তিতুমীরের জানাছিল যে, মুসলমানদের তাকবীর ধ্বনী স্পেনী সৈন্যদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। তাই সে আগেই তার সৈন্যদেরকে ধ্বনী দেয়ার জন্যে হুকুম দিল। সাথে সাথে তারা যুদ্ধ শুরু করার জন্যে উস্কাতে লাগল। দুশমনের উদ্দীপনা স্পৃহা দেখে যায়েদ বুঝতে পারলেন তারা জীবন বাজী রেখে লড়ার জন্যে প্রস্তুত। মুসলমান ফৌজরা ক্লান্ত একথা ভেবে যায়েদ বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন কিন্তু এ পরিস্থিতিতে পিছু তো আর হটা যায় না তাই তিনি যেখানে ছিলেন সেখান থেকেই। ফৌজকে প্রস্তুতি নিয়ে তাকবীর দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ফৌজের স্পৃহা-উদ্দীপনা বাড়াবার জন্যে বলতে লাগলেন,
“বর্বর ভাইরা আমার! তোমাদের স্পৃহা ও ঈমানী শক্তি যাচাই করার সময় এসেছে। আমি আরবী। আজ তোমাদের প্রমাণ করতে হবে যুদ্ধের ময়দানে আরবীদের চেয়ে বর্বররা বেশী ত্যাগী ও জানবাজ। স্মরণ রেখ! তোমাদের অন্য সাথীরা অন্য শহরের দিকে গেছে। তাদের কাছ থেকে তোমাদের তিরস্কার শুনতে না হয় যে, গ্রানাডার দিকে যারা গেছে তারা বুজদিল ও বেঈমান ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো তোমরা যদি পরাজিত হও তাহলে আল্লাহর সামনে তোমরা কি জবাব দেবে।”
এতটুকু বলার পরেই বর্বররা উচ্চস্বরে শ্লোগান দিয়ে উঠল, “আমরা তোমার সাথে আছি যায়েদ! আমরা তোমার সম্মুখে থাকব, আমরা আদৌ পলায়ন পদ হবো না।”
ঐ যুদ্ধের বিবরণদানকারী ঐতিহাসিক প্রফেসর ডিজি লেখেন, যায়েদ ইবনে কাসাদা ঘোড়ায় সোয়ার ছিলেন, তিনি ঘোড়াকে কেবলামুখী করে মাথা নত করে দোয়ার জন্যে হাত উঠালেন। তার ঠোঁট নড়ছিল, নাজানি কি বলে তিনি আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করছিলেন। ক্রমে তার মাথা ও হাত আসমানের দিকে উঁচু হতে লাগল। মুনাজাত শেষ না করেই তিনি বলতে লাগলেন, “হে ইসলামের রক্ষকরা! আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছেন।”
তারপর প্রায় একশত জানবাজ মুজাহিদকে পৃথক করে তাদেরকে কিছু হিদায়াত দিলেন, সে মুতাবেক তারা যে রাস্তা দিয়ে এসেছিল সে রাস্তায় চলে গেল। কিছু দূর যাবার পর তারা মোড় ঘুরে উঁচু-নিচু টিলার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিতুমীর মুসলমানদের সাথে আরেক বার যুদ্ধ করেছে। তারেক ইবনে যিয়াদ কি কৌশল অবলম্বন করে তাদেরকে কচুকাটা করেছিল সে তসবীর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তাই সে তার কমান্ডার ও ফৌজদেরকে বলে দিল মুসলমানরা হামলা করার পর যদি পিছনে সরে যায় তাহলে তাদের পিছু না গিয়ে বরং তারা যেন আরো নিজেদের পিছনের দিকে চলে আসে।
এদিকে যায়েদ তার সৈন্যদেরকে বললেন, তোমরা যে ক্লান্ত-শ্রান্ত এটা যেন দুশমনের কাছে প্রকাশ না পায়। দুশমনের যে সৈন্য এখানে রয়েছে তার অধিকাংশ অন্য যুদ্ধ হতে পলায়ন করে এসেছে। তাই তাদের দিলে বর্বরদের ভয় রয়েছে ফলে এমনভাবে লড়তে হবে যাতে তাদের সে ভয় যেন আরো বেড়ে যায়। উল্টো আমাদের মাঝে যেন ভীতির সঞ্চার না হয়।
