***
সূর্য দেবী সবেমাত্র অস্তমিত হয়েছে। তারেক ইবনে যিয়াদ টলেডো থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরত্বে রয়েছেন। ফৌজ রয়েছে তাবুতে। তিনি জানেন না তার সাথী মুগীছে রূমী ও যায়েদ ইবনে কাসাদা কি অবস্থায় আছে।
টলোডা হতে বার/তের মাইল দূরে দু’শ আড়াই শ নারী-পুরুষ, শিশু কিশোরের আরেকটি কাফেলা অবস্থান করছে তবে সে কাফেলা কোন ফৌজের নয়। স্বয়ং প্রধান পাদ্রী সে কাফেলাতে আরো দু’চারজন পাদ্রীসহ রয়েছে। কাফেলা খোলা আসমানের নিচে গভীর ঘুমে অচেতন। তাদের সোয়ারী গুলো পাশেই বাঁধা রয়েছে।
রাত্রি দ্বিপ্রহর। কাফেলার অদূরে একটি গাছের ওঁতে আয়না মেরী নাম্নী এক যুবতী ললনা নিষপলক নেত্রে চেয়ে আছে কাফেলার দিকে। তের-চৌদ্দ বছর বয়সে তাকে গির্জায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এখন তার বয়স বাইশ-তেইশ বছর। বাহ্যিকভাবে তো তাকে ধর্ম যাজিকা বানানো হয়ে ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাকে, পাদ্রীরা বানিয়ে ছিল উপ-পত্নি। আর এরূপ পত্নী বানানকে পাদ্রীরা অধিকার বলে মনে করত।
নিদ্রিত কাফেলার কাছ থেকে একটি ছায়া মূর্তি ধীরে ধীরে আয়না মেরির কাছে গিয়ে পৌঁছল।
আয়না মেরী : সেই কখন থেকে তোমার প্রতিক্ষায় আছি। তুমি এভাবে খালি হাতে কেন এলে জিমি? ঘোড়া কোথায়? দ্রুত ঘোড়া নিয়ে এসো, এখান থেকে আমাদের ফিরে যেতে হবে।
জিমি : কি হয়েছে সব কিছু খুলে বল মেরী! তুমি কেবল এ গাছের দিকে ইশারা করে রাত্রি দ্বিপ্রহরে দু’টো ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলে।
মেরী যে গির্জায় যাজিকা ছিল সেখানে নওকর ছিল পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের সুদর্শন যুবা জিমি। তার শয়ন স্থল গির্জার ভেতরেই ছিল। মেরী তাকে দেখা মাত্র তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। সে গির্জাতে আরো চার-পাঁচ জন যাজিকা ছিল কিন্তু মেরীর বদকিসমত সে ছিল তাদের সকলের চেয়ে কম বয়সী ও সবচেয়ে সুন্দরী। মাঝ বয়সী পাদ্রীরা তাকে ভোগ্য বস্তু বানিয়ে রেখেছিল।
জিমির সাথে প্রথম সাক্ষাতে মেরী অনুভব করতে পেরেছিল যেমনিভাবে তার হৃদয় গভীরে জিমির প্রেম-ভালবাসা আসন গেড়ে বসেছে ঠিক তেমনিভাবে জিমিও তার জন্যে বেকারার হয়ে উঠেছে। প্রথম মুলাকাতেই মেরী তার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয় খুলে দিয়েছিল। বলেছিল তার শত-সহস্র বেদনার কথা। সে বলেছিল তাকে তের চৌদ্দ বছর বয়সে কিভাবে জোর পূর্বক গির্জাতে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং তাকে বুঝানো হয়েছিল খোদা তাকে তার বন্দেগীর জন্যে নির্বাচন করেছেন ফলে দুনিয়ার সাথে এখন তার তাবৎ সম্পর্ক চুকে গেছে।
প্রথম মুলাকাতেই মেরী কান্না মাখা গলায় জিমিকে বলেছিল,
“কিন্তু পাদ্রীরা আমার সাথে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ও যে আচরণ করেছে তাতে তারা আমাকে ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করে তুলেছে। ঈসা মসীকে একবার গুলিতে চড়ান হয়েছিল। আর আমি প্রতিদিন, প্রতিটি রাত্রে শুলিতে চড়ি। ঈসা মসীকে হাতে-পায়ে কিলক বিদ্ধ করা হয়েছিল। আর আমার হৃদয় অন্তরে কিলক মারা হয়। প্রতি রাত্রে, প্রতিটি মুহূর্তে আমি ধুকে ধুকে মরি। আমি তো একজন পতির স্বপ্ন দেখতেছিলাম। আমি খোদার মহব্বত চাই না। আমি চাই এক ইনসানের ভালবাসা-মহব্বত। কিন্তু আমাকে কে ভালবাসবে? কে আমাকে তার হৃদয় গভীরে স্থান দেবে? আমি নিজেই আমার শরীর থেকে দুর্গন্ধ পাই, আমার নিজেকে ঘৃনা হয়। তুমিও কি আমাকে ঘৃণা করবে জিমি?
