মুগীছে রূমী : অধিকাংশ ফৌজ তোমার সাথে রাখ ইবনে যিয়াদ। আমাকে মাত্র সাতশত সৈন্য দাও।
সেরেফ সাত শত! মাত্র সাতশত ফৌজের দ্বারা তুমি এ কেল্লা কজা করতে পারবে? আশ্চর্য হয়ে তারেক মুগী কে জিজ্ঞেস করলেন।
জুলিয়ন : মুগীছ সাত শত ফৌজ নিয়ে এ কেল্লা করতলগত করতে পারবে কিনা তা জানি না তবে তারেক! তুমি স্বল্প ফৌজ দ্বারা টলেডো জয় করতে পারবে না। টলেডো হলো রাজধানী, স্পেনের প্রাণ কেন্দ্র তাই সহজে তা কব্জা করা যাবে না। ফলে অধিকাংশ ফৌজ তুমি তোমার সাথে নিয়ে সেদিকে রওনা হও।
মুগীছ : আল্লাহর মদদই আমার জন্যে যথেষ্ট। এ শহরে আমি প্রবেশ করবই, ইনশাআল্লাহ।
তারেক : মুগীছ! কল্পনা ও স্বপ্নজগতের কথা বল না। আল্লাহ তায়ালা তো তাকে মদদ করেন যে, বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য রেখে চেষ্টা করে।
মুগীছ : আমি যে সাতশত ফৌজ নির্বাচন করব, তা তুমি রেখে বাকীগুলো নিয়ে রওনা হয়ে যাও। রাসূল (স) আমাদেরকে বিজয় সুসংবাদ দিয়েছেন ফলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিজয়ের ব্যবস্থাও করে দিবেন। আমরা এ পরিখার পাশে কেবল বসে থাকব না।
মুগীছে রুমীর পছন্দমত সাতশত সৈন্য রেখে বাকী ফৌজ সাথে নিয়ে তারেক টলেডোর দিকে রওনা হলেন। তার সাথে জুলিয়ন ও আওপাসও গেলেন।
***
কর্ডোভার দেয়ালের ওপর তীর-কামিন, বর্শা হাতে মানুষের যে প্রাচীর সৃষ্টি হয়েছিল তা খুশীতে ফেটে গেল আর তার মাঝ থেকে ভেসে এলো বিজয় উল্লাস।
“তারা চলে গেল- তারা চলে গেল।”
“এত তাড়াতাড়ি কেন চলে যাচ্ছ মুসলমানরা।”
“আমাদের মেহমানরা চলে যাচ্ছে।”
“দাঁড়াও আমরা দরজা খুলে দিচ্ছি।”
তীর-ধনুক, বর্শা হাতে নেচে নেচে খ্রীষ্টানরা বিজয় ধ্বনী দিচ্ছিল। ফেটে পড়ছিল তারা অট্টহাসিতে। তারেক তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, মুগীছে রূমী তার সাতশত ফৌজ খন্দক হতে দূরে পশ্চাতে নিয়ে গেলেন। মুসলমানরা নিরাশ হয়ে অবরোধ উঠিয়ে নিয়েছে এ খুশীতে খ্রীস্টানরা আত্মহারা।
রাত্রে শহরে হচ্ছিল আনন্দ উৎসব। গির্জাতে যাজক-যাজিকারা খুশীতে মেতে উঠেছিল। ইসাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে শহরবাসী শুনে ছিল, মুসলমান ফৌজ চলে যেতে দেখে তারা মনে করল এ মুসীবত তাদের ওপর থেকে চলে গেল। তাই এ খুশীতে তারা আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল।
কর্ডোভা শহরের অদূরে লতা-গুল্মে ঘেরা এক সবুজ-শ্যামল বনানীতে, মুগীছে রূমী তার ফৌজ থেকে পৃথক হয়ে একাকী নিবিষ্ট চিত্তে নফল নামাজ পড়ে, আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
