মুগীছে রূমী ছদ্দবেশে অনেক দূর ঘুরে সমুদ্র পাড়ে গেলেন। দেয়ালের ভাঙ্গা স্থান তিনি খুঁজে পেলেন, কিন্তু যে পরিমাণ ভাঙ্গা তা দিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। আরো ভাঙ্গা লাগবে। প্রাচীরের ওপর পাহারাদার ছিল। মুগীছ চুপি চুপি ফিরে এসে চার-পাঁচজন ফৌজকে সে স্থান দেখে আসার জন্যে পাঠালেন।
প্রাচীরে ভাঙ্গা স্থানের চেয়ে তার কাছে যে গাছ রয়েছে তা দ্বারা উপকার বেশী হবে কারণ তার ডাল বয়ে প্রাচীরের ওপর যাওয়া যাবে। কিন্তু পাহারাদাররা বড় ভয়ের কারণ।
ঐতিহাসিক লেইনপোল লেখেন, মুসলমানরা যুদ্ধ বিদ্যা ও বীরত্বে নজীর বিহীন ছিল। তাদের বিজয়ের কারণ মূলত: এটাই ছিল। তাছাড়া ঐশী শক্তিও তাদের পক্ষে হামেশা ছিল। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো যা তাদের পক্ষে যেত। মুগীছে রূমী দেয়াল ভাঙ্গা ও প্রাচীরের কাছে গাছ পেয়ে ছিলেন কিন্তু তা কাজে লাগান কঠিন ছিল।
সূর্য অস্তমিত হলো, আঁধারের চাদর ঢেকে নিল কর্ডোভা নগরীকে। কিছুক্ষণ পর প্রবল বেগে শুরু হলো ঝড়-বৃষ্টি। বাতাসের তীব্রতায় গোটা নগরী থরথর করে কাঁপছিল। বৃষ্টি এত প্রবল হচ্ছিল যেন প্রস্তর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। গাছ-পালা উপড়ে পড়ার উপক্ষম। এ ভয়াবহ তুফানের হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় ছিলনা মুগীছ ও তার সাথীদের জন্যে। তাদের কোন তাবু ছিল না আর যদি থাকতও তবুও তা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যেত। ঘোড়া চিৎকার করে ছটফট করছিল। টিলার পাদদেশে গিয়ে কোন মতে জীবন রক্ষা করছিল।
মুগীছে রূমী উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, এখন উপযুক্ত সময়,এ তুফান আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। ঘোড়াতে জিন লাগিয়ে দ্রুত প্রাচীরের কাছে চল, এখন প্রাচীরের ওপর কোন পাহারাদার নেই। কোদাল সাথে নিও।
এ প্রবল বৃষ্টি ও ঝঞ্ঝা বায়ুর মাঝে সাতশত সৈন্য নিয়ে মুগীছে রূমী রওয়ানা হলেন। বিজলীর উৎকট চমক আর বজ্রের প্রকট ধ্বনিতে ঘোড়া বাগ না মেনে এদিকে সেদিকে ছটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আরোহীরা তাদের দক্ষতা বলে ঘোড়াকে বাগে রেখেছিল।
কর্ডোভার অদূর দিয়ে সাগর অতিবাহিত হয়েছে। ঘোড় সোয়ারদেরকে যেহেতু প্রাচীর হতে দূরে রাখা দরকার ছিল তাই সাগরের মাঝে হাঁটু পানিতে তাদেরকে রাখা হয়েছিল। সাগরের প্রবল স্রোত তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল।
পাহারাদাররা বুরুজের মাঝে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
মুগীছে রূমী তার চারজন সহযোগীসহ প্রাচীরের কাছে গাছ-পালা ও লতা গুলোর মাঝে অবস্থান নিলেন।
আবু আতীক : সালার! প্রাচীর ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই। আমি রশী সাথে নিয়ে এসেছি, আমাকে গাছে উঠার অনুমতি দিন।
