“তাদের পুরুষের পোশাক খুলে রমনীদের কাপড় পরিয়ে দাও।”
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নারীরা বলছিল, ইসাজার নারীরা লড়াই করবে, এসব নালায়েকদেরকে কেউ এক ঢোঁক পানি দেবে না। তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ধুকে ধুকে মরুক। তাদেরকে প্রস্তারাঘাতে নিহত কর।
এ ধরনের হাজারো অভিসম্পাদ তীরের ন্যায় তাদের প্রতি নিক্ষেপ হচ্ছিল। তারা এখানে আশ্রয় তালাশ করতে এসেছিল কিন্তু তাদের জন্যে ছিল না কোন আশ্রয়। সেখানে যারা ফৌজ ছিল তারাও তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছিল না, যত যায় হোক তারা যেহেতু ফৌজ ছিল তাদের দ্বারা যুদ্ধ করাতে হবে তাই তাদের জন্যে খানা-পিনার ব্যবস্থা করা হলো। সেখানকার অফিসার আক্রমণকারীদের ব্যাপারে জানতে চাইল।
কিন্তু সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারল না। দু’একজন মুখ খুলে কেবল এ কথা বলল, কিছুই বুঝে এলো না মাত্ৰকয়েক হাজার লোক এক লাখের চেয়ে বেশী ফৌজকে কিভাবে খতম করে ফেলল। শাহান শাহ্ রডারিকও তাদের চাল না বুঝতে পেরে মারা গেল।
সন্ধ্যার পর বড় পাত্রী সাধারণ সভা আহ্বান করল। তাতে পালিয়ে আসা ও শহরী ফৌজ, সকলকে আহ্বান করা হলো। ক্রমে শহরের জন সাধারণ ও ফৌজরা সভাস্থলে সমবেত হলো। পাদ্রী প্রথমে ওয়াজের ভংগিতে বক্তব্য শুরু করল, তাতে মানুষের মাঝে খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি মহব্বত-ভালবাসা শত গুণ বেড়ে গেল। তারপর সে তার আসল কথায় এলো,
… এ হামলা তোমাদের মুলকের ওপর নয় বরং এ হামলা তোমাদের ধর্মের ওপর। এ আক্রমণ তোমাদের মান-সম্মান ও ইজ্জতের ওপর। এ শহরের পবিত্রতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে তোমরা ভাল করেই জ্ঞাত। তোমা যদি এ শহর দুশমনের হাতে তুলে দাও তাহলে মনে করবে তোমরা কুমারী মরিয়মকে দুশমনের কাছে অর্পণ করলে। যেন তোমরা ক্রস দুশমনের পদতলে নিক্ষেপ করলে। ঈসা মসীর রাজত্ব চিরতরে মুলোৎপাটন করলে। আর তোমাদের যুবতী মেয়েদেরকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হাতে তুলে দিলে। হামলাকারীরা দস্যু-ডাকাত, ইজ্জতহরণকারী, তারা তোমাদের বেটীদের সাথে তোমাদেরকেও নিয়ে যাবে। গোলামের মত তোমাদেরকে ধনীদের কাছে বিক্রি করবে। তোমাদের গির্জা-ইবাদত খানা ও খানকাকে তারা আস্তাবলে পরিণত করবে। বল, তোমরা কি এমনটি চাও?
