কমান্ডাররা বলল, ঘটনা হয়তো এমনই ঘটবে।
যায়েদ ইবনে কাসাদা : তোমাদের বুদ্ধির অভাব আছে। কোন কেল্লাদার দুশমনের সামান্যতম ফৌজকেও ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না। আমাদের তো ফৌজ রয়েছে তাদের প্রবেশের জন্যে সে সকাল বেলা দরজা খুলে দেবে। তারা। হয়তো বুঝতে পেরেছে, বর্বর মুসলমান সংখ্যায় কম হলেও তাদেরকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
যায়েদ ইবনে কাসাদা সারা রাত ঘুমোতে পারলেন না। তিনি চিন্তা করতে ছিলেন না জানি তাকে কোন ফাঁদে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে কিনা। তিনি তার কমান্ডারদেরকে রাতে বিদ্রি থেকে চৌকস থাকার জন্যে এবং প্রভাতে কেল্লাতে প্রবেশ করার সময় চতুর্দিকে ভালভাবে লক্ষ্য করার নির্দেশ দিলেন।
প্রভাত হলো। এক মুজাহিদ ফজরের আযান দিলে তাবৎ লস্কর যায়েদ ইবনে কাসাদার পিছনে নামাজ পড়ল। যায়েদ তার অধিনত কমান্ডারদেরকে বললেন, কেল্লার ভেতর প্রবেশ করার সময় সবাই যেন সতর্ক থাকে।
সকাল বেলা। সূর্য উঠার পূর্বেই কেল্লার ভেতর হতে একজন এসে যায়েদ ইবনে কাসাদাকে বলল, জেনারেল তিতুমীর আপনার জন্যে ইন্তেজার করছে। যায়েদ তার সৈন্য বাহিনীকে তার পিছু পিছু আসার নির্দেশ দিয়ে আগন্তুকের সাথে রওনা হলেন।
ফৌজ পূর্ব হতেই তৈরী ছিল। যায়েদ নির্দেশ দেওয়া মাত্র তারা রওনা হয়ে গেল। ধারণা ছিল হয়তো প্রাচীরের ওপর পূর্বের ন্যায় ফৌজ থাকবে কিন্তু দেখা গেল প্রাচীরে কেউ নাই।
তিতুমীর ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে যায়েদের ইন্তেজারে ছিল। যায়েদ পৌঁছলে তাকে এস্তেকবাল করে ভেতরে নিয়ে গেল।
যায়েদ : আমার ফৌজরাও কি ভেতরে আসতে পারবে?
তিতুমীর : হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমি কি সন্ধি পত্রে উল্লেখ করিনি যে কেল্লা আপনাকে সোপর্দ করব?
যায়েদ ইশারা করামাত্র তামাম ফৌজ কেল্লাভ্যন্তরে প্রবেশ করল এবং পূর্ব নির্দেশ মুতাবেক পূর্ণ সতর্ক রইল। কেল্লার ভেতর কোন ফৌজ চোখে পড়ল না। ঘরের ছাদে আওরাত ও বাচ্চাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। কিছু কিছু বৃদ্ধ মানুষও ছিল। এতে যায়েদের সন্দেহ আরো প্রবল হলে মনে হয় নিশ্চয় কোন ফাঁদ পাতা হয়েছে।
যায়েদ : আপনার ফৌজ ও কেল্লাদার কোথায়?
তিতুমীর : এখানে কোন ফৌজ নেই। এখানে আপনি ফৌজের একটা সদস্যও পাবেন না। আমি আপনার কাছে মিথ্যে বলেছিলাম। আমার দেহরক্ষীও নেই। যে একজন ব্যক্তি দেখেছেন সে আমার ব্যক্তিগত কর্মচারী, আমাকে ছেড়ে যেতে সে রাজী হয়নি।
যায়েদ : আমি তোমার একথা কি বিশ্বাস করব?
