টলেডো শহর একদিকে তো সাগর বেষ্টিত অপর দিকে কেল্লা বন্দি এ শহর বেশ উঁচুতে ছিল। কেল্লা ও শহরের প্রাচীর খুব ভারী ও বড় মজবুত পাথর দ্বারা তৈরী করা, হয়েছিল। শহর প্রতিরক্ষা প্রাচীরের আশে-পাশে ছিল গভীর ও প্রশস্ত পরিখা। যারাই সিংহাসনে বসেছে তারাই শহরের প্রতি রক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করেছে।
তারেক ইবনে যিয়াদ ময়দানে-পাহাড়ে সামনা-সামনি লড়াই করেছেন। বার হাজার সৈন্য দ্বারা এক লাখ সৈন্য পরাস্ত করেছেন। কিন্তু কেল্লা কবজা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। তার কৌশল-পদ্ধতিও আলাদা। তারপর টলেডোর মত শক্তিশালী ও মজবুত হলে তো কোন কথাই নেই। আল্লাহর ওপর ভসরা করে তারেক সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
টলেডোতে বাদশাহ রডারিকের মাতম চলছিল। কেবল শাহী মহল নয় বরং গোটা শহর বিষণ্ণতার চাদর ডেকে নিয়ে ছিল। রডারিকের এক লাখ ফৌজের কিছু পলায়নকৃত ফৌজ টলেডোতে পৌঁছেছিল এ ছাড়া অন্যান্য যুদ্ধ থেকেও পলায়ন পদ সৈন্যরাও সেখানে একত্রিত হয়েছিল। তারা সেখানে পৌঁছে মুসলমানদের ব্যাপারে মানুষের মাঝে এমন প্রচারণা চালিয়ে ছিল যে মুসলমানরা যেন এমন হিংস্র বাঘ সিংহ যে যাকে সামনে পায় তাকে মুহূর্তের মাঝে খতম করে দেয়।
রডারিক যখন ভূমধ্য সাগরের যুদ্ধের জন্যে স্বেচ্ছালোক সংগ্রহ করছিল তখনও টলেডোতে মুসলমানদের ব্যাপারে নানা ধরনের প্রচারনা চলছিল। যেমন একে অপরে বলাবলি করছিল,
“তারা মুসলমান বা অন্য যাই হোকনা কেন তারা মানুষ নয়। অন্য কোন মাখলুক।”
“তারা নেকড়ে বাঘ, অজগর, সম্মুখে যা পায় তা গ্রাস করে চলে যায়।”
“বাদশাহ্-রডারিকের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।”
“তারা আমাদের বাদৃশাহকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে।”
“এটা তাদের অভ্যাস, তারা যাকে পরাজিত করে তার গোস্ত তারা ভক্ষণ করে।”
তারা এদিকে আসছে, লুটতরাজের কোন সীমা থাকবে না।” : এ ধরনের নানা প্রচারনা টলেডোর মানুষের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করে চলছিল।
মানুষের ঘরে ধন-দৌলত, যুবতী ললনা ছিল কিন্তু কেউ তার কোন চিন্তা করছিল না সকলেই নিজের জীবনের চিন্তে করছিল। ধনী-গরীব সকলে নিজের জান বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।
তৎকালে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, বিজয়ীরা লুটতরাজ ও মানুষের ইজ্জত আব্র হরণ করতো। যার ফলে মানুষ পলায়ন করে চলে যেত। সুতরাং মুসলমানদের ব্যাপারে এসব-প্রচারণা মানুষের কাছে কোন আশ্চর্যজনক কিছু মনে হলো না। তাই টলেডো ছেড়ে জনসাধারণ পলায়ন করতে লাগল ফলে কিছু দিনের মাঝেই পুরো শহর জনশূন্য হলো। কেবল সেনা সদস্যরা রয়ে গেল, তারাও ছিল একেবারে ভীত-সন্ত্রস্ত।
ফৌজ ছাড়া শহরে আর যেসব লোকছিল তারা হলো ইহুদী ও গোথা সম্প্রদায়ের লোক। তারা মুসলমানদের পক্ষে ছিল। মুসলমানদের ব্যাপারে উদ্ভট প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে এরাই মানুষের মাঝে বেশী ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
***
টলেডোতে বেশ অনেকগুলো গির্জা ছিল তার মাঝে একটা ছিল বড় গির্জা। গির্জাতে ছিল যাজিকা ও বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ। পূর্বেই বলা হয়েছে গির্জার পাদ্রীরা নিজেদেরকে খোদা প্রেরিত ফেরেশতা ও দুনিয়া ত্যাগী বলে দাবী করত, বস্তুত তারা ছিল ভোগবিলাসী, দুনিয়াদার ও প্রবৃত্তি-পূজারী। বাদশাহদের কাছ থেকে তারা জায়গীর নিয়েছিল। জায়গীরের অর্থ সম্পদ ছাড়াও গির্জার নামে তারা মানুষের কাছে পয়সা নিয়ে সম্পদের বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছিল। সকল পাদ্রী বড় পাদ্রীর কাছে গিয়ে বলল, এত বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ সোনা-দানা, টাকা-পয়সা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায়?
