কোন ঐতিহাসিকই মুসা ইবনে নুসাইরের পয়গামের পূর্ণ বিবরণ পেশ করেনি। তারা কেবল এতটুকু উল্লেখ করেছে যে, মুসা তারেককে কেবল হুকুমই দেননি বরং তাকে বাধ্য করেছিলেন তিনি যেন সম্মুখে অগ্রসর না হতে পারেন। খ্রীস্টান ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, মুসা ইবনে নুসাইর লক্ষ্য করলেন, তারেক যে তার গোলাম ছিল এখন সে স্পেনের মত এত বড় বিশাল রাজ্যের বিজয়ী হতে যাচ্ছে। সে মাত্র বার হাজার সৈন্যের মাধ্যমে রডারিকের এক লাখের চেয়ে বেশী ফৌজকে কেবল পরাজিত করেনি বরং তাদের নাম-নিশানা মিটিয়ে দিয়েছেন। ফলে ইসলামী সালতানাতেও খলীফার কাছে সে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হতে যাচ্ছে। এতে মুসার অন্তরে বিদ্বেষ জন্ম নিল। তারেককে এ নির্দেশ দেয়ার পিছনে তার এ বিদ্বেষ কাজ করেছে। তারেক কে বাধা দিয়ে নিজে বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চেয়েছিল।
কিন্তু যারা সঠিক ঐতিহাসিক বিশেষ করে মুসলমান ইতিহাসবিদরা লেখেছেন, মুসা ইবনে নুসাইরের সে নির্দেশ যথাযথ ছিল। কারণ তিনি চিন্তা করেছিলেন তারেক ইবনে যিয়াদ তরুণ যুবক ফলে তিনি আবেগের বশীভূত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে আটকে না পড়েন এবং যে এলাকা বিজয় হয়েছে তা যেন হাত ছাড়া না হয়ে যায়।
মুসা ইবনে নুসাইরের নির্দেশ সঠিক ছিল কিনা এ বিতর্কে আমরা না গিয়ে সে নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক ও তার সেনাপতিরা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ছিলেন তা আমরা তুলে ধরছি যার বিবরণ নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদরা লিপিবদ্ধ করেছেন।
তারেক কবরস্থান থেকে বেরিয়ে তার সালারদেরকে আহ্বান করে ছিলেন সালারদের সাথে তিনি জুলিয়নকেও রেখেছিলেন। কারণ জুরিয়ন ছিলেন বয়স্ক, অভিজ্ঞ অধিকন্তু তিনি খ্রীস্টান হওয়া সত্ত্বেও তার স্বজাতির বিরুদ্ধে তারেকের সাথে পূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়ে কৃতিত্ব দেখিয়ে ছিলেন।
তারেক ইবনে যিয়াদ : হে আমার বন্ধুবর! তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও। আমি বুঝতে পারছি না আমীরের এ হুকুমের মাঝে কি হিকমত লুক্কায়িত রয়েছে। একদিকে ইসলামের বিধান, আমীরের অনুসরণ কর, তার বিরুদ্ধাচরণ কর না, অপর দিকে আমরা যদি সামনে অগ্রসর না হয়ে এখানে স্থির বসে থাকি তাহলে স্পেনীরা মনে করবে যে আমাদের বিপুল পরিমাণ সৈন্য শহীদ হয়েছে তাই আমরা সামনে অগ্রসর হতে ভয় পাচ্ছি।
মুগীছে রূমী : ইবনে যিয়াদ! স্পেনীরা যা মনে করার তা করুক। কিন্তু আমাদের দেখার বিষয় হলো যে, আমরা স্পেনীদের ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছি। এখন আমরা যদি তা হতে অবতরণ করি তাহলে স্পেনীরা বিক্ষিপ্ত শক্তিকে একত্রিত করে আমাদের জন্যে বিপদের কারণ হতেপারে। আমরা দুশমনের ওপর ভীতির চাদর বিছিয়ে দিয়েছি। আমি এর মাঝে কোন হিকমত খুঁজে পাচ্ছিনে যে আমরা দুশমনকে একত্রিত হবার সুযোগ দেব।
জুলিয়ন : লক্ষ্য কর তারেক! আমীরের হুকুম তামীলের ব্যাপারে তোমাদের ধর্মের যে নির্দেশ সে ব্যাপারে আমি কিছু বলব না, আমাদের ধর্মের নির্দেশ তোমাদের মতই তবে আমীর যদি এমন নির্দেশ দেয় যদ্বরুণ ধর্ম ও ধর্মের অনুসারীদের ক্ষতি হয়, এমন হুকুম পালন করাকে আমি পাপ মনে করি। তুমি চিন্তে কর তারেক! তুমি কয়েকটা যুদ্ধে বিজয়ার্জন করলে। বিশেষ করে রডারিকের যুদ্ধে রডারিকের সাথে বড় বড় আমীর ওমারা ও অভিজ্ঞ সেনাপতিদেরকে হত্যা করেছ। স্পেন ফৌজের আসল বুহ্যকে তুমি চুরমার করে দিয়েছ। যারা পলায়ন করেছে তাদের অন্তরে রয়েছে তোমাদের ভয়। এ অবস্থায় তুমি কি তাদের একত্রিত হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই এর সুযোগ দিবে, না তাদের পিছু ধাওয়া করবে যাতে তারা স্বস্তির খাস না নিতে পারে?
