মেয়েটি : আমি যা শুনেছিলাম তা ভুল প্রমাণিত হলো। আজ আমি সর্ব প্রথম এমন ব্যক্তি দেখলাম যে আমার মত সুন্দরী যুবতী ললনাকে ফিরিয়ে দিল। আমি সিপাহসালারকে হত্যা করতে এসেছিলাম। আমার সাথে যে দু’জন লাড়কী এসেছে। তারাও একই উদ্দেশ্যে এসেছে আর ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি যে আমাদের সাথে এসেছে, সে আমাদের কোন আত্মীয় নয়। তাকে আমাদের বড় পাত্রী ও কেল্লাদার পাঠিয়েছে। তারা আমাদেরকে বলেছিল, তোমরা এভাবে মুসলমানদের প্রধান সেনাপতির কাছে পৌঁছবে। তারপর সে তোমাদের সৌন্দর্য মাধুরী ও যৌবন সুরা দেখে খাছ কামরাতে তোমাদেরকে স্থান দেবে, আর তোমরা সুযোগ বুঝে, তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দেবে, তারপর মুখ চেপে ধরে গর্দান কেটে ফেলবে। অতঃপর কামরা হতে চুপিসারে নিরাপদে বেরিয়ে আসবে। এমনিভাবে বাকী দু’জন মেয়েরও দু’জন সালারকে কতলের প্লান ছিল। তুমি তোমার সিপাহসালারকে বল, তিনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন তা আমি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত রয়েছি।
তারেক : তাদেরকে কোন শাস্তি দেব না। তারা স্বেচ্ছায় আসেনি তাদেরকে পাঠান হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি তাদেরকে নিয়ে এসেছে তাকে সকালে ফজর নামাজের পর কতল করা হবে।
মেয়েটি যখন অরেক ইবনে যিয়াদের ফায়সালা শুনল, তখন বলল, সে আরো কিছু কথা বলতে চায়। তারপর সে বলতে লাগল,
“সিপাহ্ সালার হয়তো আশ্চর্যবোধ করছেন, এ মেয়ে কতবড় বীরাঙ্গনা দুঃস্বাসহী যে, একজন বিজয়ী সিপাহসালারকে কতল করতে এসেছে। আমি এত বড় বীরঙ্গনা নই তবে আমাদেরকে জোরপূর্বক যে জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়েছে তাতে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আমাদের ধর্মের লোক আমাকে এবং আমার সাথীদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে কারণ আমরা ধর্ম যাজিকা আর আমাদের দিবা রজনী অতিবাহিত হয় ইবাদতখানায়। আমাদেরকে কুমারী মনে করা হয় এবং একজন যাজিকা ও যাজক আজীবন অবিবাহিতই থাকে কিন্তু বস্তুতঃ যাজক-যাজিকা কেউই কুমার থাকে না। আমাদের ইবাদত খানার সাথেই আমাদের আরামগাহ্। তাতে দিন-রাত সর্বদা চলে অপকর্ম, পাপাচার। ফৌজের বড় বড় অফিসাররাও সেথায় আসে, শরাব পান করে উন্মাদ হয়ে আমাদের সাথে রাত যাপন করে কিন্তু দিনের আলোতে গির্জা ও ইবাদত খানাতে নসীহত ও প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষকে খোদার ভয় দেখান হয়। তাদেরকে এ ধারনা দেয়া হয় যে পাদ্রী ও যাজিকারা আসমান থেকে অবতারিত নিষ্পাপ ফেরেশতা। এ ধর্ম গুরুরা টলেডোর শাহী মহলকে নিজেদের করতলগত করে রেখেছে। রডারিকের মত জালেম বাদশাহও তাদেরকে ভয় পেত।
তারেক ইবনে যিয়াদ : ভয় পেতনা, বরং ধর্ম গুরুদের সামনে মাথা নত এ কারণে করত যাতে তারা আকর্ষণীয়, সুন্দরী যুবতী যাজিকা তার দরবারে পেশ করে।
তারেক তরজুমানকে বললেন, এ মেয়ের কথা বেশ অর্থবহ তাকে বল, সে যেন আরো কিছু কথা আমাদেরকে শুনায়।
