এরপর তারা খ্রিষ্টান নাগরিকদেরকে হুকুমাতে উন্দলুসের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। তবে গির্জায় কারা আগুন দিয়েছে সেটা জানা সহজ হবে না…..আমার পরামর্শ হলো, এই খ্রিষ্টান দুই কয়েদীকে ছেড়ে দিন এবং খ্রিষ্টানদের গোপন তৎপরতার ওপর নজর রাখুন। গির্জায় আগুন লাগিয়ে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে আপনি নেভাতে পারবেন না। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন।
ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়ার খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও তাদের সঙ্গে তার নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিলো। এজন্য তিনি ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতিতে কথা বলছিলেন। আর যারিয়াব তো খ্রিষ্টানদের এজেন্ট। কিন্তু আবদুর রহমান তার ব্যাপারে খুবই প্রভাবান্বিত ছিলেন। এজন্য তিনি তাদের পরামর্শ মতোই ফয়সালা শোনালেন, দুই কয়েদীকে মুক্ত করে দেয়া হোক।
আবদুর রহামন যখন এ ফয়সালা শোনাচ্ছেন তখন কর্ডোভার গির্জাগুলোয় ঘরা-তবলা বাজতে লাগলো। কোনটার আওয়াজ ভারি, কোনটার আওয়াজ হালকা। এক সুর তালে শৃংখলিত হয়ে ঘরা বেজে চলেছে। এসব বাজানোর সময় নয় এটা। মনে হচ্ছিলো, কোন ভয়াবহ কিছু ছুটে আসছে।
কি হলো ওদের? মনে হচ্ছে ওদের ওপর কোন আপদ নেমে এসেছে? আব্দুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন।
এটা আপদের চেয়ে কম কী যে, ওদের প্রাচীন এক গির্জায় আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। যারিয়াব বললো, এটা শোকের বাজনা। আমরা তো কারো কান্না বা বিলাপ করতে বাধা দিতে পারি না শাহে উন্দলুস! আপনি পেরেশান হবেন না। আমি ওদেরকে সামলে নেবো।
***
আগুন লাগা গির্জায় পাহাড়ের ওপর হওয়ায় আগুনের শিখা কর্ডোভার মানুষ দেখেছে। ওদেরকেই কয়েক দিন আগে হযরত ঈসা (আ) এর আত্মপ্রকাশ দেখানো হয়েছে এবং তার পয়গামও শোনানো হয়েছে। যাতে হযরত ঈসা ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। রাতে ওরাই আবার হযরত ঈসা (আ) কে দেখতে গিয়েছিলো।
গির্জায় যখন আগুন লাগলো এমন ছুটোছুটি শুরু হলো যে, লোকজন এলেপাথারি পালাতে লাগলো। কয়েকজন তো ছুটন্ত মানুষের ধাক্কা খেয়ে পড়ে চিরাচ্যাপ্টাও হলো। এসব আতংকিত মানুষ সারা শহরেই নয়, উপশহর এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ভয়ংকর সব গুজব ছড়িয়ে দিলো। এজন্য খ্রিষ্টানরা গির্জার ঢোলের আওয়াজ শুনে গির্জার দিকে ছুটে যেতে লাগলো।
…………আর তোমরা তোমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছো? প্রতিটি গির্জায় এসব কথার গুঞ্জরণ শোনা যাচ্ছিলো।
প্রত্যেক পাদ্রীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু একটাই,
আজ তোমাদের ঐ গির্জায় মুসলমানরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, যেখানে খোদার পুত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিলো। এই গির্জাই তার অনেক প্রিয় ছিলো। তিনি বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের দুশমনের হাতে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
কোন কোন গির্জা থেকে এরকমও শোনা যেতে লাগলো,
ঈসা মাসীহ তাঁর এই গির্জিাকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে চির দিনের জন্য চলে গেছেন। যাতে তিনি রাতে এসে উপাসনা করতেন।
গির্জার ঘণ্টা অনবরত বাজতেই থাকলো। যেন এখন এটা সার্বক্ষণিক বাজতেই থাকবে।
আবদুর রহমানের মন যেন এই ডন ডানাডন একঘেয়েমি শব্দে ঝিমুচ্ছিলো। আবদুর রহমান যখন দরবারে প্রবেশ করলেন তখন যেন গির্জার ঘন্টা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।
বন্ধ করো এসব! আমি তো আমার ফয়সালা দিয়ে দিয়েছি। আবদুর রহমান গর্জে উঠলেন।
দরবারী সিপাহী বরকন্দাজরা শাহে উন্দলুসের হুকুম পালন করতে ছুটাছুটি শুরু করে দিলো। বাইরে ঘোড়া ছুটানোর আওয়াজ শোনা যেতে লাগলো। আর কিছুক্ষণ পর ঘণ্টাধ্বনি বন্ধ হয়ে গেলো।
ঘণ্টাধ্বনি বন্ধ হয়ে গেছে শাহে উন্দলুস! এক দরবারী আবদুর রহমানকে জানালো।
হ্যাঁ, হা, আবদু রহমান বিরক্তিতে ফেটে পড়ে বললেন, আমার তো কান আছে।
কিন্তু আপনি এই তুফানকে কি করে বন্ধ করবেন যা গির্জা থেকে উঠছে? ওযীর হাজিব আবদুল করীম আবদুর রহমানের পাশে বসা থেকে বলে উঠলেন, আপনি সেই বিভ্রান্ত মানুষের মুখ কি করে বন্ধ করবেন যারা গির্জার জন্য আর্তনাদ করছে?…..আমীরে উন্দলুস! আমি এই মাত্র শহীদদেরকে দাফন করে এসেছি?…..
শহীদ…..শহীদ আবদুর রহমান ঝাঁঝালো গলায় বললেন, আবদুল করীম! অন্য কোন কথা বলল।…..ভাবতে দাও কিছু…..আমাকে কিছু একটা ভাবতে দাও,…..
বলতে বলতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ওযীর, মন্ত্রী, দরবারী সবাইকে দ্বিধান্বিত ও দুশ্চিন্তায় রেখে বেরিয়ে গেলেন দরবার কক্ষ থেকে।
***
সন্ধ্যায় প্রতি দিনের খবরাখবর আবদুর রহমানকে শোনানো হতো। দুজন উপদেষ্টা এসব খবর শোনাতো। তবে তারা সরাসরি সেসব আবদুর রহমানকে শোনাতে পারতো না। একজন দরবারী হাকিম ছিলো। সে তাদের কাছ থেকে শুনে কাঁটছাট করে কেবল সে খবরই শোনাতো যা শুনতে আবদুর রহমান পছন্দ করতেন।
এরপর দরবারে যারিয়াব যখন আধিপত্য বিস্তার করলো তখন থেকে যারিয়াব সে হাকিমকে যা বলে দিতো সে খবরই আবদুর রহমানকে শোনানো হতো।
লোকে তো খলীফার নাম পর্যন্ত জানে না, সেদিনের রিপোর্ট শোনানোর সময় আবদুর রহমানকে বলা হলো, লোকে শুধু শাহে উন্দলুসকেই চিনে।
কোথাও থেকে কি বিদ্রোহের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে? আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন।
বিদ্রোহ? রিপোর্ট প্রদানকারী হাকিম হয়রান হয়ে জবাব দিলো, কিসের বিদ্রোহ? কী মুসলমান, কী খ্রিষ্টান, সবাই তো আপনার নাম শুনলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। বিদ্রোহের চিন্তা করবে এত বড় দুঃসাহস কার?
