বৃদ্ধ : কেল্লা বহুত মজবুত। প্রাচীর এত শক্ত যে আপনি কোথাও তা ভাঙতে পারবেন না। আপনার সিপাহীরা প্রাচীরের কাছেই যেতে পারবে না কারণ শহরের আবালবৃদ্ধ বণিতা, নারী-পুরুষ সকলে তীর বর্শা নিয়ে প্রাচীরের ওপর সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকবে। বড় পাদ্রী শহরবাসী ও ফৌজদেরকে পূর্ণদ্যমে তৈরী করে রেখেছে। যে সকল ফৌজ প্রথম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছে তারা জীবনবাজী রেখে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছে।
তারেক : তুমি কে?
বৃদ্ধ :আমি পাদ্রী।
তারেক : তুমি আমাকে এবং আমার দু’সালারকে ঐ মেয়েদের মাধ্যমে হত্যা করার মানসে এসেছিলে না কি?
বৃদ্ধ : হ্যাঁ সিপাহ সালার! আমিঐ ইরাদাতেই এসেছিলাম তবে এখন অন্তর থেকে সে ইরাদা ত্যাগ করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন।
তারেক খঞ্জর হাতে আস্তে আস্তে বৃদ্ধের কাছে এসে পূর্ণ শক্তি দিয়ে বৃদ্ধের বুকের ওপর আঘাত হানলেন।
খঞ্জর বৃদ্ধের বুক হতে বের করতে করতে বললেন,সাপ কখনো দংশনের ইচ্ছে পরিত্যাগ করতে পারে না।
বৃদ্ধ হস্তদ্বয় বুকের ওপর রেখে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ল। তারেক দারোয়ানকে ডেকে বললেন, “আমাদের অবস্থান থেকে দূরে এ লাশ ফেলে আসবে। আর তিন ললনার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন তাদেরকে যেন পৃথক পৃথকভাবে হেফাজতে রাখা হয়। তারপর তিনি জুলিয়ন, আওপাস ও অন্যান্য সালারদেরকে ডেকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পেশ করলেন।
ফজরের পরই কালো ইসাজার দিকে রওনা হলো। সে সময় নিয়ম ছিল প্রধান সেনাপতি ইমামতি করতেন সে অনুপাতে তারেক ইবনে যিয়াদ নামাজের ইমামতি করে ফৌজদের উদ্দেশ্যে বললেন, সম্মুখের শহর একেবারে সহজে করতলগত হবে না বরং বেশ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং বেগ পেতে হতে পারে। এভাবে তিনি বেশ তেজদ্বীপ্ত ভাষণ দিলেন।
ইসাজার বড় রাহেব এবং কয়েকটা লড়াই এর অভিজ্ঞ কেল্লাদার এ খবরের অপেক্ষায় ছিল যে, মুসলমানদের সিপাহসালারসহ আরো দু’জন সালার হত্যা হয়েছে ফলে তার সৈন্যরা অভিযান মূলতবী করেছে। সে সাত সকালেই কেল্লার প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে কারমুনার দিকে নিষপলক চেয়েছিল। তার আশা ছিল তিন লাড়কীর ঘোড়া গাড়ী দেখতে পাবে, সূর্য ক্রমে ওপরে উঠছিল কিন্তু ঘোড়ার গাড়ী নজরে আসছিল না।
দূর আকাশে সে ধূলি উড়তে দেখতে পেল। কিন্তু এত ধূলীকণা ছোট কাফেলার দরুন উড়বে না। সে ধূলিধূসর দিগন্তে চেয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে দেখতে পেল অশ্বপ্রতিচ্ছবি।
“দুশমন আসছে” কেল্লাদার প্রাচীর হতে উচ্চস্বরে আওয়াজ দিল।