মেয়ে : ইসাজা খ্রীস্টানদের একটি পবিত্র শহর। কিন্তু প্রার্থনালয়ে যেসব যাজিকারা রয়েছে তারা অধিকাংশ ইহুদীদের কন্যা। আমিও ইহুদী। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী। আমার বয়স যখন তের/চৌদ্দ বছর তখন আমাকে জোরপূর্বক এক গির্জাতে নিয়ে গিয়ে বৈরাগীনি বানানো হয়। আপন বাবা, মা, ভাই, বোন বাড়ী ঘর তো আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়ে ছিলোই অধিকন্তু পাদ্রীরা আমার সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছে তা হলো আমার কুমারীত্ব। তবে মানুষ আমাকে কুমারী যাজিকা বলে সম্মান করত। আমি যে কাহিনী বর্ণনা করলাম তা প্রত্যেক বৈরাগিনীর জীবন বৃত্তান্ত।… আমি সিপাহসালারের কাছে আবেদন পেশ করছি খ্রিস্টানরা যে শহরকে পবিত্র মনে করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেন এবং পারাশীতে নিমজ্জিত শহরের নাম-নিশানা মিটিয়ে দেন।
মুসলমানদের প্রধান সেনাপতিকে আমার এ শরীর ছাড়া আর কিছু ইনয়াম হিসেবে পেশ করতে পারি না। আমার একান্ত ইচ্ছে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি আর তিনি আমাকে শাদী করুন, কিন্তু আমার এ বাসনা পূর্ণ হতে দেব না। কারণ আমিএকজন অপবিত্র মেয়ে আর সিপাহসালার খোদা প্রিয় ও অনেক বড় সম্মানী ব্যক্তি। আমি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলছি বিজয় তোমাদের অবশ্যম্ভাবী। পরাজয় ঐ সকল ধোকাবাজদের হয় যারা ধর্মের নেবাস পরিধান করে অগোচরে পাপের সাগরে হাবুডুবু খায়।
তারেক ইবনে যিয়াদ তরজমানকে লক্ষ্য করে বললেন, “এ লাড়কীকে ঐ লাড়কীদের কামরাতে নিয়ে যাও আর এদের সাথে যে আদমী এসেছে তাকে এখানে নিয়ে এসো।”
মেয়েটি চলে গেল। মেয়েদের সাথে যে বৃদ্ধ এসেছিল সে তারেকের কামরাতে প্রবেশ করল। যে খঞ্জর মেয়েটি তারেকের পদতলে রেখেছিল তা তারেক ইবনে যিয়াদের হাতে ছিল।
“তুমি কি এ খঞ্জর দ্বারা আমাকে হত্যা করতে চাও? তাকের খঞ্জর দেখিয়ে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন।”
বৃদ্ধ ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল। তার চোখগুলো হয়ে ছিল এত বড় বড় যেন মনি বেরিয়ে আসবে।
তারেক ইবনে যিয়াদ দুভাষীর মাধ্যমে বৃদ্ধকে লক্ষ্য করে বললেন, যে ব্যক্তি মহিলাদেরকে ময়দানে অবতরণ করায় তার এ অবস্থাই হয় যা তোমার হচ্ছে। আমরা অসৎ ও বাতিলের মুলোৎপাটনে এসেছি। আমরা আল্লাহ তায়ালার এ জমিনকে পাপমুক্ত করতে এসেছি আর তোমাদের ধর্মগুরু ও ফৌজের সালাররা সে পাপের আশ্রয় নিয়ে হকের রাস্তায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করছে। আমি যুদ্ধের ময়দানে তীর বা তলোয়ারের দ্বারা মৃত্যু বরণ করব। আমি যে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে এ কুফরী রাজ্যে এসেছি সে আল্লাহ আমাকে গোনাহর কাজে লিপ্ত রেখে এক আওরতের হাতে মারবেন না। তুমি আমাকে বল, ইসাজাতে সৈন্য সংখ্যা কত, কেল্লার প্রাচীর কেমন এবং এমন কোন রাস্তা আছে কি যা দিয়ে কেল্লার ভেতর আমরা প্রবেশ করতে পারব?