বড় পাদ্রী বলল, অবশ্যই কোথাও লুকিয়ে রাখা দরকার। এত পরিমাণ সম্পদ সাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সাথে যদি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে নিজেদের লোকরাই তা লুট করে নিবে। সুতরাং তাবৎ ধন-সম্পদ, মনি-মুক্তা, টাকা-পয়সা একত্রিত করে আন্ডার গ্রাউন্ডে গর্ত করে সবকিছু মাটিতে পুঁতে রাখ।
রাতে সম্পদের বাক্স প্রধান গির্জার আন্ডার গ্রাউন্ডে পৌঁছে গেল। আন্ডার গ্রাউন্ডে ফ্লোর খুঁড়ে তাবৎ খাজানা মাটি চাপা দিয়ে রাখা হলো। পাশে রয়ে গেল প্রায় ছয় ফুট লম্বা ও তিনফুট চওড়া একটা গর্ত। খননকারী ছিল তিনজন, তাদের কাজ প্রায় শেষের পথে এরি মাঝে বড় পাদ্রীর ইশারায় আরো তিনজন ব্যক্তি খোলা তলোয়ার হাতে সেখানে প্রবেশ করল।
বড় পাদ্রী খননকারীদেরকে নির্দেশ দিল গর্তের মাঝে যে অবশিষ্ট মাটি রয়েছে তা তুলে ফেল। নির্দেশ মুতাবেক তারা মাটি উঠানোর জন্যে ঝুঁকার সাথেসাথে তলোয়ার ধারীরা তিন খনন কারীর গর্দান উড়িয়ে দিল। তারপর খালী গর্তে তাদের লাশ রেখে মাটি চাপা দিয়ে দেয়া হলো। বড় পাত্রী বলল, এখন এ তাবৎ সম্পদ পূর্ণ মাত্রায় নিরাপদ হয়ে গেল, আর কেউ ছিন্তাই বা নষ্ট করতে পারবে না।
তারপর প্রধান পাদ্রী আন্ডার গ্রাউন্ডের ঢাকনা ফেলে দিয়ে তার ওপর ফরশ বিছিয়ে একটা টেবিল রেখে দিল আর সে টেবিলের ওপর ক্রসবিদ্ধ অবস্থায় হযরত ঈসা (আ)-এর মূর্তি রেখেদিল।
প্রধান পাদ্রী বলল,এখন আমাদের এ শহর ছেড়ে চলে যাওয়া দরকার। নতুন বিজয়ীরা আসুক। তারপর পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা ফিরে আসব। আমাদের সম্পদাদি হেফাজতে থাকবে। আর একটা কথা ভাল করে শুনে নাও, একজন যুবতী যাজিকাও যেন এখানে না থাকে তাহলে মুসলমানরা তাদেরকে দাসীতে পরিণত করবে।
