তারেক বললেন, তাদের সকলকে ভালভাবে বুঝিয়ে দাও, আমরা এমন ধর্ম নিয়ে এসেছি যা দুর্বলকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করে। আর যাকে তাকে বাদশাহ হবার অনুমতি প্রদান করে না। আমাদের ধর্মে লুটতরাজের কোন অনুমতি নেই। কোন রমণীর ইজ্জত হরনের শাস্তি হলে তাকে প্রস্তারাঘাতে নিহত করা। তাদেরকে বলে দাও, আমরা এদেশ কবজা করতে আসিনি। এসেছি এখানের মানুষের হৃদয় জয় করতে, তবে জোরপূর্বক নয় পেয়ার ও মহব্বতের মাধ্যমে। নিজ নিজ ঘরে যাও, মূল্যবান জিনিস পত্র লুকানোর কোন প্রয়োজন নেই যার কাছে যা আছে তা তারই।
প্রতিনিধি দলকে যখন তারেক ইবনে যিয়াদের বক্তব্য বুঝিয়ে দেয়া হলো তখন তাদের চেহারায় নৈরাশ্যতা ও অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠল। তারা আর কিছু না বলে তারেকের ঘোড়ার পিছু পিছু হেঁটে চলল। তাদের পিছনে মুজাহিদ দলও অগ্রসর হলো, এভাবে সাধনা কেল্লাবন্দি পল্লী কোন প্রকার হতাহত ছাড়াই হাতে এসে গেল।
শহরের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্যে প্রধান কর্মকর্তা মুসলমান আর বাকীরা গোথা ও খ্রীষ্টান নিয়োগ করলেন। শহরবাসীদের প্রতি কেউ চোখ তুলে তাকাল না। ফলে শহরের সকলের মন হতে সন্দেহ ও আশংকা দূরীভূত হলো।
সমুখে কারমুনা নামেএকটি ছোট শহর রয়েছে। আট দশ দিন তারেক এ শহরেই অতিবাহিত করলেন। ইতোমধ্যে উত্তর আফ্রিকা থেকে বর্বর গোত্রের মুসলমানরা আসতে লাগল। কোন কোন ঐতিহাসিক তাদের সংখ্যা বার হাজার আবার কেউ পঞ্চাশ হাজার বর্ণনা করেছেন, তবে তাদের সংখ্যা বিশ-পঁচিশ হাজারের মাঝে ছিল। শৃংখলাবদ্ধভাবে যুদ্ধ করার কৌশল তাদেরকে শিখিয়ে দেয়ার জন্যে তারেক তার জেনারেলদের নির্দেশ দিলেন।
তারেক যখন তার ফৌজ নিয়ে কারমুনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন শহরের দু’জন বয়স্ক ভদ্রলোক এলো। তাদের মাঝ থেকে একজন বলল,
প্রথম দিন আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আপনি বাস্তব প্রমাণ করেছেন, আপনার ধর্ম মানুষকে মানুষের মর্যাদা দান করে আর সাধারণ জনগণকে নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। এ বস্তির আবাল-বৃদ্ধ সকলেই আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমরা আপনার অনুগ্রহের প্রতিদান হিসেবে সম্মুখের বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া কর্তব্য মনে করি।…
এ পল্লী যত সহজে আপনার হাতে এসেছে সামনে আর কোন শহর এত সহজে আপনার করতলগত হবে না। এখান থেকে যে সব ফৌজ পলায়ন করেছে তারা আপনাদের ভয়ে পলায়ন করেনি। তাদের কমান্ডার প্রথমে শহরবাসীকে বলেছিল তারাও যেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং কেল্লা যেন মুসলমানরা জয় করতে নাপারে। আমরা দু’জন তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা বলেছিলাম ফৌজ সংখ্যা অল্প আর শহরবাসী যুদ্ধে অভিজ্ঞ নয়।
একজন ফৌজি অফিসার বলেছিল, এখানে যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়ারই দরকার নেই। বরং এ শহর আক্রমণকারীদের ছেড়ে দিয়ে আমরা সম্মুখে গিয়ে সকলে একত্রিত হয়ে শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। রডারিকের বোকামী ও গোথাদের গাদ্দারীর দরুন আমাদের পরাজয় হয়েছে। পরিশেষে সকলেই তার কথা মত একমত হলো যে, মুসলমানদেরকে আসতে দেখলেই তারা পালিয়ে যাবে এবং সম্মুখে গিয়ে সম্মিলিত ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
তারেক : তোমাদের ফৌজরা কি ভয় পায়নি?
