ঈসায়ী ফৌজের জেনারেল মুসলমানদের পশ্চাৎ হতে আক্রমণ করার জন্যে তার বাম পার্শ্বের দলকে বামদিকে পাঠিয়ে দিল। সৈন্যদল পেছনে যেতে লাগল কিন্তু তাদের জানা ছিল না যে সেদিকে মুসলমানদের একটি দল রয়েছে। মুসলমান সৈন্যদলের কমান্ডার খ্রীস্টান ফৌজ আসতে দেখে তার সৈন্য বাহিনীকে আরো পিছনে নিয়ে গেলেন যাতে খ্রীস্টানরা তাদেরকে দেখতে না পায়।
খ্রীস্টান বাহিনী আরো কিছুটা সম্মুখে গিয়ে ডানদিকে ফিরে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল এরি মাঝে যায়েদ ইবনে কাসাদা তার বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দুশমনরা প্রস্তুতি নেয়ারই সুযোগ পেল না। এতে তারেক ইবনে যিয়াদের পশ্চাৎ একেবারে নিরাপদ হয়ে গেল।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরে দাঁড়িয়ে সাধারণ জনতা এ ভয়াবহ যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিল। তারা মুগীছে রূমীর বাহিনী দেখতে পেল। তারা বাম দিকে শহর হতে কিছুটা দূরে তারেক ইবনে যিয়াদের হুকুমের অপেক্ষায় ছিল। একজন শহরী দ্রুত গিয়ে মুগীছে রূমীর সংবাদ তাদের জেনারেলকে দিলে, জেনারেল তার ডান দিকের বাহিনীকে মুগীছের দিকে পাঠিয়ে দিল।
মুগীছে রূমী ছিলেন অত্যন্ত চৌকস ও সচেতন। তিনি তার কয়েকজন সৈন্যকে খবর নেয়ার জন্যে সম্মুখে পাঠিয়ে ছিলেন তারা দৌড়ে এসে তাকে সংবাদ দিল যে দুশমনের কিছু ফৌজ এদিকে আসছে। মুগীছ তারেক ইবনে যিয়াদের নির্দেশের অপেক্ষা না করে তার বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হবার হুকুম দিলেন। তার কাছে বেশ যথেষ্ট পরিমাণ অশ্বারোহী ছিল।
মুগীছে রূমী সামনা-সামনি না লড়ে তার সৈন্য বানিীকে আরো সম্মুখে নিয়ে দুশমনের পার্শ্ব থেকে হামলা করলেন। তাদের আক্রমণ এত কঠিন ছিল যে, দুশমন পিছু হঠতে লাগল। তাদের পিছনে ছিল শহরের প্রাচীর। তারা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করছিল কিন্তু মুগীছের বাহিনী তাদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করল যে তারা পিছু হটতে হটতে তাদের পিঠ দেয়ালে লেগে গেল। তারা সম্মুখে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু মুসলমানরা তাদের সে চেষ্টা সফল হতে দিল না। বর্বর মুসলমানরা একান্তভাবে জীবনবাজী রেখে লড়ে গেল। যুদ্ধ তিনভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তারেক ইবনে যিয়াদ সবচেয়ে বিপদে ছিলেন। তার দু’পাশের সৈন্যরা পৃথক পৃথকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। কোন কৌশল অবলম্বনেরও কোন রাস্তা ছিল না। তার প্রতিটি সৈন্য নিজে নিজে লড়াই করছিল। তার কোন রিজার্ভ বাহিনী ছিল না। তারেক নিজে একজন মামুলী সৈনিকের মত লড়ছিলেন। তার ফৌজের ক্ষতি হচ্ছিল ব্যাপকভাবে।