তিতুমীর: ফৌজ এমন কোন ছোট জিনিস নয়-যে তা লুকিয়ে রাখব। এ সারা শহর আপনাকে সোপর্দ করেছি। আপনার কাছে ফৌজ আছে। শহর তল্লাশী করে দেখতে পারেন। আমাকে ছাড়া এখানে আপনি কোন সৈন্য দেখতে পাবেন না। আমার তাবৎ ফৌজ আপনার হাতে কতল হয়েছে আর যারা জীবিত আছে তারা। পালিয়ে গেছে।
যায়েদ : তুমি মিথ্যে বলছ। দেয়ালের ওপর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে ফৌজ সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সে সৈন্য আমি দেখতে চাই।
আবাল-বৃদ্ধ জনতার দিকে ইশারা করে হেসে তিতুমীর বলল, এরা হলো সে ফৌজ যাদেরকে আপনি প্রাচীরে দেখেছিলেন, আপনি যদি দেখতে চান তাহলে তা আমি আবার দেখাতে পারি। আমি ধোকা দিয়ে সন্ধি পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছি। আমার কাছে কোন ফৌজ নাই। তাই পলায়ন করার পরিবর্তে এ পদ্ধতি অবলম্বন। করেছি। যাতে আপনি মনে করেন কেল্লা অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ সৈন্যের সমাবেশ রয়েছে।
যায়েদ : এ প্রতারণার কি দরকার ছিল? তুমি কি এ বৃদ্ধ বনিতাকে আমাদের হাতে কতল করাতে চাচ্ছিলে? আমি যদি কেল্লা আক্রমণের ইচ্ছে করতাম তাহলে এ নিষ্পাপ শিশু-কিশোররা তো আমাদের তীর বর্শার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতো। আর তুমি মনে করোনা যে আমি তোমার ফৌজ দেখে ভীতু হয়ে সন্ধি করেছি।
তিতুমীর : আমি জানি আপনাকে ভীতি প্রদর্শন সম্ভব নয়। আর আমি আপনাকে ভয়ও দেখাই নাই। আমার উদ্দেশ্য ছিল আপনি এমন পদ্ধতি গ্রহণ করেন যাতে দ্বিতীয় বার যেন আর রক্তপাত না ঘটে। আমি আপনাকে পূর্ণ মাত্রায় আশ্বস্তঃ করছি যে, আপনার সাথে আমি যে অঙ্গিকারাবদ্ধ হয়েছি তা কোন চালবাজী নয় প্রকৃত অর্থেই আমি আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছি। আমি আমার নিজস্ব কোন ফৌজ তৈরী করব না বরং পরিপূর্ণভাবে আপনার অধীনত থাকব।
ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেন তিতুমীরের বুদ্ধিমত্তা দেখে যায়েদ এত পরিমাণ প্রভাবান্নিত হন যে প্রধান সেনাপতি তারেক ইবনে যিয়াদের অনুমতি ছাড়াই তিনি তিতুমীরকে গ্রানাডার গভর্নর নিযুক্ত করেন তবে তাকে এক আরবী শাসনকর্তার অধীনে রাখেন।
গ্রানাডার অধিবাসীদের মাঝে ইহুদীদের সংখ্যাধিক্য ছিল। তারা রডারিকের শাসনে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল তাই তারা মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। গ্রানাডার সরকার পরিচালনার জন্যে যায়েদ মুসলমানদের সাথে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকেও নিয়োগ করেছিলেন। প্রশাসনিক কার্য পরিচালনার মত লোক বেশ অভাব ছিল মুসলমানদের মাঝে। এ অভাব মিটানোর জন্যে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে এসব কাজে নিযুক্ত করতে হতো। পরিণামে ঐ ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা বিদ্রোহ করেছে এবং ইসলামী সালতানাতানের ক্ষতি সাধনের জন্যে সর্বোপরি চেষ্টা করেছে।
যে সময় মুগীছে রূমী ও যায়েদ ইবনে কাসাদা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে আপন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক সে সময় তারেক ইবনে যিয়াদও টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। টলেডো যেহেতু রাজধানী ছিল এজন্যে জুলিয়ন ও আওপাস তারেকের সাথে ছিল। টলেডো শহর কেবল দরিয়ার পাড়েই ছিল না বরং দরিয়া দ্বারা তা বেষ্টিত ছিল। দরিয়ার কিনারাতেই একটি ঝিল ছিল যাতে দরিয়ার পানি এসে জমা হতো। এ ঝিলের পাড়েই মেরীনার সাথে আওপাসের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