কেল্লার ফৌজ পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। ফৌজের কমান্ডাররা বিগত রাতে ফায়সালা করে ছিল, কেল্লার মাঝে বন্দি হয়ে পড়ার চেয়ে খোলা ময়দানে আক্রমণকারীদের মুকাবালা করা হবে। তাদের ধারণা ছিল যেহেতু মুসলমানদের প্রধান সেনাপতিসহ আরো দু’জন সেনাপতি নিহত হবে তাই মুসলমান সম্মুখে অগ্রসর হবে না তারপরও তারা নিজেদের ফৌজ তৈরী রেখে ছিল। আর মনে মনে খুশী হচ্ছিল মুসলমানরা যদি তাদের সিপাহসালার ছাড়া হামলা করে তাহলে তারা তাড়াতাড়ি মারা যাবে। তারা এটা কখনো ধারণা করতে পারেনি যে, মুসলমানদের সিপাহসালার এত সুন্দরী ললনাকে প্রত্যাখ্যান করবে আর সে তাদের কতলের হাত থেকে বেঁচে যাবে।
দুর্গপতির ঘোষণায় শহরের তামাম দরজা খুলে গেল আর সিপাহীরা অত্যন্ত দ্রুতবেগে কেল্প ছেড়ে বাহিরে চলে এলো। দামামা বেজে উঠল, ফৌজের মাঝে যুদ্ধ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হলো।
তারেক ইবনে যিয়াদের বাহিনী ক্ৰমে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে চলল। সম্মুখ দলের কমান্ডার দেখল কেল্প হতে সৈন্যরা বের হয়ে ময়দানে কাতার বন্দি হচ্ছে। এ অবস্থা দেখে সে তার দলকে দাঁড় করিয়ে অশ্ব হাঁকিয়ে তারেক ইবনে যিয়াদের কাছে পৌঁছে ঘটনা বর্ণনা করল।
তারেক তার সৈন্য বাহিনীকে তিন ভাগেভাগ করলেন। এক ভাগের দায়িত্ব মুগীছে রূমী আরেক ভাগের দায়িত্ব যায়েদ ইবনে কাসাদাকে দিলেন আর এক দলের দায়িত্ব নিজে রাখলেন। দায়িত্বশীলদেরকে তৎক্ষণাৎ দিক নির্দেশনা দিলেন। মুগীছে রূমীকে তিনি শহরের এক প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে শহরের পশ্চাতে রাখা।
যায়েদ ইবনে কাসাদাকে বামদিকে প্রেরণ করলেন সাথে নির্দেশ দিলেন দুশমনের নজর এড়িয়ে যথা সম্ভব তাদের কাছে পৌঁছে যাবে। আর হুকুম না দেয়া পর্যন্ত হামলা করবে না। তারেক নিজে দুশমন যে দিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিকে গেলেন। তিনি দুশমনের কাছে পৌঁছা মাত্রই তারা আক্রমণ করে, বসল।
ঐতিহাসিক লেইনপোল লেখেছেন, ইসাজার ফৌজের সে হামলা একেবারে মামুলী ছিল না। বরং অত্যন্ত শক্তছিল এবং আক্রমণের অবস্থা দেখে প্রতীয়মান হয়, তাদের লড়াই এর স্পৃহা ছিল আর সে শহর হেফাজতে তারা হয়েছিল দৃঢ় প্রতিক্ষ। প্রফেসর দুজি লেখেছেন, খ্রীস্টান ফৌজরা এত শক্ত আক্রমণ করেছিল যে তা সামাল দেয়া তারেকের জন্যে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তারেকের সৌভাগ্য যে কয়েক হাজার নতুন বর্বর ফৌজ এসে তার ফৌজে যোগ দিয়ে ছিল তানাহলে ইসাজার ফৌজরা তার পরাজয় ডেকে আনত। বর্বর কওম জন্মগত ভাবেই লড়াকু-যুদ্ধবাজ তাই সহজে পরাজয় স্বীকার করে নেয়া তাদের জন্যে অসম্ভব ছিল ফলে তারা জীবনবাজী রেখে লড়ছিল কিন্তু তাদের অনেক ফৌজ মৃত্যু কোলে ঢলে পড়েছিল।