“হে আল্লাহ! তুমি একক সত্ত্বা, তোমার কোন শরীক নেই। হে পরওয়ার দেগার! তুমি যাকে ইচ্ছে তাকে ইজ্জত দান কর, যাকে ইচ্ছে তাকে বেইজ্জতি কর, তুমি তাবৎ কিছুর ক্ষমতাবান। আমি তোমার ওপর ভরসা করে মাত্র সাতশত সৈন্য দ্বারা এ শহর জয় করার ওয়াদা করেছি। আমি এ শহরের বাদশাহ হতে চাই না। বরং তোমার বাদশাহী এ শহরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
ওগো দয়াময়! তুমি আমাকে সাহস ও হিম্মতদান কর যাতে আমি তোমার একত্ববাদ ও মুহাম্মদ (স)-এর রিসালতের বানী নিয়ে এ কেল্লাতে প্রবেশ করতে পারি এবং বাতিলের ঘোর তমাশায় যেন হকের প্রদীপ প্রোজ্জ্বল করতে পারি। আমাকে তোমার দরবারে ও আমার সাথীদের কাছে লজ্জিত করোনা দয়াময়।
দোয়া শেষ করে চোখের পানি মুছে ফৌজদের কাছে গিয়ে বসে পড়লেন, সকল সোয়ারী তার পাশে এসে জমা হলো।
উচ্চস্বরে মুগীছে রূমী বলতে লাগলেন,
হে আমার প্রিয় সাথীরা! আমি সিপাহ্ সালারকে বলেছিলাম, আমাকে কেবল সাতশত সোয়ারী দিন আমি আপনাকে এ শহর উপহার দেব। আমি আমার দাবী ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার জন্যে তোমাদেরকে নির্বাচন করেছি। এ প্রতিশ্রুতি আমি সিপাহ সালারের কাছে করিনি বরং স্বয়ং আল্লাহর কাছে করেছি আর এ ওয়াদা তোমাদের বীরত্বের ওপর ভরসা করে করেছি। আল্লাহর কাছে অঙ্গিকার কর আমরা হয়তো এ শহরের প্রাচীর ভেঙ্গে তাতে প্রবেশ করব তানাহলে সকলে মৃত্যুর শুরা পান করব। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন, তোমরাও আল্লাহর সাথে থেকো।
স্বমস্বরে জবাব এলো,
“আমরা তোমার সাথে আছি, আমরা অঙ্গিকারাবদ্ধ হচ্ছি আমরা হয়তো এ শহর দখলে নেব তা নাহলে জীবন দিবো।”
সকাল বেলা। মুগীছে রূমী একাকী বেরুলেন কেল্লা ও শহর প্রতিরক্ষা প্রাচীর দেখার মানসে। হয়তো প্রাচীরের ওপর উঠার বা তা ভাঙ্গার উপযুক্ত কোন জায়গা পাওয়া যেতেও পারে। একজন রাখাল ভেড়া-বকরী নিয়ে আসছিল। সে মুগীছকে দেখে সালাম করে জিজ্ঞেস করল, আমাদের বাদশাহকে যারা পরাজিত করেছে আপনি কি সে ফৌজের একজন মুগীছ স্পেনী জবান জানতেন, তাই জবাব দিলেন, হা দোস্ত! তুমি আমাকে তোমার দুশমন মনে করছ?
রাখাল : আমরা খুবই গরীব। কাউকে দুশমন ভাবার ক্ষমতা আমাদের নেই।
মুগীছ রাখালের সাথে বন্ধুসূলভ আলাপ করতে করতে তার সাথে যেতে লাগলেন।
রাখাল : দাঁড়াও। তোমরা যদি এ শহরের ভেতর প্রবেশ করতে চাও তাহলে পিছন দিকে চলে যাও। সেদিকে দরিয়াও আছে খন্দকও আছে। এক জায়গায় প্রাচীর একটু ভাঙ্গা আছে। সে জায়গার আলামত হলো সেখানে একটা বৃক্ষ আছে। যার ডাল প্রাচীরের ওপর গিয়ে পড়েছে। সেথা হতে তোমরা প্রাচীর ভাঙ্গতে পারো। নিজে গিয়ে দেখে এসো, একাজ তোমরা করতে পারবে কিনা।
