এক বুরুজ হতে পাহারাদারদের কমান্ডার জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কারা?” বাহির থেকে আওয়াজ দেয়া হলো, “আমি সিওয়াস্তার গভর্নর জুলিয়ন। মশাল নিয়ে এসে আমাকে বাঁচাও।”
গভর্নর জুলিয়ন সম্পর্কে তাদের জানা ছিল এবং ইতোপূর্বে তারা এনাম শুনেছে।
কামান্ডার : তুমি কোথা কেথে এলে?
জুলিয়ন : দরজা খুলে আমাকে রক্ষা কর। সাথে যারা রয়েছে তারা আমার রক্ষীবাহিনী। প্রায় সাত-আটশ সিপাহী হালাক হয়ে গেছে। আমরা রডারিকের সাথে প্রধান যুদ্ধে শরীক ছিলাম এবং কোন মতে জানে বেঁচে পালিয়ে এখানে এসেছি। কেল্লা অবরোধ ছিল একারণে আমরা লুকিয়ে ছিলাম। আজ অবরোধ উঠতেই আমরা তোমাদের কাছে এসেছি। আমি আহত। আমার সৈন্যদের মাঝেও বিশ পঁচিশজন আহত। আমরা বড় ক্লান্ত-শ্রান্ত। ক্ষুধা-তুষ্টে আমাদের জীবন উষ্ঠাগত। তাড়াতাড়ি দরজা খোল।”
জুলিয়নের পোষাক-আশাক ও তার চেহারার অবস্থা সাক্ষী দিচ্ছিল যে অনেক মুসীবত ভোগ করেছে। তার সাথে যে দু’শ আড়াইশ ফৌজ ছিল তারে অবস্থাও চিল অত্যন্ত করুণ।
ওপর থেকে একাধিক মশালের আলোতে দেখা হলো, প্রকৃত অর্থেই সে জুলিয়ন।
অধরাত্রের পরের সময়। কেল্লার জিম্মাদারকে জাগানোর প্রয়োজন না মনে করে দরজা খুলে দেয়া হলো।
দু’শ আড়াইশ ফৌজসহ জুলিয়ন ভেতরে প্রবেশ করে সৈন্যদের ইশারা করতেই তারা পাহারাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকল দরজা খুলে দেয়া হলো। কেল্লার ফৌজ অবরোধ উঠে যাবার আনন্দে শরাব পান করে বিভোর ঘুমাচ্ছিল! মুসলমান অবরোধ তুলে নিয়ে বেশী দূরে যায়নি। তারা জুলিয়নের ইশারার অপেক্ষায় অদূরেই কোথাও লুকিয়ে ছিল। রাতের চাদর তাদেরকে ঢেকে নিয়ে ছিল।
এটা ছিল জুলিয়নের কৌশল যা সে তারেকের সাথে পরামর্শ করে তৈরী করে ছিল।
ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, জুরিয়নের সাথে যে দু’শ আড়াইশ ফৌজ ছিল তারা সকলে ছিল ইউনানী ও জুলিয়নের নিজস্ব ফৌজ। কিন্তু অন্য ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, তারা সকলেই ছিল মুসলমান। তারা তাদের লেবাস পরিবর্তন করে নিয়ে ছিল। এটাই সঠিক বলে মনে হয় কারণ জুলিয়নের সাথে তার নিজস্ব ফৌজ ছিল না।
পাহারাদারদেরকে হত্যা করে দরজা খুলে মশাল হাতে নিজে জুলিয়ন প্রাচীরের ওপর গেল। মশাল উঁচু করে ডানে-বামে ঘুরাতে লাগল। তারেক ইবনে যিয়াদ এরই অপেক্ষায় ছিলেন। তার ফৌজ পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। তারেক ঘোড়া দৌড়ানোর সাথে সাথে তার ফৌজরা প্লাবনের ন্যায় কেল্লার দিকে ছুটে চলল এবং খোলা দ্বার দিয়ে সোজা কেল্লার ভেতর চলে গেল। কেল্লাভ্যন্তরে হৈ-হুঁল্লোড় শুরু। হয়ে গেল। কেল্লার ফৌজ জাগ্রত হয়ে দেখতে পেল তারা কয়েদী।