আবু আতীক রশী নিয়ে গাছে উঠে প্রাচীরের দিকে যে ডাল ছিল তাতে গেল। কিন্তু প্রচণ্ড বাতাস তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। বৃষ্টিতে ডাল পিছলে হয়ে গিয়েছিল ফলে পা পিছলে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল। তবুও সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেয়ালের ওপর পৌঁছে প্রাচীরের খুঁটির সাথে রশী বেঁধে বাকী অংশ রশী নিচে নামিয়ে দিলে সাত-আটজন ফৌজ রশী ধরে প্রাচীরের ওপর উঠে গেল। তারা তলোয়ার উন্মুক্ত করে পাহারাদারের একটা বুরুজে পৌঁছে সে বুরুজের চারজন পাহারাদারকে অতর্কিতভাবে হত্যা করে। অনুরূপভাবে আরো কয়েক বুরুজের পাহারাদারদেরকে হত্যা করে তারা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দরজার কাছে এসে সেখানে যে পাহারাদার ছিল তাদেরকে হত্যা করে দরজা খুলে দিল। তারপর আবু আতিক বাহিরে গিয়ে মশাল জ্বালিয়ে সংকেত দেয়ার সাথে সাথে মুসলিম সোয়ারীরা তুফানের মত প্রবল বেগে কেল্লার মাঝে প্রবেশ করল।
দু’তিনজন স্পেনী ফৌজকে রাহবর বানিয়ে মশালের আলোতে মুসলিম ফৌজ কেল্লার আনাচে-কানাচে পৌঁছতে ছিল। স্পেনী ফৌজ ঘুমিয়ে ছিল তাদেরকে চিরতরে নিদ্রাপুরে পাঠিয়ে দেয়া হলো, যারা আত্মসমর্পণ করে স্বেচ্ছায় ধরা দিল তারাই কেবল কতলের হাত থেকে রেহায় পেল। শহরীরা কোন মুকাবালাই করতে পারল না।
সকাল বেলা। ঝড়-বৃষ্টি খতম হয়েছে। কেল্লা ছিল মুসলমানদের হাতে, কিন্তু কেল্লার ভেতর ছিল আরেকটা কেল্লা যা মুসলমানদের দখলে আসেনি। সেটা ছিল খ্রীস্টান পাদ্রীদের ও যাজিকাদের আবাসস্থল ও দরসগাহ। তার প্রাচীর ছিল অতি উঁচু আর দরজা ছিল লোহার।
কর্ডোভার গভর্নর রাতের আঁধারে কিছু সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সেখানে পালিয়ে গিয়েছিল। মুগীছ এলান করলেন, আত্মসমর্পণ কর তাহলে রক্ষা পাবে আর মুকাবালা করলে পাবে শাস্তি।
গভর্নর প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে জওয়াব দিল, পাদ্রীদের কাছে এসে দেখ শান্তি কে পায় তখন বুঝবে। বাঁচতে চায়লে এ শহর হতে চলে যাও।
এ সুরক্ষিত স্থানে প্রবেশের জন্যে মুগীছ বহু চেষ্টা করলেন কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পেলেন না। তাকে বলা হলো তার ভেতরে ফলমুলের এত পরিমাণ গাছ পালা আছে যে কয়েক মাসেও তা খতম হবে না।
প্রায় এক মাস পর মুগীছ জানতে পারলেন, শহরের ভেতরে যে নালা রয়েছে তার পানি দুর্গের ভেতরে যাবার ব্যবস্থা রয়েছে। দুর্গের লোকরা এ পানিই পান করছে। মুগীছ নালার মুখ বাঁধ দিয়ে ভেতরে পানি যাওয়া বন্ধ করে দিলেন, তারপর তিন-চারদিন পরেই দরজা খুলে গেল।
মুগীছ প্রথমে গভর্নরের গর্দান উড়িয়ে দিলেন। তারপর তার মাঝে যেসব ফৌজি অফিসার ছিল তাদেরকে হত্যা করলেন। তীরন্দাজদেরকে করলেন বন্দী আর যাজিকাদের করে দিলেন মুক্ত।
