মুসলমানদের মধ্যেও আমি এর প্রভাব দেখেছি। অনেক মুসলমানই মেনে নিয়েছে, হযরত ঈসা (আ) এর সত্যিই আত্মপ্রকাশ ঘটেছিলো। এই আগুন তারই বদদোআয় লেগেছে। দ্বিতীয় জন বললো।
এই আগুন এখন আর আমরা নিভতে দেবো না। ইউগেলিস সব কথা শুনে বললো, তোমরা কর্ডোভা ফিরে যাও। আমি মারীদা যাচ্ছি।
***
ইউগেলিস এক পাদ্রীর ঠিকানায় উঠেছিলো। পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, সে কেন মারীদা যাচ্ছে। কর্ডোভা কেন যাচ্ছে না। কারণ, বিদ্রোহের আন্দোলন তো কর্ডোভা থেকেই শুরু হয়েছ। এখন সেখান থেকেই এর তৎপরতা আরো বেগবান হওয়া উচিত।
পুরো উন্দলুস আমার চোখের সামনে রয়েছে। ইউগেলিস বললো, বর্তমানে মারীদার অবস্থা এমন হয়ে আছে যে, শুধু একটি আগুনের ফুলকি ছেড়ে দিলেই হবে। এজন্য আমার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ইলওয়ার ওখানে গিয়েছে।
সেখানে একজন মুসলিম হাকিম আছেন, যাকে আমরা বিদ্রোহের জন্য ব্যবহার করতে পারবো। আমি চেষ্টা করছি, বিদ্রোহের অপবাদ আমাদের ওপর আসতে না দিয়ে কোন মুসলমান নেতার ওপর চাপিয়ে দিতে।
এমন মুসলমান আপনি কি পাবেন যে নিজের হুকুমতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে? সে পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, আমার ভয় হয় কোন মুসলমান না আবার আপনার হিতাকাঙ্খী সেজে আপনাকে কয়েদখানা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। আপনি না থাকলে এই আন্দোলনও এখানে শেষ হয়ে যাবে। সাবধানে থাকতে হবে আপনাকে যেন কেউ তার জালে ফাঁসিয়ে ফেলতে না পারে।
নারী ও ধন সম্পদের মধ্যে এমন শক্তি আছে যে, এ শক্তি আপনি বাধ্য করতে পারবেন নিজের ইবাদতখানায় আগুন লাগিয়ে দিতে। ইউগেলিস বললো, আমি যতটা পবিত্র ইঞ্জীল বুঝেছি ততটাই কুরআন শরফি বুঝেছি। এই দুই আসমানী কিতাবেই মানুষকে খোদা তাআলা প্রবৃত্তির কামনা বাসনা থেকে বেঁচে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।……
উভয় কিতাবেই খোদা বলেছেন, যে নারীকে ভালো লাগবে তাকে বৈধ পন্থায় বিয়ে করে ফেলো। বিয়ে ছাড়া কোন নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কুরআন বলে, ব্যাভিচারকারী নারী পুরুষকে পাথর মেরে হত্যা করে দাও। ইঞ্জীলেও এ ধরনের হুকুম দেয়া হয়েছে।…..।
কেন? এমন কঠিন শাস্তি কেন নির্ধারণ করা হলো? কারণ, একজন রূপসী নারী পুরো একটি দেশ ও জাতিকে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে লক্ষ লক্ষ সৈন্যও তা করতে পারে না।…..নারীর মধ্যে রয়েছে এক তীব্র আকর্ষণ, অপ্রতিরোধ্য এক নেশা ও অদৃশ্য এক জাদু। পৃথিবী বিখ্যাত বীর যোদ্ধাকেও রাজ সিংহাসন থেকে নামিয়ে পথের ফকির বানিয়ে দিয়েছে এই নারীই।…..
