা মারপিট, লড়াই, গুন্ডামি করে বেড়াতো। এরা তাকে কর ইত্যাদি উসুলে অনেক সাহায্য করতো। এজন্য তারা পুরস্কার বা বখশিষ প্রাপ্তির অধিকারী ছিলো। কিন্তু ইবনে আবদুল জব্বার তাদেরকে করের পয়সা থেকে কিছুই দিতেন না। এটাকে জনগণের আমানত মনে করতেন।
তবে এই দলটির প্রধান নেতা এর সমাধান বের করে ফেলে। সেটা হলো, ছিনতাই-রাহাজানি। গুন্ডা দলের প্রধান তাকে বলে, তারা মাঝে মধ্যে দুএকটা কাফেলা লুট করবে। তবে মানুষ মারবে না। একেই তারা তাদের কাজের পারিশ্রমিক মনে করবে। ধরা পড়লে যেন তাদেরকে গ্রেফতার করা না হয়।
এদের ছাড়া ইবনে আবদুল জব্বারের কাজও চলতো না। তাই তিনি একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেন যে, এর চেয়ে বেশি মালামাল লুট করা যাবে না। এবং বড় বড় বাণিজ্যিক কাফেলা ছাড়া সাধারণ কাফেলা লুট করা চলবে না।
গুন্ডা দল সেটা খুশি মনেই মেনে নেয়ার কিছুদিন পর একটি কাফেলা লুট করলো। লুট করা মাল থেকে ইবনে আবদুল জব্বারকে একটি তলোয়ার উপঢৌকন স্বরূপ দিয়ে গেলো। তলোয়ারের বাট অতি দুর্মূল্যের পাথর ও মোতি দিয়ে তৈরী। লক্ষ্য টাকার কম হবে না তলোয়ারের দাম।
এর দেড় দুই মাস পর লুটেরারা কোটি টাকা মূল্যর দুটি হীরা ইবনে আবদুল জব্বারকে দিলো। এভাবে একের পর এক কাফেলা লুট হতে লাগলো, আর ইবনে আবদুল জব্বারের উপঢৌকনের ঝুলিও ভরে উঠতে লাগলো। আর তিনিও সেগুলো বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। যদিও প্রথম প্রথম কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতেন।
কিন্তু কিছুদিন পর সেটাই স্বস্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
***
এ ধারা চলতে লাগলো। ইবনে আবদুল জব্বার লুটেরাদের নজরানা খুশি মনেই গ্রহণ করতে লাগলেন। তবে তিনি উসুলকৃত করের পয়সায় কোন দুর্নীতি করেননি।
একদিন তিনি মারীদা শহর থেকে কিছু দূরের এক মফস্বল এলাকায় রাজস্ব আদায়ের কাজের তদারকি করতে গেলেন। দুচারদিন তাকে সেখানে থাকতে হবে। রাতে লুটেরা দলের নেতা তার বাংলোতে এসে হাজির। তার সঙ্গে অতি রূপসী দুটি মেয়ে।
এটা আপনার জন্য বিশেষ নজরানা। লুটেরা নেতা বললো, এদেরকে এক বাণিজ্যিক কাফেলা থেকে আমরা পেয়েছি। এরা আপনার সেবা করবে খুশি মনে।
এ নজরানার প্রয়োজন নেই আমার। এদেরকে নিয়ে যাও। ইবনে আবদুল জব্বার বললেন।
আপনি কমপক্ষে ওদের একজনকে রাখুন। আর দুজনকে রাখতে চাইলে রাখতে পারেন। লুটেরা নেতা বললেন।
আমি লুটের মাল থেকে যে উপঢৌকন গ্রহণ করে থাকি তাও এক ধরনের পাপ। তিনি বললেন, কিন্তু এদেরকে গ্রহণ করে আমি কবীরা গুনাহ করতে পারবো না। নিয়ে যাও এদেরকে।
তখনই একটি মেয়ে তার পায়ে পড়ে গেলো। আরেকজন হেচকি তুলে কাঁদতে লাগলো।
আপনার অনেক বড় অনুগ্রহ হবে যদি আপনি আমাদেরকে গ্রহণ করেন। পায়ে পড়ে থাকা মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমাদেরকে এই হিংস্র বর্বরদের হাত থেকে বাঁচান।
মেয়েগুলো দেখলো, এই লোক বেশ চরিত্রবান। এর কাছে থাকলে এ নিশ্চয় তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেবে।
আপনি আমাদেরকে এভাবে গ্রহণ করতে না চাইলে আমরা আপনার স্ত্রী হতে প্রস্তুত। দ্বিতীয় মেয়েটি বললো, আমাদেরকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করুন।
দুজনই মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারের সামনে এমনভাবে ভেঙ্গে পড়লো আর কেঁদে কেঁদে তার কাছে অনুনয় বিনয় করতে লাগলো যে, তার মন দ্রবীভূত হয়ে গেলো।
ঠিক আছে, আমি এই উপঢৌকন গ্রহণ করছি, ইবনে আবদুল জব্বার বললেন, ওদেরকে যদি আমি ওদের মা বাবার কাছে পৌঁছে দিই তোমাদের কোন আপত্তি থাকতে পারবে না।
তাহলে আমাদেরও শর্ত আছে, আমাদেরকে যেন ধরিয়ে না দেয় মেয়ে দুজন। লুটেরা নেতা বললো।
তোমাদেরকে কেউ গ্রেফতার করবে না। তোমরা যাও। ওদের কাছে তোমরা আর এসো না। আমার কাছেই ওরা নিরাপদ থাকবে। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার বললেন।
লুটেরা নেতা চলে গেলো।
ইবনে আবদুল জব্বার মেয়েদেরকে বললেন, ওরা এখন নিরাপদ। রাতে ওদেরকে অন্য কামরায় শোয়ানো হবে। তিনি যখন নিজের কাজ থেকে অবসর হবেন তখন তাদেরকে তাদের বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
