উত্তর আফ্রিকার রাজধানীতে আমীর মুসা ইবনে নুসাইর আঠার হাজার ফৌজ একত্রিত করলেন। তিনি পূর্বেই স্পেন যুদ্ধে শরীক হবার অনুমতি খলীফা ওয়ালীদ থেকে নিয়ে রেখেছিলেন। তার ধারণা ছিল তারেক ইবনে যিয়াদ তার নির্দেশ মুতাবেক যুদ্ধ বন্ধ করে তার জন্যে অপেক্ষা করছেন, তিনি গিয়ে বিজয়াভিজানে শামিল হবেন।
কিন্তু তারেক ইবনে যিয়াদ ও তার সালাররা যে আমীরে মুসার নির্দেশ অমান্য করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন তা স্পেনের আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করছিল।
***
যায়েদ ইবনে কাসাদাকে তারেক ইবনে যিয়াদ যেদিকে প্রেরণ করেছিলেন, সেদিকে ছিল স্পেনের বড় শহর গ্রানাডা। স্পেনের নামকরা জেনারেল তিতুমীর যে তারেকের সাথে সর্ব প্রথম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিল সে গ্রানাডাতে অবস্থান করছিল। সে মুসলমানদের বিজয় খবর শুনতে পাচ্ছিল তাই গ্রানাডা রক্ষার জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল।
কেল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শহরের প্রাচীরের কোন ত্রুটি ছিল না। ফৌজের কোন অভাব ছিল না এতদ্বসত্ত্বেও ফৌজের মাঝে যুদ্ধের কোন স্পৃহা ছিল না তারা হয়ে পড়েছিল হতদ্দম। এ বিষয়টা তিতুমীরকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
রডারিকের মৃত্যু সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। রডারিককে মানুষ বড় বাহাদুর ও যুদ্ধবাজ মনে করত। তার ব্যাপারে মাশহুর ছিল, সে মহলে জালিম বাদশাহ্ আর যুদ্ধ ময়দানে মহাবীর। তাকে পরাজিত করার ক্ষমতা অন্য কোন বাদশাহর নেই। এ কারণে মানুষের ধারণা ছিল সে মরে নাই বরং জীবিত আছে এবং এক সময় ফিরে আসবে। আবার অনেকে মনে করত যদি মরেও যায় তবুও তার প্রত্যাবর্তন ঘটবে। কিন্তু এ বিশ্বাস সকলের ছিল না অনেকে আবার একথাও বলত, মুসলমানরা যে যুদ্ধবাজ তারা রডারিককে কেবল পরাজিতই করেনি বরং একেবারে দুনিয়া হতে চির বিদায় দিয়েছে।
তিতুমীরের ফৌজের মানসিক এ অবস্থা তার জন্যে বড় ভয়াবহ ছিল। সে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। তার পরাজয়কে সে বিজয়ে পরিনত করার স্বপ্ন দেখছিল। তাছাড়া সে স্পেনের বাদশাহ হবারও খাব দেখছিল। তার অধিনস্থ– অফিসারদেরকে সে এ লোভই দেখিয়েছিল। তার অফিসারদেরকে বলেছিল,
“এখন দেশে কারো হুকুমত নেই। যে বিজয়ার্জন করবে সেই হবে রাজত্বের অধিকারী। আফ্রিকার বর্বররা লুটতরাজের জন্যে এসেছে। তারা এক জায়গায় পরাজিত হলেই পলায়ন পদ হবে তারপর রাজ্যের অধিকারী হবো আমরা। তোমরা বসবে আমার জায়গায় আর আমি বসবো রডারিকের স্থানে। তবে তার জন্যে আগে প্রয়োজন হামলাকারীদেরকে বিতাড়িত করা।”
ফৌজি অফিসারদের জন্যে এতটুকু ইশারাই যথেষ্ট ছিল। তারা বড় পদের প্রত্যাশায় হামলাকারীদেরকে পরাস্ত করার জন্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগল।