যায়েদ ইবনে কাসাদা : আমীরে মুসা এখান থেকে অনেক দূরে। ফলে এখানকার বাস্তব চিত্র ও স্পেনী ফৌজদের অবস্থা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত নন।
জুলিয়ন : তাছাড়া এ ইসাজা শহরের ব্যাপারে তুমি লক্ষ্য কর। এটা স্পেনের চৌরাস্তা, এখান থেকে একটা রাস্তা কর্ডোভা, আরেকটা গ্রানাডা, তৃতীয় আরেকটা রাস্তা সালাগা আর চতুর্থ রাস্তা গেছে স্পেনের রাজধানী শাহী মহল টলেডোর দিকে। তুমি যদি এ চারটি শহর দখলে আনতে পারো তাহলে মনে কর যে পুরো স্পেন তোমার দখলে এসে গেল। তুমি সম্মুখে অগ্রসর হও, আমীর যদি নারাজ হন তাহলে আমি তার সাথে কথা বলব।
তারেক : আমি নিজেও তার সাথে আলাপ করতে পারি কিন্তু আলাপ আলোচনা পরে হবে। এখন আমরা সম্মুখে অগ্রসর হবো।
***
আমীরের হুকুমএড়িয়ে অন্য শহরের দিকে অগ্রসর হবার ফায়সালা তারেক গ্রহণ করলেন। তার ফৌজকে তিনি দু’ভাগে ভাগ করে এক ভাগের সেনাপতি যায়েদ ইবনে কাসাদাকে নিয়োগ করে তার নেতৃত্বে মালকুন শহরের দিকে ফৌজ পাঠালেন। অপরভাগের নেতৃত্ব তারেক নিজের হাতে রেখে কর্ডোভার দিকে অগ্রসর হলেন।
তারেক ইবনে যিয়াদ কর্ডোভা অবরোধ করলেন, কিন্তু প্রথম দিনই অনুধাবন করতে পারলেন শহরে প্রবেশ করা বড় কঠিন। প্রাচীর ও দরজার কাছে যাওয়া আত্মহত্যার নামান্তর। কেল্লার চতুরপার্শ্বে ছিল পরিখা। তারেক সর্বোপরি চেষ্টা করলেন, কেবল একটা চেষ্ঠার বাকী ছিল তা হলো অবরোধ সময় বৃদ্ধি করা। নয়দিন অতিবাহিত হয়ে গেল।
তারেক : মুগীছ! তুমি এখানেই থাক, আমি চললাম। আমরা তো আমীরের হুকুম উপেক্ষা এ কারণে করলাম যেন স্পেনী ফৌজ একত্রিত না হতে পারে এবং তারা যেন স্বস্তি না পায়। এখানে যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে কয়েক মাস লেগে যাবে। এখানে অবরোধ করে বসে থাকলে চলবে না। আমি রাজধানী টলেভোর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এখানে যে সৈন্য আছে তা দু’ভাগে ভাগ করছি।