তবে এর চেয়েও ভয়ংকর নেশার জিনিস হলো ধন-সম্পদ, খ্যাতি ও ক্ষমতার। যে কাউকে ক্ষমতার লোভ দেখাবে সে তার সুন্দরী মেয়েদেরকেও নিলামে তুলতে দ্বিধা বোধ করবে না। সে মিথ্যা বলবে। নিজের ধর্ম এমনকি খোদাকেও সে থোকা দিতে চেষ্টা করবে।
একদিকে সে ধনভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেবে। অন্যদিকে কয়েদখানার দরজা খুলে দেবে। কাউকে নজরানা আর বখশিষ দিয়ে বিত্তশালী বানিয়ে তার অনুগত করে নেবে। আবার কাউকে কয়েদখানায় ছুঁড়ে মেরে নিজের ক্ষমতা ও সিংহাসন অক্ষত রাখবে।
তারপরও আমার আশংকা হচ্ছে আপনি ধোকা খেতে পারেন। পাদ্রী বললেন, বহু পরীক্ষিত নীতি-দর্শন ও কলাকৌশলও ব্যর্থ হয়ে যায়।
যদি আবদুর রহমানের মতো বিচক্ষণ ও দূরদর্শী একজন মুমিন পুরুষ এক নারীর মায়াবী জালে পা দিয়ে এমন বেহুশ হয়ে থাকতে পারে, তাহলে তো দুনিয়ার এমন কোন মানুষ নেই যাকে আমরা মোহগ্রস্ত করে আমাদের দাবার খুঁটি বানাতে পারবো না। ইউগলিস বললো, আমি আপনার মুখে এ শব্দ শুনতে চাই না যে, আমি যা বলছি এবং যা করছি তা পাপ।…..
আমার এসব তৎপরতা আমার ধর্ম ও দেশের পবিত্রতা রক্ষার জন্য। দেশ ও ধর্মের জন্য মিথ্যা বলাকে আমি বৈধই নয়, বরং পূণ্যের কাজ বলে মনে করি। আমি নিজের জন্য শাসন ক্ষমতা চাই না, খ্যাতি চাই না। আমি আমার ব্যক্তিগত সত্তাকে মেরে ফেলেছি।…..
আমি মুসলমানদের শাহী খান্দান ও বড় বড় হাকিমদের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছি যে, তারা তাদের মানবিক ও মানসিক চাহিদাকে যেন জীবিত রাখে। প্রকাশ্যে মনে হবে ওদের মধ্যে ঐক্য রয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওরা পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে।
কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তাদের ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে চরম বিভেদ সৃষ্টি করে দাও। ঐক্যের নাম নিশানাও মুছে দাও।…..
এমন একজন মানুষ হলেন মারীদার মুহাম্মদ ইবনে জাব্বার। যিনি কোন এক সময় অতি নীতিবান হাকিম ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তাকে আমাদের ঝুলিতে পুরতে যাচ্ছি। আমাদের লোকেরা বেশ কিছুদিন ধরে তার পেছনে সময় ব্যয় করে যাচ্ছে। তাকে আমাদের মতো করে গড়ে তোলা হচ্ছে।
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার আবদুর রহমানের শাসনামলে (৮২২-৮৫২ খ্রিঃ) ইতিহাসের চরম বিতর্কিত ও নিন্দিত এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। তবে তিনি নান্দনিক কোন কাজের জন্য নয়, নিন্দিত কাজের জন্যই ইতিহাসের ঘৃণিত এক ব্যক্তিত্বের পরিচিতি পান।
***
আবদুর রহমানের পিতা আল হাকামের যুগে সরকারি ব্যয়ভার এত বেশি বেড়ে যায় যে, সাধারণ নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়। অজুহাত হিসেবে বলা হয়, আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা, বিদ্রোহের অপতৎপরতা বন্ধের জন্য এবং সীমান্ত এলাকায় দুশমনদের হামলার মোকাবেলার জন্য যেহেতু সেনাবাহিনীকে সবসময় অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় কিংবা লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হয়, এজন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভার বেড়ে গেছে।
