তিতুমীরের ভাষণ এ পর্যন্ত আসতে ফৌজরা ধ্বনী শুরু করেদিল।– “তিতুমীর জিন্দাবাদ, স্পেন জিন্দাবাদ।” তাদের ধ্বনী শেষ হলে তিতুমীর তার ভাষণ আবার শুরু করলেন,
“আফ্রিকার এ বর্বর মুসলমানরা তোমাদের মুলুক ও তোমাদের ঘর-বাড়ী লুট করবার জন্যে এসেছে। তারা তোমাদের মেয়ে-বোন ও নওজোয়ান স্ত্রীদেরকে ধরে নিয়ে যাবে এবং তাদেরকে তোমাদের সামনে বেআব্রু করবে। এ ডাকাতরা দশ বার বছরের বাচ্চাদেরকেও ধরে নিয়ে যায়। যদি তাদের হাত থেকে ধন-সম্পদ, মান-ইজ্জত বাঁচাতে চাও তাহলে জীবন বাজী রেখে লড়াই কর। দুশমনের ভয় অন্তর থেকে বের করে দাও। তারা এত বড় বাহাদুর নয় যা তোমরা শুনেছ। যেসব ফৌজ পরাস্ত হয়ে পালিয়ে এসেছে তারা বলবে মুসলমানরা মানুষ নয় তারা জিন ভূত। এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা, তারা তোমাদের মতই মানুষ। পৃথিবীতে যদি কেউ বাহাদুর থেকে থাকে তাহলে তা রয়েছ তোমরা।”
তিতুমীর যাদের সম্মুখে ভাষণ দিচ্ছিল তারা জানত না যে, সে প্রথমে মুসলমানদের সাথে লড়াই করে পরাস্ত হয়ে পলায়ন করে এসেছে, আর এখন বড় বড় কথা বলে ভাষণ দিচ্ছে। সেই প্রথম মুসলমানদেরকে জিন-ভূত হিসেবে অবহিত করেছিল।
***
তিতুমীর গ্রানাডাতে পৌঁছার পূর্বেই যায়েদ ইবনে কাসাদা গ্রানাডার অদূরে কেল্লা বন্দী শহর নাগাদ পৌঁছে তা অবরোধ করে ফেললেন। প্রাচীরের ওপর তীরন্দাজ ও বর্শাধারী ফৌজ মওজুদ ছিল। তারা তীর, বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু মুসলমানদের কামান ছিল বেশ শক্তিশালী, তারা দূর হতে তীর নিক্ষেপ করতে পারত। তাই প্রাচীরের ওপর থেকে যে তীর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল তা মুসলমানদের কাছে এসে পৌঁছছিল না। কিন্তু মুসলমানরা যা নিক্ষেপ করছিল তা জায়গায় পৌঁছে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হচ্ছিল।
মুসলমানদের তাকবীর ধ্বনী স্পেনীদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করছিল। মুসলমানরা অবিরাম তীর বর্ষণ করার দরুন প্রাচীরের ওপর যে ফৌজ ছিল তা মাথা তুলে দাঁড়াবার অবকাশ পেল না। মুসলমানরা চেষ্টা করছিল দেয়ালের ওপর চড়ার বা প্রাচীর ভাঙ্গার। কিছু মুজাহিদ দরজার কাছে পৌঁছে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করছিল।
মুসলমানরা এমন স্পৃহা ও বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল যেন তারা পুরো কেল্লা প্রাচীরসহ উপড়ে ফেলে দেবে। মুসলমানদের ব্যাপারে স্পেনীদের মনে যে আতংক ছিল তা পূর্ণ মাত্রায় জেগে উঠল। মুসলমানরা যে তীর নিক্ষেপ করছিল তা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে পল্লীর ভেতর পড়ছিল। এতে শরীদের মাঝে ত্রাস আরো বেড়ে গেল ফৌজরা বিলকুল ভেঙে পড়ল। বেগতিক দেখে কেল্লাদার দরজা খুলে দেয়ার হুকুম দিল।
মুসলমানরা কেল্লার ভেতর প্রবেশ করল। তেমন ক্ষয়-ক্ষতি ছাড়াই তা মুসলমানদের করতলগত হলো।