যায়েদ ইবনে কাসাদা যেহেতু দুশমনের পশ্চাৎ হতে আক্রমণ করেছিলেন এ কারণে দুশমনের লোকসান বেশি হয়েছিল। যায়েদ ইবনে কাসাদা ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ সালার। তিনি দূর থেকে দেখতে পেলেন তারেক ইবনে যিয়াদ বেশ বিপদে আছেন তাই তিনি তার সৈন্যের এক চতুর্থাংশ তারেকের সাহায্যে পাঠিয়ে দিলেন এতে তারেকের বিপদ কিছুটা হালকা হলো। কিন্তু খ্রীস্টান ফৌজরা তাদের পবিত্র নগরী রক্ষার্থে জীবনবাজী রেখে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করছিল।
মুগীছে রূমী ঈসায়ী ফৌজকে যে ফাঁদে ফেলেছিলেন এতে তাদের বেশ লোকসান হচ্ছিল। তারা প্রতিপক্ষের ঘোড় ও প্রাচীরের মাঝে বন্দী হয়ে পড়েছিল। তারা অনেকেই ঘোড়ার পিট হতে পড়ে পদতলে পৃষ্ট হচ্ছিল। অশ্বারোহীরা এমন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, তীর-তরবারী চালানো একেবারে মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা পরস্পরে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছিল।
দুশমনের ঘোড়া অক্ষত রাখার ব্যাপারে তারেকের বিশেষ নির্দেশ ছিল যাতে ঐ ঘোড়া প্রয়োজনে নিজেদের কাজে আসে কিন্তু এ পরিস্থিতিতে মুগীছে রূমী ঘোড়ার পরওয়া করলেন না। দুশমনের ঘোড়া জখম করার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশের ফলে বর্বর মুসলমানরা আরোহীর সাথে সাথে ঘোড়ার শরীরও তীর বর্শা দিয়ে আঘাত হানতে লাগল। এতে করে যে ঘোড়া আহত হলো সে তার আরোহীর বাগ মানলা না। কিছু অশ্ব ও আরোহী অন্য অশ্বের পদ তলে পৃষ্ট হলা।
দুশমনরা পালাতে লাগল। কিন্তু খুব কম সংখ্যই পালাতে পারল। মুগীছ তার কিছু ফৌজ তারেকের মদদে পাঠিয়ে দিলেন। এতে তারেকের বিপদ আরো হালকা হয়ে গেল এবং যুদ্ধের হাল যা খ্রীষ্টানদের পক্ষে যাচ্ছিল তা ঘুরে গেল।
ইতিহাস খ্রীষ্টান ফৌজকে জানায় সাধুবাদ; কারণ তারা যে সাহসীকতা ও …দৃঢ়তার সাথে লড়ে মুসলমানদের যে পরিমাণ ক্ষতি করেছিল তা বেশ ব্যাপক ছিল। মুসলমানরা এত পরিমাণ ক্ষতির জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তারা প্রথমপর্যায়ে বিজয়ের খুশীতে ছিল। সাঁঝ নাগাদ খ্রীস্টানরা পরাজিত ঠিকই হলো কিন্তু মুসলমানদের মাথা থেকে এ বিষয়টা বের করেদিল যে তারা যেদিকেই যাক বিজয় তাদের অতি সহজে, পদচুম্বন করবে না।
একদিকে দিবসের সূর্য ডুবছিল অপরদিকে খ্রীস্টানদের বাহাদুরীর সূর্য হলো অস্তমিত। তাদের দুর্গপতি, তামাম জেনারেল নিহত হলো। সিপাহীদের মাঝে খুব স্বল্প সংখ্যক জীবিত রইল। তারেকের সৈন্য বাহিনীর ক্ষয়-ক্ষতির হিসেব যখন তাকে দেয়া হলো তখন তিনি একেবারে ‘খ’ মেরে গেলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্লান্ত-শ্রান্ত যে, তার শরীরের গ্রন্থিগুলো খুলে গেছে। পুরো দিন একজন মামুলী সৈনিকের মত লড়াই করেছেন।
