প্রতিদিনই তাকে এভাবে খোদার পরের আসনে বসিয়ে দেয়া হয়। এজন্যই আমীরে উন্দলুস দরবারী তোষামোদকারীদেরই চোখে প্রজাদের দেখতেন এবং তাদের কানেই বাইরের সবকিছু শুনতেন।
যেদিন অনবরত গির্জাগুলোয় ঘন্টাধ্বনি বাজিয়ে খ্রিষ্টানদেরকে বিদ্রোহের জন্য উস্কিয়ে দেয়া হচ্ছিলো সেদিন সন্ধ্যায়ও আবদুর রহমানকে এ খবরই শোনানো হলো যে, সবকিছু ঠিক আছে। প্রজারা তার নামে সিজদায় পড়ে আছে।
এসব দরবারীদের কথায় আবদুর রহমানের মতো বিচক্ষণ, দূরদর্শী শাসক, রণকুশীল নেতা, যাকে শাহ লুই ও দ্বিতীয় আলফাঁসো পর্যন্ত ভয় পেতো সেই তিনি তোষামোদকারীদের কথায় সবসময় এতই প্রভাবান্বিত থাকেন যে, তার এই উপলব্ধিও হয়নি, তিনি যা বলছেন, যা করছেন, তাকে দিয়ে যা বলানো হচ্ছে এবং যা করানো হচ্ছে সেটা এক সময় ইতিহাস হয়ে যাবে এবং পরবর্তীতে সেটা হবে ইসলামের ইতিহাস।
ইতিহাস যেমন শোকার্ত দৃষ্টান্ত হয় তেমনি আলোকবর্তিকাও হয়। পরবর্তী প্রজন্ম এতে যেমন পথভ্রষ্ট হয় তেমনি তার গন্তব্যের দিশাও পায়। পথভ্রান্ত হওয়া বা গন্তব্যের দিশা পাওয়াটা নির্ভর করে পূর্বপুরুষরা ইতিহাসের সঙ্গে মিথ্যাচার করেছে না সত্যবাদিতায় অটল থেকেছে।
যে জাতির ইতিহাসে তোষামোদকারী ও গাদ্দারদের হস্তক্ষেপ থাকে সে জাতির ইতিহাস অতিরঞ্জন আর মিথ্যার পসরায় কলুষিত থাকে। মানুষ মানুষকে আত্মপ্রসাদ লাভকারী বানাতে পারে, বানাতে পারে রাজা বাদশাহ, মন্ত্রী, হাকিম, আমীর উমারা। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ জবাব হয়ে থাকে বড় ভয়ংকর।
মোঘলরা উপমহাদেশের ও বনী উমাইয়ারা উন্দলুসের যে ইতিহাস লিখেছে, তা মূলত দরবারীরা লিখেছে। যা নিয়ে আজ আমরা গর্ব করে থাকি। এদিকে তাজমহল, শাহী মসজিদ, কুতুব মিনার, আর ওদিকে আলহামরা ও কর্ডোভার মসজিদকে দেখে আমরা মিথ্যা আবেগে ভেসে যাই।
সোনালী ইতিহাস নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু এটা খুব কমই চিন্তা করি যে, যারা এসব দৃষ্টি নন্দন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নির্মাতা তারা কেন আজ ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে? তাদের কেন পতন হলো? ইসলামী বিশ্ব কেন ছোট হতে হতে আজ অস্তিত্বহীন আর কংকালসার হওয়ার পথে?
***
সেদিন সন্ধ্যায় আবদুর রহমানকে যে রিপোর্ট দেয়া হলো, তাতে গির্জার আগুনের প্রতিবাদে খ্রিষ্টানরা প্রতিটি গির্জায় কি করছে তার কোন উল্লেখই রইলো না। অবশেষে আবদুর রহমান নিজেই জিজ্ঞেস করলেন,
খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে কি কোন খবর নেই?