জিমিঃ তোমার শরীরের প্রতি আমার কোন মোহ নেই, নেই কোন কাংখা। আমার লক্ষ্য, আমার চাওয়া-পাওয়া কেবল মাত্র তোমার হৃদয়-মন।
যে মায়া-মমতা, প্রেম-ভালবাসার সম্পর্ক হৃদয়-মনের সাথে, শরীরের সাথে নয় জিমি প্রথম সাক্ষাতে মেরীকে সে ভালবাসা ও প্রেমের কথা বলেছিল। মেরি এতদিন আর কাংখায় ছিল কাতর তা সে পেয়েছিল। তারা দু’জন সেথা হতে পলায়নের অঙ্গিকার করেছিল। কিন্তু গীর্জা থেকে কোন যাজিকা পালিয়ে যাবে এটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। প্রতিটি গীর্জার যুবতীরা কয়েদীর মত বসবাস করত। তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ এমন স্বতন্ত্রধর্মী ছিল যে কোন যাজিকা পালিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখা তার জন্যে ছিল একেবারেই অসম্ভব। জিমির ঘরও ছিল দূরে। টলেডোতে তার এমন কেউ ছিল না যে, সেখানে মেরীকে লুকিয়ে রেখে পরে সময় মত পালিয়ে যাবে। তার পরও তারা প্রতিক্ষা করে ছিল পালিয়ে যাবার জন্যে।
ছ’ মাসে তাদের প্রেম-ভালবাসা এমন পর্যায় পৌঁছেছিল যে তাদের বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করাই ছিল অবান্তর। তারা একে অপরের জন্যে জীবন উৎসর্গ করাকে, মামুলী জ্ঞান করত। ২. তারপর টলেডোতে মুসলমানদের ভয়-ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। কিছু দিনের মাঝেই মানুষ শহর ছেড়ে চলে যেত লাগল।
একদিন জিমি মেরীকে বলল, মেরী! এখন সুযোগ এসেছে, শহরের দরজা সর্বদা খোলা। মানুষ দলে দলে পরিবার পরিজন নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরাও আমাদের পোষাক বদলিয়ে পালিয়ে যেতে পারি।
মেরী : এখন তারা আমার প্রতি আরো বেশী নজর রাখছে। আমি সামান্যতম একটু এদিক-সেদিক গেলে তারা পাগলের মত তালাশ করতে থাকে।
জিমিঃ প্রধান পাদ্রীর কামরাতে তোমার পরিবর্তে অন্য কোন যাজিকাকে পাঠিয়ে দাও।
মেরী : আমাকে ছাড়া সে অন্য কোন নারীর প্রতি ঘুরেও তাকায় না। আমাকে ছাড়া তার অবস্থা এমন হয়, যেমন তোমাকে ছাড়া আমার অবস্থা আর আমাকে ছাড়া তোমার অবস্থা হয়।