শহরবাসী; যারা রডারিকের সাথে যুদ্ধে শরীক হয়ে পালিয়ে এসেছে তারা অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। কিন্তু কেল্লার অন্যান্য ফৌজরা ও শহরবাসীরা তাদেরকে এত পরিমাণ ভর্ৎসনা দিয়েছে যে, তারাও প্রতিশোধের জন্যে প্রস্তুত হয়েছে। তাদের অন্তরে এখন ভয় নেই। আছে প্রতিশোধ স্পৃহা। আমরা আপনাকে সতর্ক করার জন্যে এসেছি যে, সম্মুখে মুকাবালা খুব কঠিন হবে।
***
তারেক ইবনে যিয়াদ কারমুনা পৌঁছে কেল্লা অবরোধ করার পর বুঝতে পারলেন, সহজে এ কেলা কজা করা যাবে না। অবরোধ দীর্ঘ হবে। প্রাচীরের ওপর তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীরা প্রস্তুত হয়েছিল। তারেক দেয়ালের চতুর্দিক ঘুরে ফিরে দেখলেন কোথাও তা ভাঙ্গার ব্যবস্থা আছে কিনা কিন্তু দেয়াল ছিল অত্যন্ত মজবুত। দরজা খোলার চেষ্টা করা হলে ওপর থেকে তীর ও বর্শার আঘাতে কয়েকজন মুসলমান আহত ও কয়েকজন শহীদ হয়ে গেল। চার-পাঁচ দিন এভাবে চেষ্টা করা হলো কিন্তু ওপর থেকে অবিরাম তীর-বর্শা বৃষ্টি নিক্ষেপ হবার সাথে সাথে ধিক্কার আসতে লাগল,
“এটা সাধনা নয়! বর্বররা! এটা হলো কারমুনা।
“অসভ্যরা আমাদের হাতে কেন মরার জন্যে এসেছ? বাঁচতে চাইলে ফিরে যাও।”
“ডাকাত-দস্যুর দল! কিছু সোনা-চান্দী নিক্ষেপ করছি তা নিয়ে চলে যাও।”
হে হতভাগারা! পরাজিত রডারিক নিহত হয়েছে। কিন্তু আমরা জীবিত রয়েছি।
অবরোধ বেশ দীর্ঘ হয়েছিল। কোন ঐতিহাসিক এক মাস আর কেউ দু’মাসের কথা উল্লেখ করেছেন।
এক রাতে অবরোধ তুলে নেয়া হলো। প্রাচীরের ওপর স্পেন ফৌজরা নৃত্য করতে লাগল। শহরবাসীও প্রাচীরের ওপর একত্রিত হলো। মশালের আলোতে রাত দিনে পরিণত হলো। সারা শহরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।
অর্ধ রাত্র পর শহরবাসী প্রাচীর হতে নেমে নিজ নিজ বাড়ীতে চলে গেল। দীর্ঘ দিনের অবরোধে ক্লান্ত সিপাহীরাও ঘুমিয়ে পড়ল। প্রাচীরের বুরুজে ও দরজার সম্মুখে কয়েকজন পাহারাদার জেগে রইল। দু’শ, আড়াইশ ব্যক্তি দরজার সম্মুখে এসে স্পেনী ভাষায় পাহারাদারদেরকে ডাকতে লাগল।