“না ফাদার না! আমরা এ শহরের জন্যে জীবন বিলিয়ে দেব।” সমবেত জনসাধারণ জবাব দিল।
পাদ্রী : এখন আমি ফৌজদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলল,এরা যুদ্ধ ময়দান হতে পালিয়ে এসেছে। তোমরা তাদের বহু তিরস্কার করেছ, তারাও লজ্জিত হয়েছে। লড়াইয়ের ময়দান থেকে পলায়ন করা পাপ কাজ। এখন যদি তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে দুশমনকে পরাজিত করে, তাহলে তাদের পূর্বের পাপ মোচন হয়ে যাবে, আর যে এ শহর রক্ষার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে সে স্বর্গে প্রবেশ করবে।
ফৌজদের মাঝে যুদ্ধ-স্পৃহা ফিরিয়ে আনার জন্যে পাদ্রী অত্যন্ত জোরাল বক্তৃতা পেশ করল। শ্রোতারা তাকবীর ধ্বনী দিয়ে তার বক্তব্যকে স্বাগত জানাল এবং আমজনতা ও ফৌজ সকলেই জীবন বাজী রেখে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হলো।
তারপর পাত্রী ঐ সকল রমণীদের ঘরে গেল যারা নিজেদের জীবন-যৌবন ধর্মের জন্যে ওয়াকফ করে ছিল। ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, তারা এত সুন্দরী ছিল যে তাদের সৌন্দর্যের চর্চা দূর দূরান্ত পর্যন্ত হতো। তারা সকলে চির কুমারী ছিল। তাদের সাথে পাদ্রীরা থাকত। তারা সারা জীবন বিবাহ-শাদীতে আবদ্ধ হতো না।
বড় পাদ্রী সকল নারীকে হলে একত্রিত করে সাধারণ জলসায় যে বক্তব্য রেখেছিল সে বক্তব্যই নারীদেরকে শুনান। মুসলমানদেরকে দস্যু-ডাকাত, হামলাকারী ও জঙ্গলি জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করল।
পাদ্রী : তোমাদের মত সুন্দরী যুবতীদেরকে মখমল ও রেশমে জড়িয়ে রাখবে না। হয়তো জানে মেরে ফেলবে বা আধমরা করে সাথে নিয়ে গিয়ে অমানবিক আচরণ করবে। আমাদের এ শহরের কোন আশংকা নেই। আমাদের আশংকা তোমাদের ব্যাপারে। তোমরা যদি তাদের হাতে চলে যাও তাহলে পরিণাম খুবই খারাপ হবে।
এক যুবতী বলল, তাহলে আমরা কি কর্ডোভা বা টলেডো চলে যাব ফাদার?
পাদ্রী : না, তোমাদের জন্যে কোন জায়গা নিরাপদ নয়। তবে একটা তরীকা রয়েছে যদ্বারা এ বিপদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে বা বিপদ হালকা হবে তার জন্যে প্রয়োজন চার-পাঁচ সাহসী লাড়কী।
একজন যুবতী জিজ্ঞেস করল, কি কাজ করতে হবে?
পাদ্রী : মুসলমানদের সবচেয়ে বড় কমান্ডার যার নাম তারেক। তাকে হত্যা করতে হবে এবং তার সাথে যে দু’তিনজন বড় জেনারেল রয়েছে তাদেরকেও।
সকলকে নিরবতা ছেয়ে নিল। যেন হলে কেউ নেই।
পাদ্রী : কাজ তেমন কঠিন নয়। তারা আসছে, এসেই এ শহর দখল করে তোমাদেরকে তাদের সাথে রাখা শুরু করবে। তোমরা ভাল করে জেনে নাও, তোমরা একজন তাদের একজনের কাছে থাকবে এমনটি আদৌ হবে না। তোমাদের অবস্থা তো এমন হবে যেমন একটা বকরী নেঘড়ে বাঘের পালের মাঝে পড়লে যেমন হয়। এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার পূর্বেই তোমরা তাদেরকে রাস্তার মাঝে কেন হত্যা করবে না? তোমাদের মাঝে একজন যুবতীও কি এমন নেই?
মুসলমানদের ফৌজ কারমুনা থেকে রওনা হয়ে রাস্তার মাঝে এক জায়গায় তাবু ফেলবে। যারা যেতে চাও তাদেরকে সেথায় পৌঁছে দেয়া হবে। তারা সেখানে। গিয়ে বলবে আমরা তারেক ইবনে যিয়াদের কাছে যেতে চাই, তাদেরকে কেউ বাধা দেবে না। প্রত্যেক লাড়কীর কাপড়ের মাঝে খঞ্জর লুক্কায়িত থাকবে। তারেক ইবনে যিয়াদ একজন যুবতাঁকে নিজের তাবুতে রাখবে আর বাকীদেরকে তার জেনারেলরা। নিয়ে যাবে।