***
একটু সম্মুখে আরো দুটো বড় নগরী। মালাকা ও মুরশিয়া। মালাকার ফৌজরা বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে কেল্লার বাহিরে কাতার বন্দি হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের এ বীরত্ব প্রদর্শন তিতুমীরের ভাষণের কারণে ছিল। কিন্তু তাদের জানাছিল না তাদের লড়াই এমন মুসলমানের সাথে যারা যুদ্ধের মাঝে খুঁজে পায় সুখ। জন্মের পরেই যাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয় যুদ্ধলড়াই।
জেনারেল যায়েদ তারেক ইবনে যিয়াদের শেখান বিশেষ কৌশল বলে স্পেনীদেরকে এমনভাবে পিছনে নিয়ে গেলেন যে তাদের পিঠ প্রাচীরে ঠেকে গেল। ঘোড়া পায়দলদেরকে পৃষ্ঠ করছিল। আর মুসলমানরা তাদেরকে চিরতরে খতম করছিল। জেনারেল যায়েদ দুশমনকে যুদ্ধে লিপ্ত করে তার কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদকে পাঠিয়ে দিলেন দরজা ভাঙ্গার জন্যে।
স্পেনীরা কেল্লা হতে বেরিয়ে সাহসীকতা ও বীরত্বের পরিচয় ঠিকই দিল কিন্তু তারা কেল্লা হেফাজতের কথা ভুলে গিয়েছিল। কেল্লার বাহিরে তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছিল অপর দিকে মুসলমানদের জানবাজ ফৌজরা কেল্লার দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করল। পরিশেষে স্পেনীরা হাতিয়ার ছেড়ে দিল। তিতুমীরের জ্বালাময়ী ভাষণ কোন কাজে আসল না। যেখানে তীর-তলোয়ার চলতে থাকে সেখানে শব্দবান বাতাসে হারিয়ে যায়।
এখন যায়েদের সম্মুখে স্পেনের অন্যতম নগরী গ্রনাডা। জেনারেল তিতুমীর কেল্লা বন্দি এ নগরীতে রয়েছে। প্রথম পরাজয়ের প্রতিশোধ ও স্পেন রাজ্যের সম্রাট হবার প্রত্যাশায় লড়াইয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখে ছিল। সেও অবরুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করা ভাল মনে করল না। তার ফৌজকে শহর হতে বের করে কিছু দূরে কাতার বন্দি করল।
যায়েদ ইবনে কাসাদার সৈন্য সংখ্যা তিতুমীরের সৈন্যের চেয়ে কম ছিল এতটুকু উল্লেখ পাওয়া যায়। তাছাড়া কার সৈন্য সংখ্যা কত ছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান কোন ঐতিহাসিকই উল্লেখ করেননি। স্পেনী ফৌজের সাথে শহরীরাও যোগ দিয়েছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কম হওয়া ছাড়াও তাদের আরেকটা দুর্বলতা ছিল যে তারা ছিল ক্লান্ত শ্রান্ত। একেতো এসেছে বহুদূর সফর করে তাছাড়া যুদ্ধ তো পর্যায়ক্রমে লেগেই রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু সম্মুখে দুশমনকে কাতার বন্দি দেখে তারা ঈমানী বলে বলিয়ান হয়ে বিশ্রামের কথা ভুলে গিয়ে দুশমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে তৈরী হয়ে গেল।
সম্মুখে দুশমন যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, যায়েদ ইবনে কাসাদা তার বাহিনীকে একটা নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে, দুশমনের সৈন্য সংখ্যা ও তাদের কি ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে তা লক্ষ্য করতে লাগলেন।