মুজাহিদদের ফৌজ কেল্লায় প্রবেশ করার পর কেল্লার কিছু ফৌজ ও অফিসার পলায়ন করার সুযোগ পেয়েছিল। বিশ-পঁচিশ মাইল সামনে একটা কেল্লা বন্দী শহর ছিল এবং ঐ শহর ছিল খ্রিস্টানদের ধর্মের কেন্দ্র। সেখানে ছিল একটা বড় গির্জা তার সাথেই ছিল পাঠশালা। এছাড়াও সেখানে আরো বেশ কয়েকটা ছোটগির্জা ও খানকা ছিল।
এটা সে সময়ের কথা যখন পাদ্রীরা আদর্শচ্যুত হয়ে শাহানশাহী জীবন যাপন করছিল এবং ধর্মের মাঝে নিজেদের পক্ষ হতে কমবেশ করছিল। ধর্মের ব্যাপারে তারা চরমভাবে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল। তাদেরকে বাধা দেয়ার ব্যাপারে স্বয়ং বাদশাহও সাহস করতেন না। তারা সাধারণ জনগণের কাছে নিজেদেরকে বাহ্যত ভাবে পূত-পবিত্র প্রমাণিত করে রেখেছিল। তারা জনগণকে অধীনতার রশীতে। এমনভাবে বেঁধে রেখেছিল যেভাবে এখন বর্তমানে পাকিস্তানে ভন্ডপীররা তাদের মুরীদদের রেখেছে। স্বয়ং খ্রিস্টান ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, পাদ্রীরা গির্জা ও খানকার মত ইবাদত খানাকে তারা ভোগ-বিলাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। সেথায় গোত্রপ্রীতি ও শরাব পানের আড্ডা খানা ছিল। তারপরও সে শহরকে পবিত্র স্থান মনে করা হতো।
***
তারেক ইবনে যিয়াদের এখন লক্ষ্য সম্মুখস্থ শহর ইসাজা। জুলিয়ন ও আওপাস তাকে আগেই জানিয়ে দিয়ে ছিলেন, ইসাজা খ্রিস্টানদের অত্যন্ত পবিত্র নগরী ফলে তা সহজে হস্তগত করা যাবে না। শহরের নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ সকলে জান প্রাণ দিয়ে লড়াই করবে।
জুলিয়ন তারেককে মৌখিকভাবে যা বলছিল তা কার্যতঃ ইসাজা শহরে হচ্ছিল। রডারিকের সাথে যুদ্ধে যেসব সৈন্য পালিয়ে এসে সাধনা ও কারমুনাতে আশ্রয় নিয়েছিল। এ দু কেল্লা মুসলমানরা দখল করার পর তারা পলায়ন করে ইসাজায় পৌঁছে ছিল। সে শহরে খবর পৌঁছে ছিল মুসলমানরা একেরপর এক বিজয়ার্জন করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। মানুষের মাঝে ভয় সৃষ্টি হয়েছিল ঠিক কিন্তু যুদ্ধের স্পৃহাও পয়দা হয়েছিল। তাদেরকে বলা হয়েছিল তাদের মুলকে কোন রাজা বাদশাহর ফৌজ হামলা করেনি বরং এমন ধর্মের দস্যু দল হামলা করেছে যারা খ্রীস্টান ধর্মের মত সত্য ধর্মকে খতম করে দিবে। পিছনের শহরের ফৌজরা যখন পলায়ন করে ইসাজাতে পৌঁছতে ছিল তখন সেথাকার লোকরা তাদেরকে ভর্ৎসনাবানে বিদ্ধ করছিল, তাদের তিরস্কারের ভাষা ছিল এরূপ :
“এসব বুজদিলদেরকে শহর থেকে বের করে দাও।”
“বেহায়া ও নির্লজ্জের দল! সাধনা ও কারমুনার বেটীদেরকে দুশমনের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে।”
“আমাদের বেটীদেরকে আমরা নিজেরাই হেফাজত করব। এ বুজদিলদেরকে জীবিত রেখে কোন লাভ নেই।”