তিতুমীর বলল, তোমরা সকলেই শুনেছ তারা গ্রানাডার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা তিন দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের কমজোরী পয়দা করেছে। তাদের একটি দল গ্রানাডার দিকে আসবে, তাদেরকে সমুলে ধ্বংস করতে হবে। যদি আমরা এ দলকে খতম করতে পারি তাহলে কর্ডোভার দিকে তাদের যে দল গিয়েছে তাদের ওপর আগ্রমণ করতে পারব। তারপর আমরা টলেডোর দিকে যে দল গিয়েছে তাদেরকে খতম করতে পারব। আর তাদেরকে পরাস্ত করার একটা পদ্ধতি হলো গ্রানাডার দিকে যে দল অগ্রসর হচ্ছে তাদেরকে পথিমধ্যে জায়গায়-জায়গায় আক্রমণ করা হবে যাতে তারা গ্রানাডা নাগাদ না পৌঁছতে পারে। আর যদি পৌঁছেও তাহলে তারা যেন ক্লান্ত শ্রান্ত থাকে এবং তাদের ফৌজ যেন অবশিষ্ট থাকে কম। তাহলে আমরা তাদেরকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করাতে পারব।
একজন উপরস্থ অফিসার বলল, আপনার পরিকল্পনা খুবই ভাল। আমরা মুসলমানদেরকে গ্রানাডা অবরোধ করার সুযোগই দেব না। শহর থেকে দূরে, ফাঁকা ময়দানে তাদের সাথে যুদ্ধ হবে। আপনি রডারিকের আসনে আসীন হবার কথা বলছিলেন, আপনি কি ভুলে গেছেন যে, রডারিকের এক বেটা রয়েছে। তার বর্তমানে আপনি স্পেনের মুকুট কিভাবে পরিধান করবেন?
তিতুমীর জবাব দিল, সে তো পাগল।
অফিসার তার মাতা তো পাগল নয়। তাছাড়া ইউগুবীলজি, সেও আপনার মত জেনারেল। সবসময় টলেডোতে থেকেছে। রডারিকের বিবি তাকে খুব পেয়ার করে আর ফৌজদের মাঝেও তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে ফলে সে ফৌজকে আপনার বিরুদ্ধে রানীর পক্ষে উসকে দেবে। আপনি যদি তার বিরুদ্ধে যান তাহলে সে আপনাকে হত্যা করবে বা আপনাদের পরস্পরে লড়াই শুরু হবে এতে করে দুশমন পুরো মূলক পূর্ণ মাত্রায় বিজয় করার সুযোগ পাবে।
তিতুমীর তার একথা শুনে এমনভাবে হাসতে লাগল যেন তার অফিসার একেবারে পাগলপনা কথা বলেছে। সে এর কোন জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না।
তিতুমীর বলল, এটা পরের বিষয় আগে এসো, ফৌজ ভাগ করেনি। কোথায় কত ফৌজ পাঠান যায় তা ভেবে দেখি।
গ্রানাডাতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল, তিতুমীর সে জায়গাগুলোর প্রত্যেকটিতে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করল এবং ফৌজদের খোঁজ খবর নিয়ে প্রত্যেক জায়গাতে একই ভাষণ পেশ করল,
“ঐ শাহেন শাহ্ রডারিক মৃত্যু বরণ করেছে যে, স্পেনকে নিজের পৈত্রিক সম্পদ ও তোমাদেরকে তার গোলাম বানিয়ে রেখেছিলেন। স্পেনের জমিতে উৎপাদিত প্রতিটি শস্যকণার হকদার তোমরা। তোমরা তোমাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের প্রতিটি পয়সার মালিকও তোমরা। এখন থেকে তোমাদের জমির উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক আর কেউ জোর করে নিয়ে যাবে না। তোমাদের নিজ হাতে উপার্জিত প্রতিটি জিনিসের মালিক তোমরাই হবে। তোমরা যারা ফৌজে আছ তাদের বাপ-ভাই থেকে কোন প্রকার কর আদায় করা হবে না। কোন ফৌজ যদি লড়াই এ আহত হয় তাহলে তাকে তার নির্ধারিত বেতন-ভাতা সর্বদা প্রদান করা হবে। আর কেউ যদি নিহত হয় তাহলে তার উত্তরাধিকারীদেরকে এক সাথে পূর্ণ টাকা পরিশোধ করা হবে।”
