নেইলপোল লেখেন, অন্য কোন যুদ্ধে এত পরিমাণ মানুষ আর মরেনি। তিতুমীর যে তিনশ ফৌজ শহরের পশ্চাতে পাঠিয়ে ছিল বর্বররা তাদেরকে একেবারে কচুকাটা করেছিল। কোন ফৌজ যদি প্রাণ নিয়ে পালাবার সুযোগ পেয়ে ছিল তাহলে সে শহরের দিকে যায়নি, জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্য দিকে ছুটে আত্মগোপন করেছিল।
তিতুমীরকে যুদ্ধ ময়দানে পাওয়া গেল না। স্পেনী ফৌজদের পতাকা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ শেষ হয়েছিল কিন্তু যায়েদ ইবনে কাসাদার নির্দেশ ছিল কোন দুশমনকে যেন জিন্দা না রাখা হয়।
যুদ্ধ ময়দান হতে গ্রানাডা বেশ একটু দূর ছিল। দুশমন বাহিনী পুরো সাফ করে সালার যায়েদ গ্রানাডার দিকে রওনা হলেন। তিনি তার ফৌজদেরকে সুসংবাদ দিলেন যে আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে বিজয় দান করেছেন। এখন কাজ হলো কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করে শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা, সম্ভবতঃ শহরে কেউ আর প্রতিরোধ করবার নেই। যায়েদ ইবনে কাসাদা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে কেল্লার দিকে দৃষ্টিপাত করে থ’ মেরে গেলেন। কেল্লার প্রাচীরের ওপর মানুষের দরুন আরেকটি প্রাচীর তৈরী হয়েছে। অবরোধের সময় সব কেল্লার ওপরে সিপাহী থাকে কিন্তু এত পরিমাণ মানুষ তিনি ইতিপূর্বে আর কোথাও দেখেননি। প্রাচীরের ওপর যারা রয়েছে তাদের সকলের হাতে তীর-বর্শা, গায়ে বর্ম ও মাথায় লৌহ শিরস্ত্রান।
যায়েদ তার সহকারী সালারকে লক্ষ্য করে বললেন, আমরা মনে করেছিলাম যে, গ্রানাডার তাবৎ সৈন্য খতম করে দিয়েছি। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তো দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত। ময়দানে যে সৈন্য ছিল তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী সৈন্য দেখা যাচ্ছে শহরের হেফাজতে রয়েছে তাই এখন সম্মুখে অগ্রসর হওয়া ঠিক হবে না।
পড়ন্ত বিকেল। দিবাকর হারিয়ে যাবার জন্যে উঁকি মারছে। যায়েদ ইবনে কাসাদা কেল্লা অবরোধ করলেন। মুসলমান বহু ফৌজ শহীদ হয়ে ছিলেন, অনেকে হয়েছিলেন আহত। বাকীরা পূর্ণ মাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত তারপরও সালার যায়েদ প্রাচীরের কাছে গিয়ে ঘোষণা করলেন, হে কেল্লাবাসী! তোমরা তোমাদের ফৌজের পরিমাণ লক্ষ্য কর। তোমরা যদি যুদ্ধ ব্যতীত শহরের দরজা খুলে দাও তাহলে সকলে পাবে নিরাপত্তা তানা হলে সকলকে করা হবে হত্যা।
কোন কেল্লা অবরোধ করে এমন ঘোষণা দিলে সাধারণতঃ ভেতর থেকে দাম্ভিকতাপূর্ণ জবাব আসে কিন্তু যায়েদ ইবনে কাসাদার ঘোষণার কোন জবাব এলো না।
অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ কেল্লার দরজা খুলে গেল। আর তিতুমীর সফেদ পতাকা হাতে বেরিয়ে এলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো তিতুমীর সন্ধির পতাকা নিয়ে কেবল মাত্র একজন কর্মচারীকে সাথে নিয়ে চলে এসেছে। তার সাথে কোন দেহ রক্ষী, সৈন্য সামন্ত কিছুই নেই। যায়েদ ইবনে কাসাদা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তিতুমীরকে ইস্তেকবাল জানালেন। তারপর দু’জন পরস্পরের মুখোমুখি হলেন।
তিতুমীর : এখানের যে বড় কমান্ডার তার নির্দেশে আমি আপনার কাছে এসেছি। তিনি আপনার কাছে পয়গাম পাঠিয়েছেন যে আপনি যদি অবরোধ করেন। তাহলে এক বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে তবুও কিছু করতে পারবেন না। প্রাচীরের দিকে তাকালেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন যে শহরের অভ্যন্তরে কি পরিমাণ। ফৌজ মওজুদ রয়েছে।
যায়েদ ইবনে কাসালা দুভাষীর মাধ্যমে জবাব দিলেন, এত পরিমাণ সৈন্য থাকার পরেও তুমি সন্ধির জন্যে কেন এসেছ? আমার ফৌজ তো তুমি দেখছেই। আগের তুলনায় এখন আরো কমে গেছে।
তিতুমীর : আমাদের জেনারেল খুব রহম দিল ইনসান। তিনি দেখেছেন লড়াই এর দরুন তার বিপুল পরিমাণ ফৌজ হালাক হয়েছে, আপনার ফৌজের লুকসান হয়েছে। এখন আবার যদি লড়াই হয় তাহলে উভয়ের লুকসান হবে, তিনি এটা। চাচ্ছেন না। আর যদি সন্ধি না করেন তাহলে আপনাকে তো বলছিই যে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সৈন্য সামন্ত রয়েছে, আপনি কেল্লা কজা করতে পারবেন না।
যায়েদ ইবনে কাসাদ। ধোকার আশংকা করতে ছিলেন। তারপরও তিতুমীর যেভাবে প্রস্তাব পেশ করেছে তার কথা বিশ্বাস করে সন্ধি প্রস্তাবে তিনি সম্মত হলেন।
তিতুমীর বলল, তবে হ্যাঁ, সন্ধির শর্ত কিন্তু আমরা পেশ করব। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, শহরবাসীর জান-মাল, ইজ্জত-আব্রুর হেফাজত করার দায়িত্ব থাকবে আপনার ওপর। আপনার কোন ফৌজ কোন শহরবাসীর ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না। দ্বিতীয় শর্ত হলো ভান্ডারে যে টাকা-পয়সা আছে তা আমরা স্বেচ্ছায়। আপনার সমীপে পেশ করব। তৃতীয় শর্ত থাকবে আপনি আমাদেরকে যুদ্ধ বন্ধি বানাবেন না। আর আমি আপনার পক্ষ হতে এলাকার গভর্নর নিযুক্ত হব। আপনার সকল বিধি-বিধান মেনে নিয়ে পূর্ণ মাত্রায় আপনার অনুগত থাকব।
সন্ধির এ শর্তাবলী লিপিবদ্ধ করে যায়েদ ইবনে কাসাদা তাতে স্বাক্ষর করে নিজের সীল মোহর লাগিয়ে দিলেন।
যায়েদ ইবনে কাসাদার এক সহকারী কমান্ডার একটু গোস্বার স্বরে বলল, ইবনে কাসাদা! আপনি আমাদের সকলের মৃত্যুর পরওয়ানার ওপর স্বাক্ষর করে সীল লাগিয়েছেন।
আরেকজন কমান্ডার বলল, ঠিকই ইবনে কাসাদা! মনে হচ্ছে আপনি খুব ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন তাই আপনার বুদ্ধিতে কাজ করছে না।
যায়েদ ইবনে কাসাদা : আল্লাহর ওপর আমার পূর্ণ ভরসা রয়েছে। তোমরা কি আশংকা করছ যে, তিতুমীর আমাদেরকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছেআমরা ভেতরে গেলে তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের নাম নিশানা মিটিয়ে ফেলবে।