তিতুমীর তার ফৌজকে এমন জায়গায় কাতার বন্দি করেছিলেন যে তার ডানে ও বামে উঁচু টিলা থাকার দরুন সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ ছিল। যায়েদ তার সৈন্যকে তিনভাগে ভাগ করলেন। তিনি মধ্যভাগকে সম্মুখে পাঠালেন আর নিজে পিছনে থাকলেন। অপর দিকে গ্রানাডার দ্বিগুণ সৈন্য সামনে অগ্রসর হলো, তাদের পিছনে রইল তিতুমীর নিজে।
মুসলমানরা তাকবীর দিতে দিতে দ্রুত সম্মুখে অগ্রসর হলে তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেল। স্পেনী ফৌজ বুঝতে পারল না যে, মুসলমানরা ক্রমে পিছু হঠছে। তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগল। তিতুমীর পিছু দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সামনে এগুতে নিষেধ করছিল।– হঠাৎ করে টিলার দু’ পাশ থেকে তিতুমীরের ফৌজের ওপর তীর-বর্শা বৃষ্টি শুরু হলো। এরি মাঝে টিলার পাদদেশ হতে বর্বর ঘোড় সোয়াররা দ্রুত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে স্পেনী ফৌজের পশ্চাতে চলে গেল। সেদিক থেকে তারা জীবন বাজী রেখে বীরত্বের সাথে আক্রমণ করল। তীর-বর্শার আঘাতে স্পেনী ফৌজ এলোমেলো হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল।
ঐতিহাসিক নেইলপোল লেখেন, স্পেনী ফৌজের মাঝে আগে থেকেই মুসলমানদের ব্যাপারে যে ত্রাস ছিল তা তীর-বর্শার চেয়ে বেশী কাজে লাগল। ইতিপূর্বে যেসব সৈন্য অন্য যুদ্ধ হতে পালিয়ে এসে ছিল তারা এমন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে মুহূর্তের মাঝে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল।
যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বেই যায়েদ ইবনে কাসাদা একশ জানবাজ ফৌজকে পৃথক করে শহরের পিছনে পাঠিয়ে দিয়ে ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন তারা দূর দিয়ে শহরের পিছনে গিয়ে কেল্লার দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করবে কারণ স্পেনের তাবৎ সৈন্য কেল্লার বাহিরে চলে এসেছে সম্ভবতঃ কেল্লার পাহারাতে কেউ নেই বা থাকলেও খুব কম সংখ্যক রয়েছে।
জানাবাজদের এ দল শহরের পিছনে পৌঁছে গেল। প্রাচীরের ওপর একজন দাঁড়ান ছিল সে মুসলমানদেরকে আসতে দেখে, দ্রুত ঘোড়ায় মোয়র হয়ে তিতুমীরের কাছে গিয়ে খবর পৌঁছাল যে, কিছু সংখ্যক মুসলমান পশ্চাৎ’ হতে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিতুমীর প্রায় তিনশর মত অশ্বারোহীকে শহরের পশ্চাতে পাঠিয়ে দিল আর যেসব সৈন্য এখনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি তাদেরকে হুকুম দিল তারা যেন শহরের ভেতর চলে যায়।
স্পেনী ফৌজ শহরের দিকে যাবার জন্যে পিছু ফিরতেই যায়েদ ইবনে কাসাদা তার সাথে রক্ষিত ফৌজ নিয়ে পশ্চাদ হতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হামলা যেহেতু পশ্চাৎ দিক থেকে ছিল তাই স্পেনীদের বেশ ক্ষতি হলো।