এমন বিশেষ কিছু ঘটেনি যে, গুরুত্ব দিয়ে সেটা আপনাকে শোনানো হবে। তাকে জবাব দেয়া হলো।
আর তখন আবদুর রহমানের পলকেই মনে হড়লো ওযীর আবদুল করীম ও সালার আবদুর রউফের শব্দগুলো, যা তারা সেদিন সকালে বলেছিলেন, আপনি বিশ্রাম করুন, আমরা বেঁচে আছি। ইসলামকে আমরা জীবন্ত রাখবো। ইসলামের অজেয় প্রহরী হয়ে থাকবে সে সব শহীদদের পবিত্র আত্মা, যাদের লাশ আপনার দরজায় পড়ে আছে।
বিশেষ কিছু যদি ঘটে না থাকে তাহলে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি কেন বাজছিলো অনবরত? আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো সেসব শহীদদের কথা আজ একবারও উল্লেখ করলে না, যাদেরকে আজকেই মাত্র দাফন করা হয়েছে। লোকেরা নিশ্চয় তাদের জানাযায় শরীক হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো মন্তব্যও করেছে এ বিষয়ে। নিজেদের বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছে।
শাহে উন্দলুসের এত সময় থাকা উচিত নয় যে, সামান্য সামান্য কথায় তিনি পেরেশান হয়ে উঠবেন। যারিয়াব বললেন, এ ঘটনার দায়-দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের সে মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলে দেয়া হয়েছে। শাহে উন্দলুসের নিশ্চিন্ত থাকা উচিত।
গির্জার ঘটনায় যে দুই খ্রিষ্টান গ্রেফতার হয়েছিলো সে দিনই রাতে তারা কর্ডোভা থেকে পঞ্চাশ ষাট মাইল দুরে ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু, উন্দলুসের সন্ত্রাসী লিডার ইউগেলিসের কাছে অবস্থান করছিলো। মুক্তিপ্রাপ্ত দুই খ্রিষ্টান ইউগেলিসকে বলছিলো, পরিত্যক্ত সেই গির্জায় ঈসা (আ) এর আত্মপ্রকাশ নিয়ে যে নাটক খেলা হয়েছিলো সেটা ব্যর্থ হয়েছে।
তারা বিস্তারিত শোনালো, গত রাতে গির্জায় কি কি ঘটেছে এবং এতে তাদের সাময়িক ব্যর্থতা হলেও পরিণাম এমন হয়েছে যে, বলা যায় ওদের উদ্দেশ্য খুব ভালো করেই পূরণ হয়েছে। তারা আরো জানালো, গির্জার ঘটনাকে কিভাবে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়ার দ্বারা এটাই প্রমাণ হয় যে, আবদুর রহমান এ ঘটনাকে তেমন গুত্ব দেননি? ইউগেলিস বললো, হুকুমতের কি খবর?
আপনি ঠিকই বলেছেন। এক খ্রিষ্টান বললো, শাহে উন্দলুসের সামনে আমাদের নিয়ে যাওয়ার আগে যারিয়াব আমাদেরকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে বলে দেন আমাদের কি কি করতে হবে। যারিয়াব ও সুলতানা আগেই শাহে উন্দলুসের ধ্যান ধারণা তাদের মতো করে বদলে নিয়েছে। আমরা মজলুমের অভিনয় করে বলি, আপনার মন্ত্রীদের হুকুমে আমাদের গির্জায় আগুন লাগানো হয়েছে।
শাহে উন্দলুসের হেরেমের দুই খ্রিষ্টান মেয়ে আমাদেরকে বলে দিয়েছে, আবদুর রহমানের মাথা পরিস্কার করে দেয়া হয়েছে। আরেকজন বললো, আর এ ঘটনাকে তিনি তেমন কিছু মনে করছেন না।
…. আর গির্জাগুলোয় খ্রিষ্টানদের ভিড় বাড়ছে। একজন বললো, ওদেরকে এখন উত্তেজিত করতে করতে আগুন উত্তপ্ত করে দেয়া হয়েছে।
